ট্র্যাকের বিষণ্ণ শূন্যতা: হারিয়ে যাচ্ছে নারী অ্যাথলেটদের পদধ্বনি?

রোববার ৪৯তম জাতীয় অ্যাথলেটিকস চ্যাম্পিয়নশিপে ১০০ মিটারে দ্বিতীয় হয়েছেন শরিফা খাতুন। বুকে পদক, চোখে তৃপ্তি। খুব শিগগিরই তিনি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে দক্ষিণ সুদানে পাড়ি জমাবেন। এটি হয়তো তার শেষ জাতীয় প্রতিযোগিতা। খুলনার এই স্প্রিন্টার গত ১২ বছর ধরে সেনাবাহিনীতে আছেন। এই খেলাই তাকে এনে দিয়েছে এই চাকরি। তাই গর্বের সঙ্গে বলতে পারেন, ‘কখনো মনে হয়নি ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ কিন্তু শারিফার এই আত্মবিশ্বাসী পথচলার পাশে যদি একটু দাঁড়িয়ে ট্র্যাকের দিকে তাকানো যায়, দেখা যাবে, এই পথে মেয়েদের পদচিহ্ন ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে।

৪৭তম জাতীয় অ্যাথলেটিক্স প্রতিযোগিতায় নারী অ্যাথলেট ছিলেন ১৪৬ জন। ৪৮তম আসরে সেই সংখ্যা নামে ১০৭-এ। আর চলমান আসরে ৪৫টি সংস্থার ৪১০ জন অ্যাথলেটের মধ্যে নারী মাত্র ৯৮ জন। তিন বছরে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমে গেছে নারীর উপস্থিতি। যদিও এ বছরে কমেছে ছেলেদের সংখ্যাও। সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়, এগুলো এক একটি গল্পের অনুপস্থিতি। যে মেয়েটি আসেনি, সে কেন আসেনি, সেই প্রশ্নটাই এখন সবচেয়ে জরুরি।

উত্তর খুঁজতে গিয়ে প্রথমেই যে কথাটা বারবার উঠে আসে, সেটা হলো ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা। নেত্রকোনা জেলা ক্রীড়া সংস্থার কোচ মোখলেসুর রহমান আশির দশক থেকে এই ট্র্যাকের মানুষ। বললেন, ‘জেলায় ভালো করলাম, বিভাগে ভালো করলাম, কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে কিছু হলো না, তখন কেউ দেখে না। পরিবারের কাছে সেটা দায় হয়ে যায়।’ একটি মেয়েকে বছরের পর বছর ট্র্যাকে দৌড়াতে পাঠানো মানে শুধু শারীরিক পরিশ্রম নয়, একটি পরিবারের স্বপ্ন আর আর্থিক বিনিয়োগও। সেই বিনিয়োগের শেষে যদি কোনো নিশ্চয়তা না থাকে, তাহলে পরিবার পিছিয়ে আসে।

একসময় এই নিশ্চয়তার জায়গাটা পূরণ করত বিটিএমসি, বিজিএমসি, কাস্টমস, রেলওয়ের মতো সংস্থাগুলো। অ্যাথলেটিক্স ফেডারেশনের অ্যাডহক কমিটির সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম মনে করিয়ে দিলেন সেই দিনগুলোর কথা। ‘আগে বারো থেকে পনেরোটি সার্ভিস দল ছিল। একটি সংস্থা দশ হাজার টাকা বেতন দিলে আরেকটি পনেরো হাজার দিয়ে খেলোয়াড় নিয়ে যেত। এই প্রতিযোগিতায় খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স আর আয় দুটোই বাড়ত।’ নিজের কথাই বললেন তিনি, চারটি স্বর্ণপদকের বিনিময়ে বিজেএমসি তাকে সরাসরি অফিসার পদে এবং আটটি ইনক্রিমেন্ট দিয়ে নিয়েছিল। সেই ব্যবস্থা এখন কার্যত নেই। এখন কেবল সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনী খেলোয়াড় নেয়, তাও সীমিত সংখ্যায়।

সাবেক হার্ডলার সুমিতা রানী এই ব্যর্থতার দায় সরাসরি দেন ফেডারেশনকে। তার কথায় ক্ষোভ আর বেদনা মিলিয়ে আছে। ‘আমরা যখন খেলেছি, দীর্ঘমেয়াদী ক্যাম্পিং ছিল, পরপর গেম হতো, স্পনসর ছিল। এখন এগুলো নেই।’ তিনি মনে করেন, ফেডারেশনকে জেলা পর্যায়ে সক্রিয়ভাবে যোগাযোগ রাখতে হবে, ইকুইপমেন্ট ও সহায়তা দিতে হবে। নোয়াখালীতে একসময় অনেক অ্যাথলেট উঠে এসেছিল কেবল এই সংযোগটা থাকার কারণেই। সুমিতা একটু থামলেন, তারপর বললেন, ‘হার্ডলসে আমার মতন কেউ নেই। ১০০ মিটারেও দেখুন। শিরিন আর কিছু নাম ছাড়া তেমন কেউ নেই। কারণটা বুঝে নিন।’

