মুহূর্তটি এতটাই ক্ষণস্থায়ী ছিল যে চোখের পলক ফেললেই মিস হয়ে যেতে পারত। অথচ সেই এক মুহূর্তই বেঁচে আছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। লক্ষ লক্ষ গোলের ভিড়ে হারিয়ে যায় অসংখ্য স্মৃতি, কিন্তু কিছু গোল সময়ের গায়ে দাগ কেটে দেয়। সেগুলো আর কেবল গোল থাকে না; হয়ে ওঠে ইতিহাস, বিতর্ক, রাজনীতি, আবেগ আর কিংবদন্তির এক অদ্ভুত মিশ্রণ।
সেই রকমই একটি মুহূর্তের নাম ‘ঈশ্বরের হাত’।
একটা হাত। মাত্র একটা হাত। সেই হাত সেদিন পুরো একটা জাতির প্রতিশোধ নিয়েছিল, একটা যুদ্ধের ক্ষত সারিয়েছিল, এবং ফুটবলের ইতিহাসে এমন একটা মুহূর্ত তৈরি করেছিল যা আজও রেফারি, খেলোয়াড় আর দর্শকদের রাতের ঘুম কেড়ে নেয়। আর একজন মানুষ, যার নাম শুনলেই ফুটবলের ইতিহাস যেন একটু থমকে দাঁড়ায়, দিয়েগো ম্যারাডোনা।
আজও পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে ফুটবলপ্রেমীদের আড্ডায় যদি জিজ্ঞেস করা হয়, সবচেয়ে বিতর্কিত গোল কোনটি? খুব সম্ভবত সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত উত্তর হবে এই একটি নাম। কারণ এটি কেবল নিয়ম ভাঙার গল্প নয়। এটি এমন একটি ঘটনার গল্প, যেখানে সত্য ও মিথ, ন্যায় ও অন্যায়, প্রতিভা ও প্রতারণা সবকিছু এক হয়ে গেছে।
দিনটি ছিল ২২ জুন, ১৯৮৬। বিশ্বকাপ ফুটবলের কোয়ার্টার ফাইনাল।
তবে আর্জেন্টিনার মানুষের কাছে এটি নিছক কোনো ফুটবল ম্যাচ ছিল না। চার বছর আগের ফকল্যান্ড বা মালভিনাস যুদ্ধের দগদগে ক্ষত তখনো প্রতিটি আর্জেন্টাইনের বুকে রক্তক্ষরণ ঘটাচ্ছে। আটলান্টিকের হিমশীতল জলে ব্রিটিশ বাহিনীর হাতে প্রাণ হারানো শত শত তরুণ সেনার আর্তনাদ যেন প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল মেক্সিকোর বাতাসে। ম্যারাডোনা ও তার সতীর্থদের চোখেমুখে ছিল সেই না-বলা প্রতিশোধের আগুন। গ্যালারিতে তখন দুই দেশের সমর্থকদের মধ্যে চলছে স্নায়ুযুদ্ধ, আর মাঠের ভেতরে তৈরি হয়েছে এক অদৃশ্য কুরুক্ষেত্র।
ম্যাচের প্রথমার্ধ শেষ হয়েছে গোলশূন্য ড্রয়ে। ইংরেজ ডিফেন্ডারদের কড়া ট্যাকল আর পাহারায় বারবার ব্যাহত হচ্ছিল ম্যারাডোনার জাদুকরী ছন্দ। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে দৃশ্যপট পাল্টাতে শুরু করল। ৫১তম মিনিটে ম্যারাডোনা বল নিয়ে ড্রিবল করে এগিয়ে গেলেন বক্সের কাছাকাছি, পাস দিলেন সতীর্থ হোর্হে ভালদানোকে। কিন্তু ইংরেজ মিডফিল্ডার স্টিভ হজ বলটি ক্লিয়ার করতে গিয়ে মারাত্মক এক ভুল করে বসলেন। তার পা ছুঁয়ে বলটি সোজা উঠে গেল নিজেদের পেনাল্টি বক্সের আকাশে।
আর ঠিক তখনই, যেন কোনো অদৃশ্য সুতোর টানে, এক শিকারি বাজের মতো সেই বলের পিছু পিছু ধেয়ে গেলেন ম্যারাডোনা।
বলের দখল নিতে নিজেদের গোলপোস্ট ছেড়ে দ্রুত এগিয়ে এলেন ইংল্যান্ডের দীর্ঘদেহী গোলরক্ষক পিটার শিলটন। ৬ ফুট ১ ইঞ্চি উচ্চতার শিলটনের সঙ্গে ৫ ফুট ৫ ইঞ্চির ম্যারাডোনার শারীরিক কোনো তুলনাই চলে না। তার ওপর গোলরক্ষক হাত ব্যবহার করতে পারেন। গ্যালারির সবাই ধরে নিয়েছিল, শিলটনের বিশাল গ্লাভস জোড়াই অনায়াসে লুফে নেবে বলটি।
