দুর্গম চরে নিরাপদ মাতৃত্বের লড়াই

২০ বছর বয়সী মুর্শিদা আক্তার মাত্র এক সপ্তাহ আগে সিরাজগঞ্জের চৌহালি উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চলের ছোট্ট একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। এই চরে সন্তান জন্ম দেওয়াটা বরাবরই আনন্দের চেয়ে বেশি আতঙ্কের।

মুর্শিদা বলেন, বছরের পর বছর আমরা এভাবেই কষ্ট করেছি। এই এলাকার নারীরা চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে যাওয়ার পথেই নৌকা বা রাস্তায় গাড়িতে সন্তান জন্ম দিতেন।

চরের দুর্গম গ্রামগুলোতে বহু বছর ধরে সন্তান জন্ম দেওয়া ছিল সময়ের সঙ্গে এক মরণপণ লড়াই। নদী পেরিয়ে, ঘোড়ার গাড়িতে কিংবা মোটরসাইকেলের পেছনে পেছনে বসে হাসপাতালে পৌঁছানোর চেষ্টা করতে হতো। অনেক মা হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই মারা যেতেন।

কাছাকাছি কোথাও সিজারিয়ান অপারেশনের ব্যবস্থা না থাকায় জটিলতায় পড়া গর্ভবতী নারীদের নদী ও ভাঙাচোরা রাস্তা পেরিয়ে দূরের হাসপাতালে যেতে হতো। অনেকেই সময়মতো পৌঁছাতে পারতেন না।

এখন সেই বাস্তবতায় কিছুটা পরিবর্তন এনেছে ব্র্যাক পরিচালিত একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র। বিচ্ছিন্ন এই এলাকায়, যেখানে আগে চিকিৎসক বা জরুরি স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ প্রায় ছিল না বললেই চলে, সেখানে এখন মাতৃত্বকালীন সেবা পাওয়া যাচ্ছে।

ব্র্যাক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মিডওয়াইফ তাহেরিমা খাতুন বলেন, বাড়িতে প্রসবের সময় মা ও শিশু—দুজনকেই মারা যেতে দেখেছি। অনেক সময় অদক্ষ দাই দিয়ে প্রসব করাতে গিয়ে শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এখানে প্রসবব্যথা উঠলে মোটরসাইকেল বা ঘোড়ার গাড়ি ছাড়া স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আনার আর কোনো উপায় থাকে না।

তিনি জানান, এলাকায় অনেক নারী বারবার গর্ভধারণ করেন। কারও কারও ১২ থেকে ১৩টি সন্তানও আছে। বাল্যবিয়েও খুব সাধারণ ঘটনা। বেশিরভাগ মেয়ের বিয়ে হয় ১৪ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে। পরিবার পরিকল্পনা সেবার সুযোগও খুব সীমিত।

তাহেরিমা বলেন, পরিবারগুলো প্রথমে বাড়িতেই প্রসব করানোর চেষ্টা করে। পরে যখন আমাদের কাছে আনা হয়, তখন মা ও শিশুর অবস্থা অনেক সংকটাপন্ন হয়ে যায়।

বাংলাদেশের দুর্গম চরাঞ্চলে নদীভাঙন ও বিচ্ছিন্নতার কারণে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া অনেক দিন ধরেই ছিল কঠিন। সেখানে চিকিৎসা পাওয়া মানেই যেন যমে-মানুষে লড়াই।

সিরাজগঞ্জের চর ঘোরজানে ব্র্যাকের চার্মস প্রকল্পের আওতায় চালু হওয়া ‘সুস্বাস্থ্য’ কেন্দ্রটি সেই পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। কেন্দ্রটি প্রায় ৩০ হাজার মানুষের সেবা দিচ্ছে, যারা আগে স্থানীয়ভাবে মাতৃত্বকালীন চিকিৎসা পেতেন না।

২৪ ঘণ্টা চালু থাকা এই কেন্দ্র থেকে নিরাপদ প্রসবসেবা, মাতৃত্বকালীন চিকিৎসা, টিকাদান, ডায়াগনস্টিক পরীক্ষা এবং টেলিমেডিসিন সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ ও বিচ্ছিন্ন এই অঞ্চলে এটি এখন ভরসার জায়গা।

তাহেরিমা বলেন, এখন প্রায় সবাই এই কেন্দ্রে আসে। কারণ চরের গ্রামগুলোতে গর্ভবতী নারীদের চিকিৎসার আর কোনো জায়গা নেই। আমরা এখানে স্বাভাবিক প্রসব (নরমাল ডেলিভারি) করাই। তবে জটিলতা দেখা দিলে রোগীদের শাহজাদপুর বা এনায়েতপুর হাসপাতালে পাঠাতে হয়।

