জাপানে ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৩

জাপানের দক্ষিণ-পশ্চিমে কিউশু দ্বীপের কুমামোতো অঞ্চলে আঘাত হানা ৭ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৩ হয়েছে। 

ভূমিকম্পের প্রায় আধা ঘণ্টা পর একটি শপিং মলে গ্যাস বিস্ফোরণ হলে সেটির বড় অংশ বিধ্বস্ত হয়। সেখানে এখনো উদ্ধারকাজ চলছে।

আজ বুধবার এই তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।

গতকাল মঙ্গলবার ওই শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানার পর জাপানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কুমামোতো অঞ্চলে বহু বাড়িঘর ধসে পড়েছে, আগুন লেগেছে, সেতু ভেঙে গেছে এবং হাজারো মানুষ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে।

২০১৬ সালে এই অঞ্চলেই পরপর দুটি ভূমিকম্পে শত শত মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।

টোকিওতে সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি ১৩ জনের মৃত্যুর বিষয়ে ঘোষণা দিয়ে মন্তব্য করেন, এই ভূমিকম্পে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

সরকারের মুখপাত্র মিনোরু কিহারা জানান, আরও সাতজন গুরুতর আহত হয়েছেন।

বুধবার ভোর পর্যন্ত কিউশু দ্বীপের তিনটি অঞ্চলে ৫০৬টি আশ্রয়কেন্দ্রে নয় হাজারের বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।

স্থানীয়রা জানান, এই ভূমিকম্প নজিরবিহীন—এর আগে তারা কখনো এত শক্তিশালী ভূমিকম্প অনুভব করেননি। জাপানের সাত স্তরের ভূমিকম্পের তীব্রতা নির্ধারণকারী শিন্দো স্কেলে এর মাত্রা ছিল সর্বোচ্চ পর্যায়ে।

ইয়াতসুশিরো শহরের একটি বিলাসবহুল সরাইখানার মালিক কানজো মাতসুমোতো (৭৩) এএফপিকে বলেন, ‘এত শক্তিশালী ভূমিকম্প এর আগে আমি আর কখনো অনুভব করিনি।’

‘এই অঞ্চলটি এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারবে কি না, সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত নই’, বলেন তিনি।

এইচআর কর্মকর্তা চিহারু হারা (৩৫) এএফপিকে ভূমিকম্পের আতঙ্কজনক পরিস্থিতির বর্ণনা দেন।

তিনি বলেন, ‘আমাদের অফিসটি প্রচণ্ডভাবে এক পাশ থেকে আরেক পাশে দুলছিল। আমার মনে হচ্ছিল, এটি ভেঙে পড়বে। সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম।’

কাশিমা শহরের এইঅন শপিং মলে গ্যাস বিস্ফোরণে দুই নারীর মৃত্যু হয়। ভূমিকম্পের প্রায় আধা ঘণ্টা পর সেখানে গ্যাস বিস্ফোরণ ঘটে এবং এতে শপিং মলের বড় একটি অংশ বিধ্বস্ত হয়। মূল ভূমিকম্পের পর আরও কয়েক ডজন ভূমিকম্প পরবর্তী কম্পন অনুভূত হয়।

এক স্থানীয় কর্মকর্তা এএফপিকে জানান, শপিং মলের ভেতর থেকে আটজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে পাঁচজন আহত।

কর্মকর্তারা জানান, বুধবার সকাল পর্যন্ত কুমামোতো অঞ্চলে ৩৬ হাজার ৮৮০টি পরিবার ও স্থাপনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ছিল।

মঙ্গলবার স্থানীয় সময় বিকেল ৪টা ২৭ মিনিটে ভূমিকম্পটি আঘাত হানে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) এর মাত্রা ছয় দশমিক আট এবং উৎপত্তিস্থলের গভীরতা ১০ কিলোমিটার বলে জানিয়েছে।

ভূমিকম্পে একটি মালবাহী ট্রেন লাইনচ্যুত হয়েছে, ঐতিহ্যবাহী ‘তোরিই’ প্রবেশদ্বার ভেঙে পড়েছে এবং বহু সড়কে ফাটল দেখা দিয়েছে। অনেক সড়ক চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

এখনো শিনকানসেন বুলেট ট্রেন চলাচল বন্ধ আছে।

ভিডিও ফুটেজে শতাব্দীপ্রাচীন কুমামোতো দুর্গের দেয়ালের কিছু অংশ ধসে পড়তেও দেখা গেছে।

কুমামোতো বিমানবন্দর কয়েক ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এর কার্যক্রম আবার চালু হয়।

দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানান, উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে জাপানের সামরিক বাহিনীর তিন হাজার ৬০০ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি আকাশপথে ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়নে ২০টি উড়োজাহাজ পাঠানো হয়েছে।

বিশ্বের সবচেয়ে ভূমিকম্পপ্রবণ দেশগুলোর একটি জাপান। দেশটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’-এর পশ্চিম প্রান্তে চারটি প্রধান টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত।

প্রায় ১২ কোটি ৫০ লাখ মানুষের দেশটিতে প্রতিবছর সাধারণত শত শত ভূমিকম্প অনুভূত হয়। বিশ্বের মোট ভূমিকম্পের প্রায় ১৮ শতাংশই জাপানে ঘটে।

এসবের বেশির ভাগই তুলনামূলকভাবে দুর্বল হলেও, ভূমিকম্পের অবস্থান এবং ভূপৃষ্ঠের কত গভীরে এর উৎপত্তি হয়েছে, তার ওপর ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নির্ভর করে।

২০১১ সালের ৯ দশমিক ০ মাত্রার ভয়াবহ সমুদ্রতলীয় ভূমিকম্পের স্মৃতি এখনও জাপানকে তাড়া করে বেড়ায়।

ওই ভূমিকম্পের ফলে সৃষ্ট সুনামিতে প্রায় ১৮ হাজার ৫০০ মানুষ নিহত বা নিখোঁজ হন এবং ফুকুশিমা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
 

Related Articles

Latest Posts