কিন্তু ম্যারাডোনার মাথায় তখন খেলছে অন্য এক দুরন্ত হিসাব, ল্যাটিন আমেরিকার অলিগলিতে বেড়ে ওঠা এক চতুর বালকের মগজাস্ত্র। তিনি শূন্যে লাফ দিলেন, নিজের শরীরের সবটুকু শক্তি ও স্প্রিংয়ের মতো পেশিগুলো ব্যবহার করে। শিলটনের প্রসারিত হাতের চেয়েও এক চুল ওপরে ওঠার এক মরিয়া, প্রায় অসম্ভব চেষ্টা।
ঠিক সেই ভগ্নাংশ সেকেন্ডের মুহূর্তে, যখন বলটি শিলটনের হাতের নাগালে চলে এসেছে, তখনই ঘটল সেই অবিশ্বাস্য ঘটনা। নিজের মাথার ঠিক পাশ ঘেঁষে অত্যন্ত সুকৌশলে বাঁ হাতটা তুলে আনলেন ম্যারাডোনা। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই, শিলটনের গ্লাভসকে বোকা বানিয়ে ম্যারাডোনার মুষ্টিবদ্ধ হাতের আলতো, অথচ নিখুঁত ছোঁয়ায় বলটি দিক পরিবর্তন করল। এরপর ঘাসের ওপর এক টপ্পা খেয়ে বলটি যখন ইংল্যান্ডের জালে জড়িয়ে গেল, আজতেকা স্টেডিয়াম তখন ফেটে পড়েছে এক বুনো, আদিম উল্লাসে।
মাটিতে পড়েই ম্যারাডোনা আড়চোখে তাকালেন রেফারির দিকে। যখন দেখলেন বাঁশি বাজেনি, তখন তিনি ছুটতে শুরু করলেন কর্নার ফ্ল্যাগের দিকে। সতীর্থরা প্রথমে দ্বিধায় ছিল। ম্যারাডোনা তখন চিৎকার করে ডাকছেন, ‘এসো, আমাকে জড়িয়ে ধরো! নাহলে রেফারি গোল বাতিল করে দেবে!’
ওদিকে ইংরেজ খেলোয়াড়রা তখন ক্ষোভে, হতাশায় ফেটে পড়েছেন। টেরি ফেনউইক, গ্লেন হডল আর পিটার শিলটন ছুটে গেলেন তিউনিসিয়ান রেফারি আলি বিন নাসেরের দিকে। সবার চোখেমুখে একটাই তীব্র অভিযোগ, ওটা হাত দিয়ে করা গোল!
কিন্তু রেফারির চোখ সেই জাদুকরী হাতের সূক্ষ্ম কারসাজি ধরতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হলো। তিনি তাকিয়েছিলেন লাইন্সম্যান বোগদান দোচেভের দিকে। বুলগেরিয়ান এই লাইন্সম্যানও নিজের জায়গায় স্থির, তার পতাকা ওঠেনি। ফলে গোল বহাল রইল।
ম্যারাডোনার সেই নিপুণ অভিনয় সেদিন বোকা বানিয়েছিল মাঠে উপস্থিত রেফারি থেকে শুরু করে পুরো ফুটবল বিশ্বকে। ইংরেজদের কান্না আর প্রতিবাদ সেদিন মেক্সিকোর বাতাসে হারিয়ে গিয়েছিল।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই ঘটনার ঠিক চার মিনিট পরেই ম্যারাডোনা এমন এক কাণ্ড ঘটালেন, যা তার আগের ওই বিতর্কিত কাজটিকেও ছাপিয়ে গেল। নিজেদের অর্ধাংশ থেকে বল টেনে নিয়ে, ছয়জন ইংরেজ খেলোয়াড়কে পরাস্ত করে তিনি করলেন ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ বা শতাব্দীর সেরা গোল। যেন তিনি বিশ্বকে বুঝিয়ে দিলেন, ছলনা তার সাময়িক অস্ত্র হতে পারে, কিন্তু অতিপ্রাকৃত ফুটবল-প্রতিভা তার জন্মগত অধিকার।
ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের তীক্ষ্ণ প্রশ্নের মুখে পড়ে ম্যারাডোনা জন্ম দিলেন ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত ও কাব্যিক উক্তিটির। মুচকি হেসে, চোখে এক অদ্ভুত দ্যুতি নিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘গোলটা কিছুটা ম্যারাডোনার মাথা দিয়ে, আর কিছুটা ঈশ্বরের হাত দিয়ে করা।’
সেই থেকে এই গোলটি ফুটবল ইতিহাসে ‘হ্যান্ড অব গড’ বা ‘ঈশ্বরের হাত’ নামে অমর হয়ে যায়। এটি কি স্রেফ প্রতারণা ছিল? নাকি ল্যাটিন আমেরিকার ‘ভিভেজা ক্রিওলা’ বা চতুরতার চূড়ান্ত রূপ?
ইংরেজদের চোখে যা ছিল ক্ষমার অযোগ্য চুরি, আর্জেন্টাইনদের কাছে তা হয়ে উঠল এক মহাকাব্যিক প্রতিশোধ। এক জাতির দীর্ঘশ্বাসের উপশম, এক অবিস্মরণীয় মিথের জন্ম, এবং ফুটবলের মাঠে এক বিদ্রোহী ঈশ্বরের অমর স্বাক্ষর।

