গঙ্গা-কপোতাক্ষ প্রকল্প: পদ্মার দুর্বল পানিপ্রবাহে ব্যাহত সেচ কার্যক্রম

কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার মোসলেমপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল হান্নান। গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জিকে) সেচ প্রকল্পের কাছেই তার বসবাস হওয়া সত্ত্বেও সেচের পানির তীব্র সংকটে পড়েছেন তিনি।

আব্দুল হান্নান জানান, চাষাবাদের মৌসুমে সেচ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত খালটি শুকিয়ে কাঠ হয়ে থাকে। ফলে ধানক্ষেতে সেচ দেওয়ার জন্য তাকে সম্পূর্ণভাবে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভর করতে হয়। শ্যালো পাম্পের মাধ্যমে এই পানি তোলা ব্যয়বহুল।

এই পরিস্থিতিতে হান্নান এখন ইরি-বোরো চাষ থেকে সরে এসেছেন। এর পরিবর্তে তিনি বর্তমানে গম ও অন্যান্য রবি শস্য চাষে ঝুঁকেছেন, যেগুলোতে তুলনামূলক কম পানির প্রয়োজন হয়।

জিকে প্রকল্পের প্রধান উৎস পদ্মার পানির স্তর গত তিন দশক ধরে ক্রমাগত কমতে থাকায় এই সংকটের সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিমত স্থানীয় কৃষক ও পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞদের।

একই উপজেলার বাহিরচর গ্রামের কৃষক হাসান আলী মন্ডল জানান, ২৫-৩০ বছর আগে খাল থেকে পর্যাপ্ত পানি পাওয়া গেলেও এখন তা শুকিয়ে গেছে। ফলে ভূগর্ভস্থ পানি তুলতে শ্যালো পাম্প ব্যবহার করতে হচ্ছে, যেখানে বিঘাপ্রতি খরচ হচ্ছে আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা—যা ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য বহন করা প্রায় অসম্ভব।

ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অনেক নিচে নেমে যাওয়ায় অনেক এলাকায় এমনকি শ্যালো পাম্পগুলোও অকেজো হয়ে পড়েছে।

কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার নাওয়াখাড়ালা গ্রামটি এমনই একটি এলাকা, যেখানে সাধারণ শ্যালো পাম্প দিয়ে এখন আর ভূগর্ভস্থ পানি তোলা সম্ভব হচ্ছে না।

যেহেতু এই অঞ্চলে সরকারের বৃহত্তম ভূ-উপরিস্থ পানি সেচ ব্যবস্থা রয়েছে, তাই এখানে সরকারি উদ্যোগে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারের কোনো সেচ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়নি।

নাওয়াখাড়ালার কৃষক সাগর বিশ্বাস বলেন, এখন কিছু বিত্তবান ব্যক্তি নিজস্ব অর্থায়নে এলাকায় গভীর নলকূপ বসিয়েছেন। আমাদের তাদের কাছ থেকেই সেচের পানি কিনতে হচ্ছে—এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, মাগুরা ও চুয়াডাঙ্গাসহ পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোর প্রায় এক লাখ ৯৭ হাজার হেক্টর আবাদি জমিতে সেচ সুবিধা দেওয়ার লক্ষ্যে ১৯৬০-এর দশকে জিকে (গঙ্গা-কপোতাক্ষ) প্রকল্প শুরু হয়েছিল।

এই প্রকল্পে নিরবচ্ছিন্ন পানি সরবরাহ মূলত পদ্মার পানি প্রবাহের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু ১৯৭৫ সালে ফারাক্কা বাঁধ চালু হওয়ার পর থেকে এই প্রবাহ ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) একজন কর্মকর্তা জানান, ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পানি বণ্টন চুক্তির পর এই প্রকল্প এলাকা কিছু পানি পেতে শুরু করে। তবে ভারত উজানে গঙ্গার পানি প্রত্যাহার করে নেওয়ায় পানির পরিমাণ প্রায়ই কমে যায়।

জিকে প্রকল্প পাম্প স্টেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মিজানুর রহমান জানান, নদীর পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় যান্ত্রিক বিপর্যয় বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে অতীতে অনেকবার বিশাল ইনটেক পাম্পগুলো পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হয়েছে।

তিনি আরও যোগ করেন, পাম্পগুলো চালানোর জন্য পদ্মার পানির স্তর কমপক্ষে চার দশমিক ২০ মিটার থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে যখন নদীর পানির স্তর এর নিচে নেমে যায়, তখন আর পাম্প চালানো সম্ভব হয় না।

১৯৩ কিলোমিটার প্রধান খাল, ৪৬৭ কিলোমিটার শাখা খাল এবং ৯৯৫ কিলোমিটার প্রশাখা খালের সমন্বয়ে জিকে প্রকল্পের সেচ নেটওয়ার্কটি পরিকল্পিত ও তৈরি করা হয়েছিল।

স্থানীয়রা জানান, যদিও প্রধান খালগুলো এখনো কোনোমতে সচল রয়েছে, তবে পানির তীব্র সংকটের কারণে প্রায় অর্ধেক শাখা ও  প্রশাখা খাল এরইমধ্যে ব্যবহারের অনুপযোগী বা অকেজো হয়ে পড়েছে।

