ঠিক ২৫ বছর আগের ঘটনা। এই লেখার অনেক পাঠকের হয়ত তখন জন্ম হয়নি। অথবা অনেকে অনেক ছোট। চলতি শতাব্দীর শুরুতে বিশ্ববাণিজ্যের রাজধানী হিসেবে খ্যাত নিউইয়র্কে ঘটে যাওয়া সেই বিয়োগান্তক ঘটনায় শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সার্বিক বাস্তবতা বদলে যায়নি, পাল্টে যায় পৃথিবীর সামগ্রিক পরিস্থিতিও।
আগামীকাল ১১ সেপ্টেম্বর সেই ঘটনায় নিহতদের স্মরণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে নিউইয়র্ক নগরীর নবনির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানির যোগ দেওয়া নিয়ে বিতর্কও সৃষ্টি হয়েছে। টুইন টাওয়ারে হামলার ঘটনার সময় জোহরানের বয়স ছিল ৯ বছর।
সবাই জানেন যে, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সময় সকালে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির গর্ব, অর্থাৎ নিউইয়র্কের লোয়ার ম্যানহাটনের দৃষ্টিনন্দন বিশ্ব বাণিজ্যকেন্দ্রের ১১০-তলা টুইন টাওয়ার সন্ত্রাসী হামলায় ধসে পড়ে।
দেশটির নাইন ইলেভেন মেমোরিয়াল অ্যান্ড মিউজিয়াম-এর তথ্য বলছে—আল-কায়েদার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ১৯ সন্ত্রাসী ক্যালিফোর্নিয়া থেকে চারটি বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ ছিনতাই করে। তারা দুটি উড়োজাহাজ নিচু করে উড়িয়ে নিয়ে টুইন টাওয়ারের দুই সুউচ্চ ভবনে হামলা চালায়। কিছুক্ষণ পর ধসে যায় ভবন দুটি।
তৃতীয় উড়োজাহাজটি আঘাত হানে ভার্জিনিয়ায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর সদরদপ্তর পেন্টাগনে। ওয়াশিংটন ডিসির দিকে উড়ে যাওয়া চতুর্থ উড়োজাহাজটি যাত্রী ও ক্রুদের হস্তক্ষেপে পেনসিলভানিয়ার একটি মাঠে গিয়ে পড়ে।
জাদুঘরটির তথ্য আরও বলছে—সেই হামলায় অন্তত ২ হাজার ৯৭৭ জন নিহত হন। যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে সন্ত্রাসী হামলায় সেটাই ছিল সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা।
প্রসঙ্গক্রমে জানিয়ে রাখা—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের পার্ল হারবারে জাপানি বিমান বাহিনীর হামলায় নিহত হয়েছিলেন অন্তত ২ হাজার ৪০০ জন।
সেই হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়ে। জাপানি আগ্রাসন ঠেকানোর দাবি তুলে যুক্তরাষ্ট্র ১৯৪৫ সালের ৬ ও ৯ আগস্ট জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে মানবসভ্যতার ইতিহাসে প্রথম পারমাণবিক বোমা ফেলে।
ফিরে আসা যাক ২০০১ সালের হামলায়।
নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ারে হামলার সময় দেশটির রাষ্ট্রপতি ছিলেন জর্জ ডব্লিউ বুশ। তিনি ‘বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের’ ঘোষণা দেন। বিশ্ববাসীর উদ্দেশে তিনি সদর্পে বলেন—সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে যারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে থাকবে না, ধরে নেওয়া হবে তারা যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু।
বুশের এমন ঘোষণায় বদলে যায় বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং আর্থসামাজিক পরিস্থিতি।
জর্জ ডব্লিউ বুশের ‘বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের’ ঘোষণার সিকি শতাব্দী পর এই যুদ্ধ কী অর্থ ও তাৎপর্য বহন করে—তা জানতে গুগলে অনুসন্ধান করা হলে পাওয়া যায় নানান তথ্য।
