রোহিঙ্গা গণহত্যার স্বীকৃতি আদায়ে ক্যাম্পের ভেতরেই একটি ‘রোহিঙ্গা গণহত্যা সেল’ গঠন এবং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা রোহিঙ্গা প্রবাসীদের যুক্ত করে গণহত্যার স্মৃতি, অভিজ্ঞতা ও প্রমাণ সংরক্ষণের পরামর্শ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কূটনীতি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ।
রোববার কক্সবাজারে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) সম্মেলন কক্ষে ‘গণহত্যা কূটনীতি ও রোহিঙ্গা: বিচার, স্বীকৃতি এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার রাজনীতি’ শীর্ষক গবেষণা-নীতি সংলাপে তিনি এ প্রস্তাব দেন।
রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেশন ল্যাবের (আরএমএল) আয়োজনে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ওয়েলসের সহযোগিতায় এবং ব্রিটিশ একাডেমির অর্থায়নে এ সংলাপ হয়।
অনুষ্ঠানে অধ্যাপক নাসির উদ্দিন, ড. পলাশ কামরুজ্জামান ও ড. বায়েস আহমেদ সম্পাদিক ‘পলিটিক্স অব ডিনায়াল অ্যান্ড নন-রিকগনিশন অব জেনোসাইড: দ্য কেস অব দ্য রোহিঙ্গা’ গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করা হয়।
অধ্যাপক ইমতিয়াজ বলেন, গণহত্যা নিয়ে গবেষণার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মানুষকে সংবেদনশীল ও সচেতন করে তোলা, যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আর না ঘটে। কিন্তু একের পর এক গণহত্যা ঘটতে থাকায় সেই প্রচেষ্টার সীমাবদ্ধতা নিয়েও নতুন করে ভাবতে হবে।
রোহিঙ্গা গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অন্যান্য গণহত্যার ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী জনগোষ্ঠীই স্বীকৃতির লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রেও সেই দায়িত্ব তাদের নিজেদের নিতে হবে।
‘ক্যাম্পের ভেতরেই একটি রোহিঙ্গা গণহত্যা সেল গঠন করা যেতে পারে,’ বলেন তিনি।
তার মতে, ওই সেলের সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা রোহিঙ্গা প্রবাসীদের যুক্ত করতে হবে। গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও নথি সংগ্রহ করে একটি আর্কাইভ গড়ে তুলতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এসব তথ্য দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণ করা সম্ভব বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেন, রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু মানবিক সংকট হিসেবে দেখার মধ্যে একটি বড় ঝুঁকি রয়েছে।
তিনি বলেন, খাবার, পানি, আশ্রয়, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা পূরণ করতে গিয়ে বাস্তুচ্যুতির মূল রাজনৈতিক কারণটি আড়ালে পড়ে যেতে পারে। রোহিঙ্গারা শুধু মানবিক সহায়তার গ্রহীতা নয়, তাদের রাজনৈতিক অধিকার ও মর্যাদার বিষয়টিও আলোচনায় থাকতে হবে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল এএসএম রিদওয়ানুর রহমান রোহিঙ্গাদের পরিচয় সংকটকে প্রত্যাবাসন আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেন। তার মতে, আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি ট্র্যাক-১, ট্র্যাক-২ ও ১.৫ ট্র্যাক কূটনীতির মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের পরিচয় ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে আন্তর্জাতিক সমর্থন তৈরি করতে হবে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয়ের অতিরিক্ত কমিশনার নাজমুল ইসলাম ভুঁইয়া বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে প্রধান বাধাগুলো চিহ্নিত করতে গবেষকদের আরও কাজ করা দরকার। জাতিসংঘ, আসিয়ান, ওআইসি ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা সংকট মোকাবিলায় কী ভূমিকা রাখতে পারত এবং কী করেনি, তাও গবেষণায় উঠে আসা প্রয়োজন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মিয়ানমার অনুবিভাগের পরিচালক নির্ঝর অধিকারী বলেন, ১৯৭৮ ও ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমান সংকট সমাধানের পথ খুঁজতে হবে।
তিনি আরও বলেন, গবেষকদের কাছ থেকে পর্যাপ্ত তথ্য ও বিশ্লেষণ পাওয়া গেলে প্রত্যাবাসনের জন্য ইতোমধ্যে বিবেচিত পাঁচটি পথের পাশাপাশি নতুন কোনো পথও তৈরি করা সম্ভব।
রোহিঙ্গা প্রতিনিধি আনামুল হাসান নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, গণহত্যা কেবল বইপুস্তকে পড়া কোনো বিষয় নয়। এটি আমাদের মানুষের স্মৃতিতে এবং হারিয়ে যাওয়া স্বজনদের মধ্যে বেঁচে আছে।

