গ্যাস সংকটে কমেছে প্যারাসিটামলের কাঁচামাল উৎপাদন

তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে দেশে প্যারাসিটামল এপিআই (অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট) উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। একইসঙ্গে বাংলাদেশের উৎপাদন সংশ্লিষ্ট খাতের বিভিন্ন কারখানার উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

জরুরি আমদানির ফলে ওষুধের সংকট আপাতত এড়ানো গেলেও প্যারাসিটামমলের এই কাঁচামালের উচ্চমূল্য ওষুধ প্রস্তুতকারকদের ব্যয় বাড়াচ্ছে এবং আমদানি-নির্ভরতার বিষয়টিও সামনে নিয়ে আসছে।

আইকিউভিআইএর (সাবেক আইএমএস হেলথ) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্যারাসিটামলযুক্ত ওষুধ বিক্রির দিক থেকে চতুর্থ সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে।

দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই গ্যাস সংকটের কারণে দেশের অন্যতম শীর্ষ এপিআই প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান গণস্বাস্থ্য বেসিক কেমিক্যাল লিমিটেডে উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবিএম জামাল উদ্দিন।

দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, ‘আমাদের বয়লার প্রাকৃতিক গ্যাসে চলে। বয়লার ছাড়া কোনো সহায়ক যন্ত্রই চালানো সম্ভব নয়। চিলার, রিঅ্যাক্টরসহ অন্যান্য প্রসেসিং ইউনিটের সবই এর ওপর নির্ভরশীল। বয়লার বন্ধ হয়ে গেলে পুরো কারখানাই অচল হয়ে পড়ে।”

গত ১৫ দিন ধরে প্যারাসিটামল এপিআই উৎপাদন করতে পারছে না গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের এই সহযোগী প্রতিষ্ঠানটি। ফলে টঙ্গীভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠানটির দৈনিক চার টন উৎপাদন প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে।

এই সংকট এমন সময়ে দেখা দিয়েছে, যখন উৎপাদকরা কাঁচামালের বাড়তি দামের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। জামাল উদ্দিন জানান, বৈশ্বিক তেলবাজারের অস্থিরতার কারণে চীন থেকে আমদানিকৃত প্রধান কাঁচামালের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে টনপ্রতি প্রায় ২ হাজার ৩০০ ডলার থেকে বেড়ে ৪ হাজার ৩০০ ডলারে দাঁড়িয়েছে।

‘পুরো এপিআই খাত এখন চাপে রয়েছে’, যোগ করেন তিনি।

খাত-সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশে প্রতি মাসে প্যারাসিটামল এপিআইয়ের চাহিদা প্রায় ৬৫০ টন।

উৎপাদন বন্ধ হওয়ার আগে গণস্বাস্থ্য মাসে প্রায় ৯০ টন প্যারাসিটামল এপিআই সরবরাহ করত। বাকি চাহিদা পূরণ করা হতো আমদানি ও অন্যান্য স্থানীয় উৎপাদকদের মাধ্যমে।

জামাল উদ্দিন জানান, বেক্সিমকো, অ্যাকমি, এসিআই, ইবনে সিনা, হেলথকেয়ার ও ইনসেপ্টাসহ অধিকাংশ শীর্ষ ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানকে তারা এপিআই সরবরাহ করে। স্কয়ারই একমাত্র বড় প্রতিষ্ঠান, যারা নিজেদের প্যারাসিটামল এপিআই নিজেরাই উৎপাদন করে।

গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার ওপরই এই এপিআই উৎপাদন পুনরায় শুরুর বিষয়টি নির্ভর করছে বলে জানান তিনি।

বাংলাদেশে প্রায় ৯৮ শতাংশ প্রস্তুত ওষুধ দেশেই উৎপাদিত হলেও উৎপাদনে ব্যবহৃত প্রায় ৯৫ শতাংশ এপিআই আমদানি করতে হয়, যার বড় অংশ আসে চীন ও ভারত থেকে।

২০১৮ সালে এপিআই নীতি গ্রহণ ও এপিআই শিল্পপার্ক স্থাপন করা হলেও নীতি, অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও নিয়ন্ত্রক জটিলতার কারণে আমদানি-নির্ভরতা কমানো এখনো সম্ভব হয়নি।

জামাল বলেন, ‘সরকারের সমন্বিত সহায়তায় এসব বাধা দূর করা গেলে বাংলাদেশ আমদানি-নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারবে। বর্তমানে দেশ বছরে প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলারের এপিআই আমদানি করে, যা কমিয়ে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারে নামিয়ে আনা সম্ভব।’

বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস পিএলসির নির্বাহী পরিচালক (প্রকিউরমেন্ট) মো. শাহ ইমরান জানান, তাদের প্রতিষ্ঠান নিজস্ব প্যারাসিটামল এপিআই উৎপাদন করলেও মাঝে মধ্যে গণস্বাস্থ্য থেকেও কিনে থাকে।

তিনি বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে গণস্বাস্থ্যের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বেক্সিমকোকে নিজেদের সক্ষমতার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, দেশে প্যারাসিটামলের মোট চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ বেক্সিমকো পূরণ করে এবং দীর্ঘদিন উৎপাদন ব্যাহত থাকলে সরবরাহ সংকট দেখা দিতে পারে।

স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, পাবনায় অবস্থিত তাদের এপিআই কারখানা গ্যাস সংকটে প্রভাবিত হয়নি। কারণ সেখানে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ রয়েছে।