ব্রিটানিকার তথ্য বলছে—‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ বলতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানকে বোঝায়। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সন্ত্রাসী হামলার পরিপ্রেক্ষিতে এই অভিযান শুরু হয়। ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’কে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ পরবর্তী তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে শীতল যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে।
এতে জানানো হয়, ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ বৈশ্বিক রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায় সৃষ্টি করেছে। এটি নিরাপত্তা, মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন, সহযোগিতা ও শাসনব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে।
‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের’ কোনো সীমা-পরিসীমা নেই উল্লেখ করে ব্রিটানিকার তথ্য আরও বলছে—আফগানিস্তান ও ইরাকে সরাসরি যুদ্ধ ও ইয়েমেনে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে সহায়তা এরই অংশ। এটি সামরিক খরচ বহু গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
ব্রিটানিকায় আরও জানানো হয়, ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা খাতের খরচও ব্যাপক পরিমাণে বাড়িয়ে দিয়েছে। এটি বিমানবন্দর, আন্তর্জাতিক সীমানা ও সরকারি অনুষ্ঠানে নিরাপত্তার খরচও বৃদ্ধি করেছে।
এতে বলা হয়—‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের’ কারণে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বুশ প্রশাসন ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিল। সমালোচকদের মতে, ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ অবৈধ ও অনৈতিক। তারা বিনা বিচারে হাজারো মানুষকে আটকে রাখার তথ্য তুলে ধরেন। তারা আটক ব্যক্তিদের ওপর অমানসিক নির্যাতনের কথাও প্রকাশ করেন।
শুধু সন্দেহের বশে যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন দিয়ে মানুষ হত্যার নিন্দা করেন জর্জ বুশের ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের’ সমালোচকরা।
গুগলের এআই মোড থেকে জানা গেল—২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সন্ত্রাসী হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যে সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অভিযান শুরু করেছে তাই ‘বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’।
রাষ্ট্রপতি জর্জ ডব্লিউ বুশ এই অভিযান শুরু করেছিলেন, জানিয়ে এতে আরও বলা হয়, এই অভিযান বৈশ্বিক নিরাপত্তানীতি, দেশের ভেতরে ব্যক্তি স্বাধীনতা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কে আমূল পরিবর্তন এনেছে।
ব্রিটানিকা ও জর্জ ডব্লিউ বুশ লাইব্রেরির তথ্যের বরাত দিয়ে গুগলের এআই মোড জানায়—এই যুদ্ধের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল সারা পৃথিবীতে সন্ত্রাসবাদ খুঁজে বের করে তা দমন ও প্রতিটি সন্ত্রাসী সংগঠনকে নির্মূল করা।
আল-কায়েদা ও এর নেতা ওসামা বিন লাদেনকে লক্ষ্য করে এই অভিযান শুরু হয়।
আরও জানা যায়, এই অভিযানের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। সন্ত্রাসবাদকে সাধারণ আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গের দৃষ্টিতে নয়, বরং ‘যুদ্ধের দৃষ্টিভঙ্গিতে’ দেখার নীতি গ্রহণ করা হয়।
‘বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের’ মাধ্যমে ২০০১ সালে আফগানিস্তানে তালেবান ও ২০০৩ সালে ইরাকে সাদ্দাম হোসেন সরকারের পতন ঘটানো হয়।
এমনকি, ‘বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের’ অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও ব্যাপক অভিযান শুরু হয়।