কারণের আরেকটি স্তর আছে, যেটা নিয়ে কথা বলতে একটু সংকোচ থাকলেও সবাই বললেন। সেটা হলো সমাজ। মোখলেসুর রহমান বললেন তার জেলার একটি মেয়ের কথা। সাঁতারে ভালো ফল করেছিল, বিভাগীয় পর্যায়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল, কিন্তু অভিভাবক যেতে দেননি। কারণ হিসেবে বললেন, ‘এত বড় মেয়ে খেলতে যাবে, এটা পাপ।’ তার পর্যবেক্ষণ স্পষ্ট, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ধর্মীয় রক্ষণশীলতার প্রসার মেয়েদের খেলাধুলায় আসার পথটাকে আরও সংকীর্ণ করে দিচ্ছে।

শারিফা খাতুনও একই কথা ঘুরিয়ে বললেন। ‘হাফ প্যান্ট পরে দৌড়ানো অনেক জায়গায় পছন্দ করে না। অনেক জায়গা থেকে মেয়েদের আসতে দেওয়া হয় না। এটাও একটা কারণ হতে পারে।’ সাম্প্রতিক সময়ে ধর্মীয় সামাজিক প্রভাব বেড়েছে বলে যে পর্যবেক্ষণ, তার প্রতিফলন মাঠেও পড়ছে।

এই চাপটা সবচেয়ে বেশি অনুভব করে গ্রামের মেয়েরা। ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্রী স্মৃতি আক্তার আজ ট্র্যাকে নেমেছেন পরিবারের সমর্থন নিয়ে। কিন্তু তার পাড়ার বেশিরভাগ মেয়ে আসতে পারেনি। ‘গ্রামাঞ্চলে মেয়েরা খেললে মানুষ অনেক কথা বলে। পারিবারিক কারণে, ধর্মীয় কারণে অনেকে আসতে পারে না।’ একই জেলার ইয়াসমিন আক্তারও বললেন, যদি সরকার থেকে প্রচার করা হতো যে খেলাধুলায় ভালো সুযোগ-সুবিধা আছে, তাহলে বাবা-মায়েরা হয়তো মেয়েদের খেলতে ছেড়ে দিতেন।

সমস্যার গভীরে আরও একটি কারণ লুকিয়ে আছে, যেটা কাঠামোগত। মোখলেসুর রহমান বললেন, তার জেলায় শেষবার জেলা পর্যায়ে অ্যাথলেটিক্স হয়েছিল ১৯৮৬ সালে। চল্লিশ বছর ধরে জেলায় কোনো প্রতিযোগিতা নেই। তৃণমূলে প্রতিভা তৈরি না হলে জাতীয় পর্যায়ে মুখ কোথা থেকে আসবে? শাহ আলমও বললেন, এবার অনেক জেলা দল পাঠাতেই পারেনি, কারণ কমিটি গঠন নিয়ে ব্যস্ততায় খেলোয়াড় প্রস্তুত করার সময়ই হয়নি। ৬৪ জেলা ও ৮ বিভাগ মিলিয়ে ৭২টির মধ্যে এসেছে মাত্র ২০টির মতো। আর সংখ্যার এই কমতি দেখে হতাশা প্রকাশ করেছেন অনুষ্ঠান উদ্বোধন করতে আসা প্রধান অতিথি যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকও।

এত কারণের ভেতরেও শারিফা খাতুনের মতো কেউ কেউ টিকে থাকেন, পদক জেতেন, মিশনে যান। স্মৃতি বা ইয়াসমিনের মতো কেউ কেউ স্বপ্ন নিয়ে ট্র্যাকে নামেন ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে। কিন্তু এই ব্যক্তিগত সাহস পুরো ছবিটা বদলে দেয় না। ট্র্যাকে যে আলো কমছে, সেটা সংখ্যায় স্পষ্ট, এবং সেই সংখ্যার পেছনে আছে পরিবারের ভয়, সমাজের চোখ, রাষ্ট্রের উদাসীনতা আর একটি ব্যবস্থার ধীর ক্ষয়। শারিফারা মিশনে গেলে তার জায়গায় কে আসবেন, সেই প্রশ্নটার জবাব এখনো তৈরি নেই।
 

Related Articles

Latest Posts