চেরনোবিলের ৪০ বছর: পারমাণবিক বিস্ফোরণের দীর্ঘ ছায়ায় নতুন বিপদের শঙ্কা

চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিস্ফোরণের ৪০তম বার্ষিকী আজ রোববার স্মরণ করছে ইউক্রেন। এটি ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ বেসামরিক পারমাণবিক বিপর্যয় হিসেবে বিবেচিত।

রাশিয়ার সঙ্গে ইউক্রেনের চলমান যুদ্ধের মধ্যেও চেরনোবিল আবার নতুন করে নিরাপত্তা উদ্বেগের কেন্দ্রে এসেছে। এই বিপর্যয় এবং বর্তমান সময়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সম্পর্কে জানার মতো পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বার্তাসংস্থা এএফপি।

১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিল রাত ১টা ২৩ মিনিটে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ উত্তর ইউক্রেনের চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে একটি নিরাপত্তা পরীক্ষার সময় মানবিক ত্রুটির কারণে বিস্ফোরণ ঘটে।

বিস্ফোরণে ভবনের ভেতরের অংশ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় এবং তেজস্ক্রিয় ধোঁয়ার বিশাল মেঘ বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে। পারমাণবিক জ্বালানি ১০ দিনেরও বেশি সময় ধরে জ্বলতে থাকে।

তেজস্ক্রিয়তা নিয়ন্ত্রণে আনতে হেলিকপ্টার থেকে হাজারো টন বালি, কাদামাটি ও সিসা ফেলা হয়।

আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) জানায়, এই বিপর্যয়ের মূল কারণ ছিল ‘রিঅ্যাক্টর ও শাটডাউন ব্যবস্থার নকশাগত গুরুতর ত্রুটি’ এবং পরিচালনা প্রক্রিয়া ‘লঙ্ঘনের’ সম্মিলিত ফল।

পরবর্তী দিনগুলোতে তেজস্ক্রিয় মেঘ ইউক্রেন, বেলারুশ ও রাশিয়াকে মারাত্মকভাবে দূষিত করে এবং পরে ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।

সুইডেন তাদের ভূখণ্ডে অস্বাভাবিক তেজস্ক্রিয়তা শনাক্ত করলে দুইদিন পর ২৮ এপ্রিল প্রথম জনসাধারণের জন্য সতর্কবার্তা আসে।

আইএইএকে আনুষ্ঠানিকভাবে দুর্ঘটনার কথা জানানো হয় ৩০ এপ্রিল। তবে সোভিয়েত নেতা মিখাইল গর্বাচেভ ১৪ মে পর্যন্ত প্রকাশ্যে এটি স্বীকার করেননি।

তেজস্ক্রিয়তার প্রভাবে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হয়, যদিও সঠিক সংখ্যা নিয়ে মতভেদ রয়েছে।

২০০৫ সালের জাতিসংঘ প্রতিবেদনে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত তিনটি দেশে নিশ্চিত ও সম্ভাব্য মৃত্যুর সংখ্যা ৪ হাজার বলা হয়। ২০০৬ সালে গ্রিনপিস এই সংখ্যা প্রায় ১ লাখ বলে উল্লেখ করে।

জাতিসংঘের মতে, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে যুক্ত প্রায় ৬ লাখ কর্মী উচ্চমাত্রার তেজস্ক্রিয়তার মুখে পড়েছিলেন।

এই বিপর্যয় বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক শক্তি নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করে এবং ইউরোপে পারমাণবিক বিরোধী আন্দোলনকে শক্তিশালী করে।

২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের প্রথম দিনেই রুশ বাহিনী চেরনোবিল বিদ্যুৎকেন্দ্র দখল করে নেয়।

বেলারুশ থেকে পাঠানো হাজার হাজার সেনা ও শত শত ট্যাংক কোনো বড় লড়াই ছাড়াই এই এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেয়।

রুশ সেনারা ‘রেড ফরেস্ট’-এর মতো উচ্চ তেজস্ক্রিয় এলাকায় খন্দক খনন ও শিবির স্থাপন করে।

এতে আশঙ্কা দেখা দেয়, সামরিক সংঘাতের কারণে সেখানে নতুন পারমাণবিক বিপর্যয় ঘটতে পারে।

তবে কিয়েভ দখলে ব্যর্থ হয়ে যুদ্ধ শুরুর প্রায় এক মাস পর রুশ বাহিনী সেখান থেকে সরে যায়।

বিদ্যুৎকেন্দ্রটির ধ্বংসাবশেষ প্রথমে ‘সারকোফাগাস’ নামে পরিচিত ইস্পাত ও কংক্রিটের কাঠামো দিয়ে আবৃত করা হয়।

২০১৬-২০১৭ সালে এর ওপর ‘নিউ সেফ কনফাইনমেন্ট’ নামে আধুনিক বহিরাবরণ স্থাপন করা হয়।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি রুশ ড্রোন এই বহিরাবরণে ছিদ্র সৃষ্টি করে, ফলে এর তেজস্ক্রিয়তা নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এপ্রিল মাসে গ্রিনপিস জানায়, কাঠামোটি ‘এই মুহূর্তে মেরামত করা সম্ভব নয়’ এবং তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

এদিকে চেরনোবিলের কাঠামো পূর্ণ মেরামতে তিন থেকে চার বছর সময় লাগতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।

বিদ্যুৎকেন্দ্রটির পরিচালক সতর্ক করেছেন, নতুন হামলা হলে এই সুরক্ষা কাঠামো ধসে পড়তে পারে।

বিপর্যয়ের পর বিদ্যুৎকেন্দ্রের আশপাশের বিশাল এলাকা খালি করে নিষিদ্ধ অঞ্চল ঘোষণা করা হয়।

উত্তর ইউক্রেনের ২ হাজার ২০০ বর্গকিলোমিটার এবং দক্ষিণ বেলারুশের ২ হাজার ৬০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা কার্যত বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ে।

আইএইএর মতে, আগামী ২৪ হাজার বছর সেখানে নিরাপদ বসবাস সম্ভব হবে না।

বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে তিন কিলোমিটার দূরের প্রিপিয়াত শহরে একসময় ৪৮ হাজার মানুষ বাস করতেন। এটিও সম্পূর্ণভাবে পরিত্যক্ত হয়ে যায়।

বর্তমানে শহরটি ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবন, মরিচাধরা বিনোদন পার্ক ও জনশূন্য অবকাঠামো নিয়ে এক ভূতুড়ে নগরীতে পরিণত হয়েছে।

২০২২ সালে রাশিয়ার আগ্রাসনের আগে সেখানে পর্যটকদের গাইডেড ভ্রমণের সুযোগ ছিল। তবে এখন এলাকা বন্ধ।

মানুষের অনুপস্থিতিতে অঞ্চলটি এখন এক বিশাল প্রাকৃতিক সংরক্ষণাঞ্চলে পরিণত হয়েছে। সেখানে বিরল প্রজাতির প্রাণীরাও টিকে আছে।
 

Related Articles

Latest Posts