২০০২ সালে যুক্তরাষ্ট্র সরকার হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ডিপার্টমেন্ট গঠন করে এর মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, গোয়েন্দা তথ্য আদানপ্রদান ও সীমান্ত রক্ষার ব্যবস্থা নেয়।
সন্ত্রাসীদের নেটওয়ার্ক ধ্বংসের জন্য ব্যক্তি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর নজরদারির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এআই মোড আরও জানায়—গত ২৫ বছর ধরে চলা ‘বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের’ কারণে আফগানিস্তান, ইরাক, পাকিস্তান ও ইয়েমেনে ৪৫ লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
এ ছাড়াও, বিদেশে অভিযান চালাতে গিয়ে ৭ হাজারের বেশি মার্কিন সেনা নিহত হন।
শুধু তাই নয়, ‘বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের’ কারণে প্রায় ৪ কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ১৯০০ সালের পর এত বেশি মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে এই ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের’ কারণে।
‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ চালাতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ৮ ট্রিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে বলেও এআই মোড থেকে জানা যায়।
ওয়াশিংটন ডিসির গ্লোবাল ওয়ার অন টেটোরিজম মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশন বলছে: ‘বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ একটি জটিল যুদ্ধ যা কয়েক প্রজন্ম ধরে চলতে পারে।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে যুগপৎ হামলায় একদিকে যেমন কেঁপে উঠেছিল আটলান্টিকের পশ্চিম উপকূল; অন্যদিকে, দেশটিতে জন্ম নিয়েছিল একে অপরের প্রতি ঘোরতর সন্দেহ।
অভিবাসীদের স্বর্গরাজ্য যুক্তরাষ্ট্রে শুরু হয়েছিল অভিবাসীদের ওপর কড়াকড়ি।
‘সিজনস অব ফিউরি’-খ্যাত মার্কিন লেখক ও সাংবাদিক রোজিনা আলির ভাষায়—টুইন টাওয়ার হামলার আগে প্রতিবেশীরা তাকে বাদামি রঙের দক্ষিণ এশীয় অভিবাসী হিসেবে গণ্য করতেন।
কিন্তু, হামলার পর বোঝা যায় তার মূল পরিচয় তিনি মুসলমান, যোগ করেন রোজিনা।
বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে এই লেখক বলেন, ৯/১১ হামলার পর মহল্লায় একজন প্রতিবেশী অন্য প্রতিবেশীকে এবং কর্মক্ষেত্রে একজন সহকর্মী অন্য সহকর্মীকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখতেন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে, কোনো একজনকে সামান্যতম সন্দেহ হলেই ফোন দিয়ে পুলিশ-এফবিআই ডেকে আনা হতো।
রোজিনার তথ্য মতে, শুধুমাত্র সন্দেহের বশে হাজারো মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তাদের অধিকাংশই ছিল মুসলমান। যদিও তাদের বিরুদ্ধে আগে কোনো অপরাধের অভিযোগে ছিল না।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সন্ত্রাসী হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রে ‘যুদ্ধাবস্থা’ নেমে এসেছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর টুইন টাওয়ার ধ্বংসের এক মাসের কম সময়ের মধ্যে তথা ৭ অক্টোবর আল-কায়েদা প্রধান ওসামা বিন লাদেনসহ সংগঠনটির অন্যান্য নেতাদের ধরতে যুক্তরাষ্ট্রের-নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট তালিবান-শাসিত আফগানিস্তানে অভিযান শুরু করে।
জর্জ ডব্লিউ বুশ লাইব্রেরির তথ্য বলছে—আফগানিস্তান যুদ্ধ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-মিত্রদের সঙ্গে আফগানিস্তানের তালেবান শাসকদের সশস্ত্র সংঘাত। ২০০১ সালে শুরু হওয়া সেই যুদ্ধ শেষ হয় ২০২১ সালে।