তিনি বলেন, স্কয়ার একাই দেশের প্যারাসিটামল এপিআইয়ের প্রায় ৪০ শতাংশ চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম, যা জরুরি এই ওষুধের উৎপাদন অব্যাহত রাখতে সহায়তা করছে। তবে অন্যান্য স্থানীয় উৎপাদকদের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় সৃষ্ট ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব নয়। সেই কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানকে আমদানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের (বিএপিআই) সভাপতি এবং ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল মুক্তাদির বলেন, ওষুধ উৎপাদন অব্যাহত রাখতে সরকার জরুরি ভিত্তিতে এপিআই আমদানির অনুমতি দিচ্ছে।

হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হালিমুজ্জামান বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠান সাধারণত স্থানীয়ভাবে প্যারাসিটামল এপিআই সংগ্রহ করে, তারা ইতোমধ্যে আমদানির অনুমোদন নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে।

তিনি বলেন, বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী, ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কাঁচামালকে অগ্রাধিকার দিলেও সরবরাহ না থাকলে আমদানির অনুমতি দেয়।

হালিমুজ্জামান বলেন, ওষুধ কোম্পানিগুলো সাধারণত দুই থেকে তিন মাসের কাঁচামালের মজুত রাখে এবং আমদানির প্রক্রিয়া দীর্ঘ হওয়ায় আগেই অর্ডার দেয়। কারণ এপিআই আমদানি, মান পরীক্ষা এবং তা দিয়ে ওষুধ উৎপাদন—সবই সময়সাপেক্ষ।

‘প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভারসাম্য রাখতে হয়। খুব কম আমদানি করলে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। আবার বেশি আমদানি করলে ব্যবহার করার আগেই কাঁচামালের মেয়াদ শেষ হয়ে ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে’, যোগ করেন তিনি।

বাংলাদেশের দুটি ভাসমান স্টোরেজ ও রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিটের (এফএসআরইউ) একটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমেছে, যা জাতীয় সরবরাহের প্রায় ১৭ শতাংশ।

মহেশখালীতে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক এক্সেলারেট এনার্জি পরিচালিত টার্মিনালটি কেন বন্ধ হয়েছে, তা এখনো জানা যায়নি।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে গ্যাস সরবরাহ ২ হাজার ৬২০ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে কমে প্রায় ২ হাজার ১৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে, যেখানে দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট।

এই সংকটের তীব্র প্রভাব পড়েছে গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে। কারখানাগুলো এখন পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারছে না এবং এর ফলে রপ্তানি বিলম্বিত হচ্ছে।

ভোগড়া, চান্দনা চৌরাস্তা, রাজেন্দ্রপুর ও কোনাবাড়ির কারখানা কর্মকর্তারা জানান, গ্যাসের নিম্নচাপের কারণে উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে গেছে।

প্যারাগন সিরামিকসের প্রশাসন ব্যবস্থাপক রোকনুজ্জামান জানান, এক মাসের বেশি সময় ধরে তারা তীব্র গ্যাস সংকটে ভুগছেন।

তিনি বলেন, ‘এই এলাকায় প্রায় ৫০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান একই সমস্যার সম্মুখীন।’ চলমান সংকট মোকাবিলায় কোম্পানিটি সিএনজি কিনতে বাধ্য হয়েছে। তবে সীমিত সরবরাহের কারণে সেটিও কঠিন হয়ে পড়েছে।

‘নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে পারিনি এবং ইতোমধ্যে কয়েকজন বড় ক্রেতা হারিয়েছি’, বলেন রোকনুজ্জামান।

গাজীপুরে কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপ-মহাপরিদর্শক এম এম মামুন উর রশিদ বলেন, কোনো কারখানা আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ হয়নি। তবে সাত থেকে আটটি কারখানার উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের গাজীপুর মহানগর শাখার সভাপতি শফিউল আলম বলেন, শ্রমিকরা ইতোমধ্যে ওভারটাইম আয়ের সুযোগ হারাচ্ছেন এবং সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে কিছু কারখানায় ছাঁটাই হতে পারে।

বেঙ্গল গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান মো. জসিম উদ্দিন বলেন, ইউরোপীয় ক্রেতার বড় চালানের ডেনিম রপ্তানি অর্ডার হারানোর ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও গ্যাস সংকটের কারণে গাজীপুরে তাদের দুটি তৈরি পোশাক কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘এয়ার ফ্রেইটে পণ্য পাঠানোর সুযোগ নেই, কারণ খরচ অনেক বেশি। তাই আমরা উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলেও গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে বলে জানান প্লামি ফ্যাশনস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল হক।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের এই সাবেক সভাপতি বলেন, ‘সংকট আছে, কিন্তু তা কাটিয়ে ওঠার কোনো উপায় নেই। আমরা ডিজেল বা শিল্প এলপিজির মতো ব্যয়বহুল জ্বালানি ব্যবহার করতে পারি। কিন্তু তাতে বড় ধরনের লোকসান হবে।’

চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে চট্টগ্রামসহ সারা দেশের বিভিন্ন কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে।

তিনি জানান, ডেল্টা অ্যাগ্রোফুড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, প্রিমিয়ার সিমেন্ট মিলস পিএলসি এবং ন্যাশনাল সিমেন্ট মিলস লিমিটেড গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন বন্ধ রেখেছে।

‘গ্যাস ছাড়া উৎপাদন চালিয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের উৎপাদন খাত টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে’, যোগ করেন আমিরুল হক।

Related Articles

Latest Posts