গণভবন ফাইলস: কত মানুষ মরছে, সব খবরই পেতেন শেখ হাসিনা

২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলার সময় সারা দেশে ঠিক কত মানুষ নিহত হচ্ছিলেন, তার সব খবরই পেতেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু এত প্রাণহানির খবর জানার পরও তিনি নমনীয় হননি, বরং আন্দোলন দমনে আরও কঠোর অবস্থান নেয় সরকার।

গণভবনকে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে রূপান্তরের আগে সেখানকার ধ্বংসস্তূপ থেকে বেশ কিছু নথি উদ্ধার করা হয়। এসব নথি থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, শেখ হাসিনা মাঠপর্যায় থেকে সরাসরি প্রতিবেদন পাচ্ছিলেন।

জাদুঘরের জন্য গণভবন প্রাঙ্গণ থেকে উদ্ধার হওয়া এসব নথি ও অন্যান্য সামগ্রী সংগ্রহ এবং তালিকাভুক্ত করার কাজে যুক্ত একটি সূত্রের কাছ থেকে নথির কিছু অনুলিপি সংগ্রহ করেছে দ্য ডেইলি স্টার।

হাসিনার তৎকালীন সরকারি বাসভবন থেকে উদ্ধার হওয়া এসব নথির মধ্যে সহিংসতার প্রথম সপ্তাহে নিহত ব্যক্তিদের একটি বিস্তারিত তালিকাও ছিল। ওই প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘১৬-২২ জুলাই ২০২৪ তারিখ পর্যন্ত সারা দেশে সহিংসতায় মৃত্যুর সারসংক্ষেপ’।

নথিতে কারও সই না থাকলেও তথ্য সংগ্রহের ধরন থেকে বোঝা যায়, সেগুলো বিভিন্ন থানা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল।

ওই প্রতিবেদনে ১৬ থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে ১৩৬ জন নিহত হওয়ার তথ্য উল্লেখ করা হয়। ওই একই সময়ে দ্য ডেইলি স্টারের হিসাবে নিহতের সংখ্যা ছিল ১৪৬। অর্থাৎ, শেখ হাসিনার কাছে যাওয়া ওই প্রতিবেদনের হিসাবের সঙ্গে ডেইলি স্টারের হিসাবের সামঞ্জস্য রয়েছে।

শেখ হাসিনার কাছে যাওয়া ওই প্রতিবেদনে প্রতিটি ঘটনার বিস্তারিত তথ্য ছিল। সেখানে নিহত ব্যক্তিদের শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ই নয়, তাদের পরিবারের রাজনৈতিক পরিচয়ও উল্লেখ ছিল। নিহত ব্যক্তি শুধু সমর্থক ছিলেন, নাকি কোনো দলের সক্রিয় নেতা বা কর্মী, তা-ও আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট থানার মামলার নম্বর এবং কোন ব্যক্তি কোথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন, সেটাও নির্দিষ্ট করে লেখা ছিল।

এত বিপুল প্রাণহানির তালিকা পাওয়ার পরও তৎকালীন সরকার সংযত না হয়ে উল্টো আরও কঠোর অবস্থান নেয়।

২২ জুলাই নিজ কার্যালয়ে শীর্ষ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এক বৈঠকে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘জামায়াত-শিবির পেছনে থেকে সারা দেশে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালিয়েছে। বিএনপি তাদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে। এবার কাউকে সহজে ছাড় দেওয়া হবে না।’

এরপর প্রতিদিনই মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হতে থাকে। জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত গণঅভ্যুত্থানে অন্তত ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হন।

উদ্ধার হওয়া নথি থেকে আরও জানা যায়, গণভবনে বসেই হাসিনা নজরদারি প্রতিবেদনের মাধ্যমে আন্দোলনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছিলেন। আন্দোলনের সময় ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর আশপাশে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর ঘনত্বের তাৎক্ষণিক তথ্য তার কাছে পৌঁছাত।

এমনই একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালে সরকারি স্থাপনায় নাশকতার সময় আশপাশের এলাকায় মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা।’

এই প্রতিবেদনে ১৮ ও ১৯ জুলাইয়ের মধ্যে রামপুরার বিটিভি ভবন, বনানীর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের টোল প্লাজা, মিরপুর-১৪ বিআরটিএ কমপ্লেক্স, নরসিংদী জেলা কারাগার, মিরপুর-১০ মেট্রোরেল স্টেশন এবং বনানীর সেতু ভবনের আশপাশে কত মানুষ জড়ো হয়েছিল, তার সুনির্দিষ্ট হিসাব দেওয়া হয়।