এতে দাবি করা হয়—বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের অংশ হিসেবে বুশ প্রশাসন আফগানিস্তানে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন। তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রপতি জর্জ ডব্লিউ বুশ এই যুদ্ধের মাধ্যমে নিজ দেশের মানুষদের পরবর্তী সন্ত্রাসী হামলা থেকে নিরাপদ রাখার চেষ্টা করেছিলেন।
জর্জ ডব্লিউ বুশ লাইব্রেরির তথ্য আরও বলছে—তালেবান-পরবর্তী গণতান্ত্রিক সরকার আফগানিস্তানে শান্তি আনতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন মিত্র বাহিনী তালেবানদের পুরোপুরি নিরস্ত্র করতে ব্যর্থ হয়।
২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানে সম্মুখ যুদ্ধ শেষ করে। সেটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সরাসরি যুদ্ধ। ২০২১ সালের ৩০ আগস্ট সর্বশেষ মার্কিন সেনা আফগানিস্তান ছেড়ে যায়।
জর্জ ডব্লিউ বুশ লাইব্রেরির তথ্য অনুসারে—২০০১ সালে যুদ্ধ শুরুর পর ২০২১ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানে মার্কিন বাহিনীর ২ হাজার ৩২৪ সেনা ও ৩ হাজার ৯১৭ জন সামরিক ঠিকাদার এবং মিত্র বাহিনীর ১ হাজার ১১৪ সেনা নিহত হয়েছেন।
সেই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে বলেও সেই লাইব্রেরিটির তথ্যে জানা যায়।
আরও জানা যায়—যুদ্ধে আফগানিস্তানের অন্তত ৭০ হাজার সামরিক ও ৪৬ হাজার বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এ ছাড়াও, অসংখ্য ‘শত্রু’ নিহত হয়েছেন, বলেও লাইব্রেরিটির তথ্য জানানো হয়।
এ কথা সবাই জানেন যে প্রায় ২০ বছর ধরে চলা আফগানিস্তান যুদ্ধ শেষ হয় মার্কিন ও মিত্র সেনাদের লজ্জাজনকভাবে কাবুল থেকে পালানোর মধ্য দিয়ে।
অনেক বিশ্লেষক মনে করেন—ইরাকের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি সাদ্দাম হোসেন টুইন টাওয়ার হামলার নিন্দা না করায় ২০০৩ সালের মার্চে যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটো মিত্রদের নিয়ে ইরাকে আগ্রাসন চালায়। তখন অভিযোগ তোলা হয়েছিল যে, ইরাকের হাতে গণবিধ্বংসী রাসায়নিক বোমা ও জীবাণু অস্ত্র আছে। যদিও পরে তা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছিল।
ইরাক যুদ্ধ সম্পর্কে জর্জ ডব্লিউ বুশ লাইব্রেরির তথ্য বলছে—সাদ্দাম হোসেনের শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে ২০০৩ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন মিত্র বাহিনী সশস্ত্র সংঘাতে নেমেছিল।
সেটি ‘বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের’ অংশ ছিল বলেও এতে জানানো হয়।
আরও জানানো হয়—১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধ বা ইরাক-কুয়েত যুদ্ধের পর জাতিসংঘ ইরাককে যেসব নিয়ম মেনে চলতে বলেছিল সাদ্দাম সরকার তা মেনে না চলায় এবং ইরাকে গণবিধ্বংসী অস্ত্র তৈরির বিষয়ে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-এর প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে দেশটিতে মার্কিন সেনারা হামলা চালায়।
সিআইএ-এর সেই প্রতিবেদনটিতে ভুল ছিল উল্লেখ করে জর্জ ডব্লিউ বুশ লাইব্রেরি জানায়, ইরাককে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি ও সাদ্দাম হোসেনকে সন্ত্রাসী বলে গণ্য করতো ওয়াশিংটন।
এতে আরও বলা হয়—ইরাকে হামলার বিষয়ে জাতিসংঘের সম্মতি পেতে ব্যর্থ হয় যুক্তরাষ্ট্র। তাই ২০০৩ সালের ১৯ মার্চ যুক্তরাষ্ট্র ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ড ও পোল্যান্ডকে নিয়ে বাগদাদে বোমা ফেলতে শুরু করে।
সেই বছর ১ মে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জর্জ ডব্লিউ বুশ ‘বড় যুদ্ধ শেষ’ ঘোষণা দিলেও সেই যুদ্ধ চলেছিল ২০১১ সাল পর্যন্ত।
