ছাদেই হত্যা করা হয় ৩ জনকে, একজনকে ঘরে: পুলিশ

রংপুর নগরীর দাসপাড়া এলাকায় এক পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় নতুন তথ্য দিয়েছেন রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ। সাবেক স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০) ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থীকে (২৫) বাড়ির ছাদে এবং ছেলেকে ঘরের ভেতর হত্যা করা হয়। বৃহস্পতিবার সকালে নিজ কার্যালয়ে প্রেস ব্রিফিং করে তিনি এ তথ্য জানান।

আদালতে ১৬৪ ধারায় আসামিদের দেওয়া জবানবন্দির বরাত দিয়ে আরএমপি কমিশনার আব্দুল মাবুদ জানান, ‘২১ আগস্ট শুক্রবার সকালে ঘুম থেকে উঠে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে যান। সেখানে দুই যুবককে ইয়াবা সেবন করতে দেখেন তিনি। তাদের ইয়াবা সেবনের কথা বাইরে ছড়িয়ে পড়বে, এই ভয়ে তারা গণপতির গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে তাকে হত্যা করে। চিৎকার শুনে গণপতির স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী ছাদে এলে তাদেরও শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। আগামীর মৃত্যু হতে সময় লাগছিল, তাই ওই দুই যুবক ছাদে থাকা একটি রশি আগামীর গলায় পেঁচিয়ে টান দেয়। গণপতির মরদেহ ছাদের ওপর একটি টিন দিয়ে ঢেকে রাখে। আর মা ও মেয়ের মরদেহ টেনেহিঁচড়ে নিয়ে সিঁড়িতে রাখে।’

পুলিশ কমিশনার বলেন, ‘গণপতি, তার স্ত্রী ও মেয়েকে হত্যার পর দুই যুবক ঘরের ভেতর ঢোকে। এ সময় গণপতির ছোট ছেলে প্রিয়ম তাদের চিনে ফেলে এবং “সিদ্ধার্থ দাদা” বলে ডাকে। এরপর দুই যুবক মিলে প্রিয়মকে বিছানার ওপর শ্বাসরোধ করে হত্যা করে।’

মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ বলেন, ‘মা ও মেয়ের সোয়াব সংগ্রহ করে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মাইক্রোবায়োলজি ল্যাবে টেস্ট করা হয়। ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসকরা ধর্ষণের কোনো আলামত পাননি এবং আমাদের কাছে সেই রিপোর্ট দিয়েছেন। ময়নাতদন্তের রিপোর্টেও চারজনকে শ্বাসরোধ করে হত্যার তথ্য পাওয়া গেছে।’

তিনি জানান, ‘কয়েক বছর আগে সিদ্ধার্থ দাসের স্বজনের কাছ থেকে কম দামে জমি কিনেছিলেন গণপতি চক্রবর্তী। এটি নিয়েও সিদ্ধার্থের মনে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ছিল।’

পুলিশ কমিশনার আরও জানান, ‘গ্রেপ্তার দুই আসামির ডিএনএ পরীক্ষা ও ডোপ টেস্ট করা হবে। একই সঙ্গে ময়নাতদন্ত ও আসামিদের আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে উঠে আসা বিভিন্ন তথ্য যাচাই করে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্‌ঘাটনে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।’

আরএমপি কমিশনার বলেন, ‘সিদ্ধার্থের জবানবন্দি অনুযায়ী, সে আগে মাঝেমধ্যে উৎসবের সময় ইয়াবা সেবন করত। তবে ঘটনার আগের এক মাস ধরে প্রতি বৃহস্পতিবার একটি করে ইয়াবা সেবন করত। সিদ্ধার্থের বড় ভাইয়ের সম্প্রতি বিয়ে হয়। এরপর নানা কারণে সে প্রায় ছয়-সাত মাস ধরে বিজয় কাকুর বাসায় ঘুমাত। সেখানে খাওয়া-দাওয়াও করত। তবে ঘটনার আগের এক মাস ধরে প্রতি বৃহস্পতিবার সে সাক্ষী সীমান্তদের বাসায় থাকত। সীমান্ত নেশা করেন না এবং ঘটনার বিষয়েও তিনি কিছু জানতেন না। আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় সীমান্তের জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে।’

তিনি জানান, ‘সিদ্ধার্থের জবানবন্দি অনুযায়ী, ঘটনার দিন তারা মোট আটটি ইয়াবা সেবন করেছিল। এর আগে তারা একসঙ্গে সর্বোচ্চ দুটি ইয়াবা সেবন করত। তবে মুগ্ধের জবানবন্দিতে সেদিন নয়টি ইয়াবা সেবনের কথা এসেছে। এটি প্রথমে আটটি এবং পরে আরও একটি ইয়াবা সেবনের হিসাব হতে পারে।’

বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটে সংবাদ সম্মেলন করে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন আরএমপি কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ। প্রায় ৩০ মিনিট চলে এই সংবাদ সম্মেলন। তবে লিখিত বক্তব্য পাঠ করার পর সাংবাদিকেরা প্রশ্ন শুরু করলে পুলিশ কমিশনার কোনো উত্তর না দিয়ে সভাস্থল ত্যাগ করেন।

উল্লেখ্য, গত শনিবার রাতে সাবেক স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী ও ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় শুক্রবার ভোরে তাদের শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে। এ ঘটনায় রোববার ভোরে সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তারা আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন।

Related Articles

Latest Posts