গণভবন প্রাঙ্গণ থেকে উদ্ধার হওয়া আরেকটি নথিতে দেখা যায়, সহিংসতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বিদেশে যেসব তথ্য যাচ্ছে সেগুলোও সক্রিয়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছিল সরকার।

সেখানে সুপারিশ করা হয়, তৎকালীন টেলিযোগাযোগ অধিদপ্তরের অধীন থাকা সাইবার থ্রেট ডিটেকশন অ্যান্ড রেসপন্স (সাইবার হুমকি শনাক্ত ও মোকাবিলা) ব্যবস্থাকে ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারে (এনটিএমসি) স্থানান্তর করা হোক। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট গেটওয়ে ও আইএসপি পর্যায়ে যেকোনো কনটেন্ট ব্লক বা বন্ধ করে দেওয়া যাবে। নথিতে এ-ও উল্লেখ করা হয়, এনটিএমসির কনটেন্ট ব্লকিং ও ফিল্টারিং ব্যবস্থা ঠিকভাবেই কাজ করছে।

ইন্টারনেট বন্ধ থাকার পরও কীভাবে তথ্যপ্রবাহ ঠেকানো যায়, সেই পরিকল্পনাও ছিল প্রতিবেদনে। সেখানে সুপারিশ করা হয়, ‘বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় মোবাইল নেটওয়ার্ক শক্তিশালী হওয়ায় দুষ্কৃতকারীরা (বিএনপি, জামায়াত) ভারতীয় নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে বিদেশে সংবেদনশীল তথ্য পাঠাচ্ছে। তাই সীমান্তবর্তী এলাকায় ভারতীয় মোবাইল টাওয়ারের সিগন্যালের শক্তি কমাতে বিটিআরসির (বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন) যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘স্যাটেলাইট ফোনের ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য বিদেশে পাঠাতে স্যাটেলাইট ফোন ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, এসব স্যাটেলাইট ফোনের অধিকাংশই অনুমোদনহীন। এ পরিস্থিতিতে স্যাটেলাইট ফোনের ব্যবহার স্থগিত করা যেতে পারে।’

এতে আরও বলা হয়, ‘মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকায় বিএনপি ও জামায়াতের কর্মীরা বিভিন্ন এয়ারলাইনসের আন্তর্জাতিক যাত্রীদের মাধ্যমে ফ্ল্যাশ ড্রাইভ, মেমোরি কার্ডের মতো বহনযোগ্য ডিভাইসে বর্তমান পরিস্থিতির ছবি, ভিডিও ও লিখিত প্রতিবেদন বিদেশে পাচার করছে।’

প্রতিবেদনে ছাত্রনেতা আরিফুল ইসলাম আদীবকে (বর্তমানে জাতীয় নাগরিক পার্টির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক) বিবিসি, এএফপি, আল-জাজিরা ও ‘বিতর্কিত গণমাধ্যম’ নেত্র নিউজের সঙ্গে তথ্য সমন্বয়ের মূল ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ‘বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের’ অভিযোগে সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশিদের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এর সূত্র ধরে সুপারিশ করা হয়, ‘এ ধরনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশেও তাৎক্ষণিক শাস্তির বিধান চালু করা যেতে পারে।’

এ ছাড়া বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের হালনাগাদ ভাড়াটিয়া তথ্য সংরক্ষণের মাধ্যমে তাদের ওপর নজরদারি বাড়ানোরও সুপারিশ করা হয় ওই নথিতে।

এতে বলা হয়, ‘প্রতিটি ঘটনায় দেখা গেছে, ঘটনার ঠিক আগে উল্লেখিত এলাকাগুলোর আবাসিক ভবনগুলোয় বিপুলসংখ্যক বহিরাগত আশ্রয় নিয়েছিল। গোয়েন্দা নজরদারি জোরদারের পাশাপাশি ওই এলাকায় বসবাসকারী স্থায়ী ও অস্থায়ী বাসিন্দাদের তথ্য সংরক্ষণ করলে এ ধরনের ঘটনা আগেই আঁচ করা সম্ভব হতে পারে।’

Related Articles

Latest Posts