ইরাক যুদ্ধ ‘অনেক ব্যয়বহুল’ ছিল উল্লেখ করে জর্জ ডব্লিউ বুশ লাইব্রেরির তথ্যে বলা হয়—প্রায় ৮ বছর ধরে চলা ইরাক যুদ্ধে অন্তত ৪ হাজার ৪০০ মার্কিনি ও প্রায় ১ লাখ ইরাকি প্রাণ হারিয়েছেন।
এতে আরও বলা হয়, ইরাকে অভিযান চালানোর পর জানা যায় যে ইরাকে কোনো গণবিধ্বংসী অস্ত্র নেই। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য ভুল ছিল।
হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরাক যুদ্ধের প্রকৃত খরচ ছিল ৩ ট্রিলিয়নের বেশি।
অনেকের হয়ত মনে আছে যে ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ইরাকে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানোয় বাগদাদে এক সংবাদ সম্মেলনে রাষ্ট্রপতি জর্জ ডব্লিউ বুশের দিকে জুতা ছুঁড়ে মেরেছিলেন এক ইরাকি সাংবাদিক।
আফগানিস্তান ও ইরাকে ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ ছাড়াও দুনিয়াজুড়ে মানুষের চলাচলে ব্যাপক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। এখনো সারা পৃথিবীতে সেসব বিধিনিষেধ বলবৎ আছে।
অর্থাৎ, ঠিক ২৫ বছর আগে টুইন টাওয়ারে সন্ত্রাসী হামলার কারণে বিশ্বব্যাপী যে ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ শুরু হয়েছিল তা এখনো চলমান। এখনো সন্ত্রাসী হামলা রুখতে বিশ্বব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোয় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
রোজিনা আলি আরও বলেন, ১৯৮০ দশকে আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়নের আগ্রাসন মোকাবিলা করতে যুক্তরাষ্ট্র সোভিয়েতবিরোধী আফগান মুজাহিদ বাহিনীকে সার্বিক সহায়তা দিলেও মার্কিন প্রশাসন ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি আগ্রাসনবিরোধী সশস্ত্র সংগঠনগুলোকে নিজেদের শত্রু মনে করে।
তার মতে, ১৯৯০ এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর রাজনৈতিক ইসলাম সব মার্কিন সরকারের চক্ষুশূল হয়।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর টুইন টাওয়ার হামলার পর মুসলিমদের গণহারে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে গণ্য করার মানসিকতা এখনো বিদ্যমান বলেও মন্তব্য করে এই লেখক।
২০০১ সালে ১ মার্চ ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট-এর ‘হু ইজ রেসপনসিবল ফর দ্য তালিবান?’ প্রতিবেদনে বলা হয়—এ কথা বহুল প্রচলিত যে আল-কায়েদা প্রধান ওসামা বিন লাদেন ও তালেবানদের প্রশিক্ষণের জন্য যুক্তরাষ্ট্র দায়ী।
এতে আরও বলা হয়, ব্রিটিশ দৈনিক দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট-এর মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক জনপ্রিয় সংবাদদাতা রবার্ট ফিস্ক লিখেছিলেন, ‘আমেরিকানরা একসময় সিআইএ-এর ক্যাম্পে ওসামা বিন লাদেনের যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন।’
যে নিউইয়র্কে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা চালানো হয়েছিল এবং এর জন্য দলমত নির্বিশেষ মুসলিমদের দায়ী করা হয়, সেই মহানগরীর বাসিন্দারা ঠিক সিকি শতাব্দী পর একজন মুসলিম অভিবাসী জোহরান মামদানিকে মেয়র হিসেবে নির্বাচিত করে।
মানবাধিকার কর্মীদের অনেকের অভিযোগ—৯/১১ সন্ত্রাসী হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে হাজারো মুসলিম অভিবাসীকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না জানিয়েই আটক ও জেল দেওয়া হয়।
পাশাপাশি, ছোট ছোট তথ্যগত ভুলের জন্য অনেককে দেশ থেকে বের করে দেওয়া হয়। এর ফলে বহু সাধারণ মুসলিম পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
