যে কারণে আর কখনোই অভিনয়ে ফিরবেন না শান্তা ইসলাম

শান্তা ইসলাম টেলিভিশন নাটকের দর্শকপ্রিয় অভিনয়শিল্পী। একটা সময় অসংখ্য নাটকে অভিনয় করে তুমুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন তিনি। চলচ্চিত্রে অভিনয় করে পেয়েছেন জাতীয় পুরস্কার। আরণ্যক নাট্যদলের ‘ময়ুর সিংহাসন’, ‘জয়জয়ন্তী’, ‘আগুনমুখা’ নাটকে অভিনয় করে মঞ্চেও প্রশংসা কুড়িয়েছেন। 

কিন্তু, টানা ২১ বছর ধরে অভিনয় থেকে দূরে আছেন শান্তা ইসলাম। আর কখনো অভিনয় জগতে ফিরবেন না—এমনটাই তার সিদ্ধান্ত। 

দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে শান্তা ইসলাম বলেছেন অভিনয়ে না ফেরার সিদ্ধান্তের পেছনের কারণগুলো ।

শান্তা ইসলাম বলেন, ‘সর্বশেষ ২১ বছর আগে একটি নাটকে অভিনয় করি। ওই নাটকের নামটাও এ মুহূর্তে মনে পড়ছে না। সে সময় আমার একমাত্র ছেলে সৌমিক ক্লাস ফাইভে পড়ে। আমি ঢাকা থেকে চলে গেছি সিলেটে মায়ের কাছে। স্বামীর সঙ্গে দূরত্ব হয়েছে। পারিবারিকভাবে আমরা দুজনে বিচ্ছিন্ন। হঠাৎ একদিন সৌমিক বলল, মা আমি কী ক্লাস সিক্সে ভর্তি হব না? আমাকে কথাটা নাড়া দেয়। আমি বারবার ভাবতে শুরু করি। মাকে বলি, আমাকে বিমানের টিকিট কেটে দাও। আমি ঢাকায় যাব, সৌমিককে স্কুলে ভর্তি করাব।’

সে সময়ের স্মৃতি বলতে গিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘মা টিকিট কেটে দেওয়ার পর সৌমিককে নিয়ে ঢাকায় আসি। উড়োজাহাজে বসে সেদিন চোখের পানি পড়ছিল। খুব কাঁদছিলাম। কিন্তু, ঢাকায় এসে থাকব কোথায়? সিলেট থেকেই আমার ছেলের ক্লাসমেটের বাবা-মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তারা একটি বাসার সন্ধান দেন। এরপর চলে আসি। জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু হয়।’

‘ছেলেকে ভর্তি করালাম। সে সময় ক্যারিয়ার নিয়ে অনেক ব্যস্ত ছিলাম। শুটিং শেষ করতে করতে রাত হয়ে যেত প্রায়ই। ভাবলাম, নিয়মিত এত রাত করে বাসায় ফিরলে সন্তানের কী হবে? তাকে সময় দেবে কে? সিদ্ধান্ত নিলাম অভিনয় করব না। আগে সন্তান মানুষ হোক। ক্যারিয়ারের চেয়ে জীবনের অংশ আমার সন্তানের মানুষ হওয়াকে বেশি গুরুত্ব দিলাম। যে নাটকগুলোর কাজ বাকি ছিল দ্রুত শুটিং শেষ করে দিই। এরপর অভিনয় থেকে সরে আসি। চিরচেনা লাইট, অ্যাকশন, ক্যামেরা শব্দগুলো থেকে সরে যাই।’

একমাত্র ছেলেকে নিয়ে সংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে শান্তা ইসলাম বলেন, ‘তখন আমার সংগ্রাম চলছে।ছেলেকে স্কুল থেকে আনতে যেতাম। এমনও হয়েছে রিকশায় না গিয়ে হেঁটে হেঁটে গিয়েছি টাকা বাঁচানোর জন্য। দশ টাকা রিকশা ভাড়া বাঁচাতাম হেঁটে গিয়ে। কয়েক মাস এমন হয়েছে। সৌমিককে বুঝতে দিতাম না। ও জানত না আমি হেঁটে হেঁটে ওর স্কুলে যাই।’