জরুরি রোগী পরিবহনের জন্য কেন্দ্রটিতে মোটরসাইকেল ও ঘোড়ার গাড়ি প্রস্তুত রাখা হয়। তবে সরকারি হাসপাতালে পৌঁছানোর পরও অনেক নারী কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা পান না। তাই অনেকে বেসরকারি হাসপাতালে যেতে চান, যদিও সবার পক্ষে সেই খরচ বহন করা সম্ভব হয় না।

তাহেরিমা বলেন, সেসব ক্ষেত্রে ব্র্যাক রেফার করা রোগীদের পাঁচ হাজার টাকা সহায়তা দেয়।

তিনজন মিডওয়াইফ, একজন প্যারামেডিক এবং ২৪ ঘণ্টার টেলিমেডিসিন চিকিৎসক নিয়ে পরিচালিত এই কেন্দ্রটিতে এখন ধারণক্ষমতার চেয়েও বেশি রোগী আসছেন।

তাহেরিমা বলেন, মাতৃমৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। প্রকল্পটি প্রথমে তিন বছরের জন্য নেওয়া হয়েছিল। তবে এখানকার মানুষ চাইলে ব্র্যাক হয়তো মেয়াদ বাড়াতে পারে। আমাদের কাজ শুরু হয়েছে প্রায় দেড় বছর আগে।

কেন্দ্রটি চালু হওয়ার পর থেকে ১০০টির বেশি প্রসব সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া ২১ জন নারীকে সিজারিয়ান অপারেশনের জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

এই কেন্দ্র চালু হওয়ার আগে চরাঞ্চলের অনেক নারী কেবল তখনই চিকিৎসকের কাছে যেতেন, যখন পরিস্থিতি জীবন-মরণ সংকটে গিয়ে ঠেকত।

এখন স্থানীয়ভাবে নিয়োগ পাওয়া স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে নিরাপদ মাতৃত্ব, প্রসব-পরবর্তী পরিচর্যা এবং স্বাস্থ্যসচেতনতা নিয়ে কাজ করছেন। পাশাপাশি ব্র্যাক কিশোরী ও স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে কাজ করে প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব নিয়ে প্রচলিত কুসংস্কারগুলো দূর করার কাজ করছে।

প্যারামেডিক চিকিৎসক অমিত হাসান হৃদয় বলেন, এখন অনেক নারী নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাচ্ছেন এবং আগেভাগে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এতে মা ও নবজাতকের সুস্থতার হার বেড়েছে।

তবে বাল্যবিয়ে এখনো বড় উদ্বেগের বিষয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, শরীর প্রস্তুত হওয়ার আগেই অনেক মেয়ে গর্ভধারণ করে। এই অল্প বয়সে মা হওয়ার কারণে মা ও শিশু উভয়ই অপুষ্টিতে ভোগে এবং নানা জটিলতার শিকার হয়।

৬০ বছর বয়সী মোহাম্মদ জব্বার আলী বলেন, আগের চেয়ে মা ও শিশুর মৃত্যু অনেক কমেছে। যখন প্রথম এই কেন্দ্রটির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, আমরা বিশ্বাস করেছিলাম এটি আমাদের জীবন বদলে দেবে, আর তা-ই হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আমাদের রাস্তাঘাট ও পরিবহন ব্যবস্থা এখনো খুব খারাপ। আগে চিকিৎসার জন্য শহরে যাওয়ার পথে অনেক মা মারা যেতেন। কিন্তু এখন পরিস্থিতি অনেক ভালো।

কাছাকাছি সরকারি কমিউনিটি ক্লিনিক থাকলেও সেখান থেকে কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ করেন জব্বার আলী।

তিনি বলেন, মনে হয় সরকার বা অন্য কেউ জানেই না এখানে এত মানুষ থাকে। কেউ আমাদের কথা ভাবে না। কিন্তু এই ব্র্যাক স্বাস্থ্যকেন্দ্র আমাদের জীবন বাঁচাচ্ছে।

তিন বছরের এই প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হলে এটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু জব্বার আলী জানান, গ্রামবাসী এটি টিকিয়ে রাখার জন্য ব্যাকুল।

ব্র্যাকের চার্মস প্রকল্পের প্রজেক্ট ম্যানেজার মাহফুজুর রহমান বলেন, এই উদ্যোগটি শুধু স্বাস্থ্যসেবা নয়, বরং চরাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে কাজ করছে।

তিনি বলেন, আগে এখানকার মায়েরা নিজের এবং সন্তানের জীবন নিয়ে সবসময় অনিশ্চয়তায় থাকতেন। আমরা এই সেবার মাধ্যমে তাদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সহায়তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি। আমাদের লক্ষ্য হলো নিরাপদ মাতৃত্ব এবং প্রতিটি শিশুর জন্য একটি সুস্থ শৈশব নিশ্চিত করা।

Related Articles

Latest Posts