২০২৫ সালে জোহরান মামদানি তার নির্বাচনী প্রচারণায় ৯/১১ সন্ত্রাসী হামলার কারণে নিউইয়র্কের মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর যে খড়গ নেমে এসেছিল তা জোরালো ভাষায় তুলে ধরেছিলেন।
এ প্রসঙ্গে তিনি তার পরিবারের এক জ্যেষ্ঠ নারী সদস্যের ভীতিকর অভিজ্ঞতার কথা জনসভায় তুলে ধরেছিলেন।
জোহরান জোর গলায় বলেছিলেন যে, নিউইয়র্কে সন্ত্রাসী হামলার পর বহু মুসলিম পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রাস্তায় বহু মুসলমানকে শুধু ঘৃণার বশে হেনস্তা করা হয়।
মেয়রের দায়িত্ব পাওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই জোহরান মামদানি ৯/১১ হামলায় নিহতদের স্মরণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। কিন্তু, তিনি যেন এমন স্মরণানুষ্ঠানে অংশ না নেন সেই অনুরোধ জানিয়ে প্রায় ১ লাখ মানুষ এক আবেদনে সই করেছেন।
তাদের অভিযোগ: মেয়র জোহরান মামদানি ৯/১১ এর সন্ত্রাসী হামলায় নিহতদের স্মরণানুষ্ঠানে যোগ দিলে তা নিহতদের পরিবারের সদস্যদের জন্য অবমাননাকর হবে।
টুইন টাওয়ার হামলার সময় নিউইয়র্কের মেয়র ছিলেন রুডি জুলিয়ানি। তিনি বর্তমান রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পেরও ঘনিষ্ঠ। সাবেক মেয়র জুলিয়ানি ও নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের সাবেক গভর্নর জর্জ প্যাটাকি মনে করেন ৯/১১ হামলায় নিহতদের স্মরণানুষ্ঠানে বর্তমান মেয়র জোহরান মামদানির যোগ দেওয়া উচিত নয়।
গত ৭ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ডানপন্থি মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউজম্যাক্স-কে এক সাক্ষাৎকারে নিউইয়র্কের রুডি জুলিয়ানি বলেছেন, ‘সে (মামদানি) অনুষ্ঠানে যোগ দিলে আমি ক্ষুব্ধ হবো’।
এর পরদিন মার্কিন সংবাদমাধ্যম এবিসি নিউজ জানায়—সাবেক গভর্নর জর্জ প্যাটাকি বলেছেন যে ৯/১১ হামলায় নিহতের স্মরণসভায় যোগ দেওয়া মামদানির উচিত হবে না।
গত ৩ সেপ্টেম্বর অপর মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস এক প্রতিবেদনের শিরোনাম করেছিল—নিউইয়র্ক নগরীর মেয়র জোহরান মামদানি বলেছেন যে ৯/১১ স্মরণসভাকে রাজনৈতিক রং দেওয়া উচিত না।
গত ১ সেপ্টেম্বর ফক্স নিউজের এক প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সমাজমাধ্যম এক্স-এ পোস্ট করা জোহরান মামদানির একটি বার্তা তুলে ধরা হয়।
সেই দিনের এক্স বার্তায় জোহরান মামদানি ৯/১১ হামলায় নিহতদের পাশাপাশি সেই হামলার পর যেসব যুদ্ধ হয়েছে সেসব যুদ্ধে নিহতদেরকেও স্মরণ করেন।
তিনি সবার জন্য একটি সুন্দর পৃথিবী গড়ে তুলতে কাজ করার প্রত্যাশাও করেন সেই বার্তায়।
ফক্স নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, অনেকের অভিযোগ—এমন বার্তায় জোহরান মামদানি সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আনেননি। তিনি সন্ত্রাসীদের প্রতি সহানুভূতি দেখিয়েছেন।
অন্যান্য সংবাদমাধ্যম থেকে জানা যায়, চলতি বছর মেয়রের দায়িত্ব নেওয়ার পর জোহরান মামদানি ১১ সেপ্টেম্বরকে ‘স্মরণ ও প্রার্থনা’ দিবস ঘোষণা করেছেন। সেদিন নিহতদের স্মরণের পাশাপাশি উদ্ধারকারীদের সম্মান জানানো হবে।
এ ছাড়াও, ৯/১১ হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রতি সহানুভূতি জানানো এবং নিউইয়র্কে বাসিন্দাদের সুরক্ষার জন্য জরুরি সেবা বাড়ানোর ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তবে অনেকে চান মেয়র মামদানি ৯/১১ এর স্মরণসভায় যোগ দিক।
তাদের ভাষ্য: বহু বছর ধরে গ্রাউন্ড জিরোকে (টুইন টাওয়ারের জায়গা) পবিত্র হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। এটি বহু মানুষের সমাধিস্থল। একে রাজনৈতিক বা দলীয় বক্তব্যের জন্য ব্যবহার করা উচিত নয়।