সে সময় একদিন পাবলিক বাসে ওঠার অভিজ্ঞতা শোনান শান্তা ইসলাম। বলেন, ‘উত্তরা থেকে একদিন মগবাজারে যাব। তখন নতুন ট্যাক্সি নেমেছে। আমি একটা বাসে উঠে পড়ি। কিন্তু, একটু পর দেখি বাসের মধ্যে ফিসফাস হচ্ছে—শান্তা ইসলাম বাসে! আমি একটু পর নেমে পড়ি। বুঝতে পারি, আমার পক্ষে বাসে যাতায়াত করা সম্ভব না।’

‘তখন আমার পায়ের নিচে মাটি ছিল না। পারিবারিকভাবে বিচ্ছিন্ন হই স্বামীর সঙ্গে। আমার মা একদিন বলেছিলেন, মনে কর তোর সৌমিকের কেউ নেই। তুই আছিস শুধু। তখনই বড় একটা শক্তি পাই। ওপর থেকে কেউ যেন শক্তিটা জোগান দেয়। আমি এগিয়ে যাবার পণ করি এবং ভাবি সৌমিককে আমারই মানুষ করতেই হবে। সেজন্য প্রচুর জনপ্রিয় থাকার পরও ক্যারিয়ারের কথা ভাবিনি’, যোগ করেন তিনি।’ 

তিনি বলেন, ‘সেই সময় আমার ছেলে স্কলাস্টিকায় পড়ত। ওর স্কুলের কাছাকাছি বাসা নিই। এরপর সন্তানকে মানুষ করার জন্য এভাবেই জীবন এগিয়ে যায়। অভিনয় না করে চিন্তা করি অন্য কী করা যায়। আরটিভিতে টক শো করার বিষয়টি একসময় চূড়ান্ত হলো। আমার পরিচালনা, উপস্থাপনা ও পরিকল্পনায় টক শো করি। ছেলেকে সময় দেওয়ার ফাঁকে ফাঁকে কাজগুলো করি। তখন অবশ্য সৌমিক বেশ বড় হয়ে গেছে’।

শান্তা ইসলাম বলেন, ‘একসময় আমার ছেলে এ লেভেল এবং ও লেভেলে ভালো রেজাল্ট করে কানাডায় পড়তে যায়। পুরো স্কলারশিপ পায় সে। এখন তো চাকরি করছে। বিয়ে করেছে। আমার একটা নাতনিও আছে। ছেলের সুখ আমাকে সুখী করে। ওর জন্য এমন একটা জীবনই চেয়েছিলাম।’

দ্য ডেইলি স্টার: কিন্তু, আপনার সন্তান বড় হওয়ার পর তো আবার অভিনয়ে ফিরতে পারতেন?’

শান্তা ইসলাম: কোনো একদিন মা একটা কাজ দেখে বলেছিলেন, এসব চরিত্র না করলে হয় না? মায়ের কথা আমাকে ধাক্কা দেয়। আমি সিদ্ধান্ত নিই অভিনয় করব না।

প্রয়াত চলচ্চিত্র পরিচালক খালিদ মাহমুদ মিঠু তার সিনেমায় অভিনয় করতে বলেছিলেন অনেক দিন আগে। 

সে কথা মনে করে শান্তা ইসলাম বলেন, ‘মিঠু ভাই আমাকে তার সিনেমায় অভিনয় করার জন্য বলেছিলেন অনেক বছর আগে। আমি বলেছিলাম তিন দিন সময় দিন। তিন দিন একা একা ভাবি। ভাবার পর মনে হলো, না, আর অভিনয় করব না। তারপর সেটা তাকে জানিয়ে দেই।’ 

দ্য ডেইলি স্টার: এখন তো চাইলে অভিনয়ে ফিরতে পারেন?

শান্তা ইসলাম: আর ফেরা হবে না অভিনয়ে। অভিনয়ের প্রস্তাব যে আসে না, তা কিন্তু না। অনেক আসে। কেউ কেউ বলেন, আপনাকে কেন্দ্র করে গল্প লেখা হবে, তবুও অভিনয় করেন। মন টানে না। দেখুন, আমার জীবন নিয়ে আমি স্যাটিসফায়েড। এই জীবনে ভীষণ খুশি আমি। ভীষণ ভাবে সুখী।’

দ্য ডেইলি স্টার: কোনো ধরনের আফসোস কাজ করে কি?’

শান্তা ইসলাম: আমার সুন্দর সময়টা মা দেখে যেতে পারেননি, মাকে কাছে পাইনি। মা বিদায় নিয়েছেন। এই আফসোসটা আছে।’

Related Articles

Latest Posts