প্রকল্প কর্মকর্তারা জানান, তারা খালগুলোতে নিয়মিত খনন (ড্রেজিং) কাজ চালিয়ে থাকেন, তবে সবকটি খালকে পুনরায় সচল করতে একটি সমন্বিত এবং বড় আকারের খনন প্রকল্প প্রয়োজন।

১৯৭৫ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে গঙ্গা নদীতে দুই হাজার ৩০৪ মিটার দীর্ঘ ফারাক্কা বাঁধ চালু হওয়ার পর থেকেই পদ্মার পরিবেশগত বিপর্যয় শুরু হয়।

উজানে অবস্থিত এই বাঁধ বিশেষ করে সংকটময় শুষ্ক মৌসুমে ভাটির দেশ বাংলাদেশে পানির প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমিয়ে দিয়েছে।

ক্রমবর্ধমান এই সংকট নিরসনে বাংলাদেশ ও ভারত ১৯৯৬ সালে ৩০ বছর মেয়াদি ঐতিহাসিক গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি সই করে, যার মেয়াদ এ বছরই শেষ হতে যাচ্ছে।

ওই চুক্তির আওতায়, প্রতি বছর জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুমে উজানের পানি প্রবাহের ওপর ভিত্তি করে ভারতের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি ছাড়ার কথা।

দুই দেশের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত একটি যৌথ দল ভারতের ফারাক্কা পয়েন্ট এবং বাংলাদেশের হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পানি ছাড়ার পরিমাণ পর্যবেক্ষণ করে থাকে।

১৯৯৮ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি পরিমাণ পানি পেয়েছিল। তখন ভারত ফারাক্কা পয়েন্টে দুই লাখ কিউসেকের বেশি পানি ছেড়েছিল এবং বাংলাদেশ হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পেয়েছিল প্রায় এক দশমিক ৮২ লাখ কিউসেক পানি।

যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে কম পানি পাওয়া গিয়েছিল ১৯৯৭ সালের মার্চ মাসে। সে সময় ভারত মাত্র ৪৮ হাজার ৪৮৭ কিউসেক পানি ছেড়েছিল এবং বাংলাদেশ পেয়েছিল মাত্র ১৩ হাজার ৮২৩ কিউসেক পানি।

জেআরসির তথ্য-উপাত্ত থেকে দেখা যায়, এই পানির পরিমাণ বছর বছর পরিবর্তিত হয়েছে।

পাবনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উত্তরাঞ্চলীয় পানি বিজ্ঞান পরিমাপ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শিব্বির হোসেন বলেন, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ফারাক্কা পয়েন্টে পানির প্রবাহ ৫০ হাজার কিউসেকের নিচে নেমে গেলে পানিবণ্টনের সূত্রটি আর কার্যকর থাকে না।

তিনি আরও বলেন, পদ্মাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে নূন্যতম ৩০ হাজার কিউসেক পানির প্রবাহ প্রয়োজন।

‘পদ্মা নদীতে পানির প্রবাহ মূলত ফারাক্কা পয়েন্টে কী পরিমাণ পানি ছাড়া হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে। উজানে পানির প্রবাহ কম হলে বাংলাদেশও স্বাভাবিকভাবেই কম অংশ পায়।’

তিনি আরও যোগ করেন, ভারতের অভ্যন্তরে বেশ কিছু খালের মাধ্যমে উজানে পানি সরিয়ে নেওয়ার কারণে পদ্মায় পানির দীর্ঘমেয়াদি ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

ঐতিহাসিক ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হতে যাচ্ছে।

ঢাকা এরইমধ্যে দিল্লির সঙ্গে চুক্তি নবায়নের আলোচনা শুরু করলেও পানি বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় কর্মকর্তারা নীতি-নির্ধারকদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন যেন বাংলাদেশে পানি প্রবাহ নিশ্চিত করতে আরও জোরালো আইনি নিশ্চয়তা আদায়ের বিষয়ে আলোচনা করা হয়।

পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইফ অ্যান্ড আর্থ সায়েন্স অনুষদের ডিন নাজমুল ইসলাম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, বিদ্যমান কাঠামোটি এখন সেকেলে হয়ে পড়েছে এবং এটি বর্তমান সময়ের পরিবেশগত বাস্তবতা বিবেচনায় নিতে ব্যর্থ হচ্ছে।

চুক্তিটি পুরো বাস্তুতন্ত্র বা পরিবেশ রক্ষার পরিবর্তে কেবল পানিবণ্টনের বিষয়টিকেই অগ্রাধিকার দেয়।

তিনি আরও বলেন, বিদ্যমান চুক্তিতে মোট পানির পরিমাণ ভাগ করে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু একটি নদীর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য তার স্বাভাবিক প্রবাহের অন্তত ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ নিশ্চিত করা উচিত এবং কেবল অবশিষ্ট পানিটুকু বণ্টন করা উচিত।

Related Articles

Latest Posts