‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া-২’ চুক্তি কী, পুতিনের চীন সফরে কি চূড়ান্ত হবে?

বর্তমানে রাশিয়ার জ্বালানি পণ্যের অন্যতম বড় ক্রেতা চীন। বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল ও গ্যাস আমদানিকারক দেশ এটি।

চীনে বিলিয়ন ডলারের প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের জন্য নতুন পাইপলাইন ‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া-২’ নির্মাণে বহু বছর ধরে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে রাশিয়া। তবে বেইজিংয়ের সতর্ক অবস্থানের কারণে প্রকল্পটি ধীর গতিতে চলছে।

দীর্ঘ আলোচনার পর গত বছর সেপ্টেম্বরে এই নতুন গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণে সমঝোতা স্মারক সই করে দুই দেশ। তবে গ্যাসের দাম নির্ধারণসহ অনেক বিষয় অস্পষ্ট রয়ে গেছে।

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের এবার ২৫তম বেইজিং সফরকে ঘিরে আবারও আলোচনায় ‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া-২’। ক্রেমলিন ইতোমধ্যে জানিয়েছে, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে প্রস্তাবিত এই গ্যাস পাইপলাইন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।

বার্তাসংস্থা এএফপি ও রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ নিয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া ২’ হলো ২ হাজার ৬০০ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইন। যা আর্কটিক অঞ্চলের উত্তর সাইবেরিয়ার ইয়ামাল গ্যাসক্ষেত্র থেকে মঙ্গোলিয়া হয়ে চীনে গ্যাস সরবরাহ করবে।

এই পাইপলাইনের মাধ্যমে বছরে ৫ হাজার কোটি ঘনমিটার গ্যাস পরিবহনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। যা ২০২৫ সালে চীনের সম্ভাব্য মোট গ্যাস ব্যবহারের প্রায় ১২ শতাংশের সমান।

এটি নির্মাণ করবে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান গ্যাজপ্রম। প্রতিষ্ঠানটি ২০২০ সালে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু করে এবং ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ৩০ বছরের জন্য আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক গ্যাস সরবরাহ স্মারক সইয়ের ঘোষণা দেয়।

রাশিয়ার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই গ্যাস এমন ক্ষেত্র থেকে সরবরাহ করা হবে, যেখান থেকে আগে ইউরোপে গ্যাস রপ্তানি করা হতো।

২০২২ সালে ইউক্রেনে হামলার পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে ইউরোপের বেশিরভাগ গ্রাহক হারায় রাশিয়া। যে কারণে এ প্রকল্পটি রাশিয়ার কাছে এতো গুরুত্বপূর্ণ।

ইউনিভার্সিটি অফ নিউ সাউথ ওয়েলস সিডনির রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলেকজান্ডার কোরোলেভ এএফপিকে বলেন, ‘ইউরোপীয় গ্যাস বাজারের বড় অংশ হারানোর পর রাশিয়ার জন্য এটি একটি কৌশলগত পদক্ষেপ।’

তিনি আরও বলেন, ‘চীনের জন্য এই পাইপলাইন মূলত জ্বালানি নিরাপত্তা ও কৌশলগত সুবিধার বিষয়। এটি নির্ভরশীলতা বাড়ানোর চেয়ে সমুদ্রপথের ঝুঁকি এড়িয়ে জ্বালানির উৎসকে বৈচিত্র্যময় করার সুযোগ দেবে।’

‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া ১’ পাইপলাইন চালু হয় ২০১৯ সালে। প্রায় চার হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপের মাধ্যমে পূর্ব সাইবেরিয়া থেকে উত্তর-পূর্ব চীনে বছরে প্রায় তিন হাজার ৪০০ কোটি ঘনমিটার গ্যাস সরবরাহ করা যায়।

গত বছর এর সক্ষমতা বাড়িয়ে চার হাজার ৮০০ কোটি ঘনমিটার করা হয়।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিদ্যমান ‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া-১’ পাইপলাইনের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে নতুন পাইপলাইন।

তবে উৎস, রুট ও সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা—সব ক্ষেত্রেই আলাদা এই দুই পাইপলাইন।

‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া ১’ মূলত পূর্ব এশিয়ার জন্য সম্পূর্ণ নতুন গ্যাস ক্ষেত্র তৈরি করেছে। অন্যদিকে ‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া-২’ চীনের সঙ্গে ইউরোপের গ্যাস সরবরাহ লাইনকেও যুক্ত করছে।

প্রথম পাইপলাইনটি সাইবেরিয়া থেকে চীনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। অন্যদিকে নতুন লাইনটি মঙ্গোলিয়া হয়ে চীনে প্রবেশ করে এবং দৈর্ঘে এটি ৫ হাজার কিলোমিটারের বেশি।

মূলত গ্যাসের মূল্য নিয়ে মতবিরোধের কারণে প্রকল্পটির অগ্রগতি থমকে আছে। এখনো নির্মাণকাজ শুরু হয়নি।

রাশিয়া চায়, এই পাইপলাইনের গ্যাসের দাম ইউরোপে রুশ গ্যাস সরবরাহের মতো বাজারভিত্তিক সূত্র অনুযায়ী নির্ধারণ করা হবে।

অন্যদিকে চীন এ বিষয়ে খুব কমই মন্তব্য করেছে। এমনকি গত বছর চুক্তি সইয়ের পর চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে ‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া-২’-এর উল্লেখ ছিল না।

রাশিয়াভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি অ্যান্ড ফাইন্যান্সের প্রধান আলেক্সেই গ্রোমভ বলেন, ‘চীনের অবস্থান ছিল এমন—প্রকল্পটি হলে ভালো, না হলেও খুব সমস্যা নেই।’

বিশ্লেষকদের মতে, চীন অনেক বেশি সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। তার কারণ হলো, তারা বিভিন্ন দেশ থেকে জ্বালানি আমদানি করে ভারসাম্য বজায় রাখতে চায় এবং কোনো একক উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হতে চায় না।

রাশিয়া ছাড়াও বর্তমানে আরও কয়েকটি পাইপলাইনের মাধ্যমে মধ্য এশিয়া ও মিয়ানমার থেকে গ্যাস আমদানি করে চীন।

২০২৫ সালে পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রায় ৫ কোটি ৯৪ লাখ টন গ্যাস আমদানি করে দেশটি।

ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ছাড়মূল্যে রুশ তেল কেনা বাড়িয়েছে চীন।

চীনের শুল্ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে রাশিয়া থেকে ২৩০ কোটি ডলারের গ্যাস আমদানি করেছে চীন। যা ২০২২ সালের তুলনায় তিনগুণ বেশি।

কোরোলেভ বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক গভীর হওয়ার মূলে রয়েছে রাশিয়ার জ্বালানি।’

তিনি আরও বলেন, ‘নতুন পাইপলাইন বাস্তবায়িত হলে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা আরও বাড়বে। একইসঙ্গে রাশিয়া যে আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে নয় সেটিও প্রমাণিত হবে।’

এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালি বন্ধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তৈরি হওয়া অস্থিরতার কারণে এখন পরিস্থিতি বদলাতে পারে।

লন্ডনের কিংস কলেজের আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বিভাগের শিক্ষক নাতাশা কুহর্ট এএফপিকে বলেন, ‘বর্তমান জ্বালানি সংকট রাশিয়ার নতুন পাইপলাইন নির্মাণের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রথম পাইপলাইন বাস্তবায়নে প্রায় ২০ বছর লেগেছিল। দাম নিয়ে দরকষাকষিতেও অনেকটা জয়ী চীন। দ্বিতীয় পাইপলাইনেও সব সুবিধা চীনের হাতে থাকবে।’

রাশিয়া আশাবাদী হলেও পুতিনের এই সফরেই চুক্তি চূড়ান্ত হবে কিনা তা বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।

আলেক্সেই গ্রোমভের মতে, পূর্ণাঙ্গ চুক্তির সম্ভাবনা অনেক বেশি।

তবে আরেক বিশ্লেষক আলেকজান্ডার কোরোলেভের ধারণা, এ সফরে সমর্থন পেলেও চূড়ান্ত চুক্তি নাও হতে পারে।

Related Articles

Latest Posts