জাপানে চলছে আগাম নির্বাচনের ভোট। স্থানীয় গণমাধ্যমের পূর্বাভাষ মতে, এই ভোটে বড় ব্যবধানে জয়ী হতে চলেছেন ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি ও তার দল লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এলডিপি)।
আজ রোববার এই তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।
পূর্বাভাষ মতে, জাপানের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের দুই তৃতীয়াংশ আসনে এলডিপির জয় নিশ্চিত।
তরুণ বয়সে হেভি মেটাল ব্যান্ডে ড্রামার ছিলেন তাকাইচি। সেখান থেকে হলেন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। আগাম নির্বাচন ডেকে নিজের ‘আকস্মিক’ নিয়োগকে বৈধতা দেওয়ার পরীক্ষাতেও এবার উচ্চ নম্বর পেয়ে পাস করতে চলেছেন তাকাইচি।
ফলাফল নিশ্চিত হলে এটাই হবে ২০১৭ সালের পর যেকোনো নির্বাচনে এলডিপির সবচেয়ে ভালো ফলাফল। সে বছর তাকাইচির গুরু প্রয়াত শিনজো আবের নেতৃত্বে দুর্দান্ত ফল আদায় করে নিয়েছিল দলটি।
নিম্নকক্ষের ৪৬৫ আসনের মধ্যে ৩০০টিতে এককভাবে এলডিপি জয়ী হতে চলেছে। বর্তমানে দলটির হাতে আছে ১৯৮টি আসন। ২০২৪ সালের পর আবারও পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের দিকেই আগাচ্ছে দলটি।
এলডিপির মহাসচিব শুনিচি সুজুকি জাপানের গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির দায়িত্বশীল ও ভবিষ্যতমুখী আর্থিক নীতিমালা ও জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে আরও বলিষ্ঠ করার পদক্ষেপগুলোর পক্ষে সমর্থন পেয়েছি।’
প্রধান বিরোধী দল কনস্টিটিউশনাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (সিডিপি) ও এলডিপির আগের অংশীদার কোমেইতো-এর সমন্বয়ে গঠিত মধ্যপন্থি ও সংস্কারপন্থি জোটের হাতে ১৬৭টি আসন থাকলেও এর মধ্যে মাত্র এক তৃতীয়াংশ তারা ধরে রাখতে পারবে বলে পূর্বাভাষে বলা হয়েছে।
অপরদিকে, অভিবাসন বিরোধী দল সানসেইতো পার্টির আসন সংখ্যা দুই থেকে বেড়ে ৫ থেকে ১৪ এর মধ্যে যেতে পারে বলে মত দিয়েছে স্থানীয় গণমাধ্যম এনএইচকে।
বেশ কয়েক দশক তুমুল জনপ্রিয়তার মধ্যে থাকলেও শিনজো আবের হত্যাকাণ্ডের পর ধীরে ধীরে এলডিপির জনপ্রিয়তা কমতে থাকে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, দুর্নীতি এবং দলের সদস্যদের ঘিরে বেশ কয়েকটি অনাকাঙ্ক্ষিত কেলেঙ্কারির ঘটনা প্রকাশ পেলে এক পর্যায়ে পার্লামেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায় ঐতিহ্যবাহী দলটি।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, তারুণ্যদীপ্ত তাকাইচির নেতৃত্বে দলটিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়েছে।
তাকাইচি (৬৪) যুবা বয়সে ড্রামার ছিলেন। তিনি ব্রিটেনের ‘লৌহমানবী’ মার্গারেট থ্যাচারের বিশেষ ভক্ত।
এলডিপির কট্টর-রক্ষণশীলদের সমর্থন নিয়ে অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রীত্ব গ্রহণ করেন তিনি।
শুরুতে অনেকে তাকে ‘বাতিলের খাতায়’ ফেলে দিলেও নিরাশাবাদীদের মুখ বন্ধ করে ছেড়েছেন তাকাইচি। তরুণ-তরুণীদের মধ্যে অল্প সময়েই জনপ্রিয়তা অর্জন করেন তিনি।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কে-পপ গানে সুর মিলিয়ে আলোচনায় আসেন তিনি। তার সুদৃশ্য হ্যান্ডব্যাগও তরুণীদের নজর কাড়ে।
নির্বাচনে ভালো ফল করলেও তাকাইচির সামনে আছে অনেক বড় কিছু চ্যালেঞ্জ।
বিশেষত, অর্থনীতির ক্ষেত্রে তিনি যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, সেগুলো পূরণ করা খুব একটা সহজ হবে না বলে মত দেন বিশ্লেষকরা।
দ্রব্যমূল্য ও মূল্যস্ফীতিকে বড় সমস্যা হিসেবে দেখছেন ভোটাররা।
ক্ষমতা গ্রহণের পর তিনি মূল্যস্ফীতির চাপ কমিয়ে আনতে ১৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্রণোদনা প্যাকেজ চালু করেন। পাশাপাশি, নির্বাচনী প্রচারণায় খাবারের ওপর কর কমানোরও প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
তবে এসব উদ্যোগ যথেষ্ঠ নাও হতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মত দেন।
বড় ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী চীনের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করাও তাকাইচির কার্যতালিকার শীর্ষে থাকবে।
দীর্ঘমেয়াদে তাকাইচির প্রধানমন্ত্রীত্ব বেইজিং-এর কপালে ভাঁজ ফেলতে পারে।
অক্টোবরে ক্ষমতা গ্রহণের দুই সপ্তাহের মধ্যেই তিনি এক বিস্ফোরক মন্তব্য করে বসেন।
তিনি জানান, চীন যদি কখনো সামরিক শক্তিবলে তাইওয়ান দখলের চেষ্টা চালায়, তাহলে জাপান ওই উদ্যোগে বাধা দিতে পারে।
স্বশাসিত দ্বীপরাষ্ট্র তাইওয়ানকে নিজ ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে বেইজিং। সামরিক শক্তির ব্যবহারে দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণভার দখলে নেওয়ার সম্ভাবনাকে কখনোই পুরোপুরি উড়িয়ে দেয় না চীন।
তাইওয়ান সম্পর্কিত যেকোনো বিষয়ে বেইজিং অত্যন্ত সংবেদনশীল। স্বভাবতই, তাকাইচির এই মনোভাব ভালো ভাবে নেননি শি জিনপিং ও তার অনুসারীরা।
সে সময় থেকেই টোকিও-বেইজিং সম্পর্কের অবনতির শুরু।
ওই মন্তব্যের জেরে টোকিওর রাষ্ট্রদূতকে ডেকে পাঠায় চীন।
পাশাপাশি, দেশটির নাগরিকদের জাপান ভ্রমণে নিরুৎসাহিত করা এবং রাশিয়ার সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়ায় অংশ নেওয়ার মতো উদ্যোগ নেয় চীন।
এমন কী, জাপানের কাছে উপহার হিসেবে পাঠানো দুইটি পান্ডাকেও চীন ফিরিয়ে নিয়েছে।
দুই প্রতিবেশীর ‘ঝগড়ায়’ সরাসরি নাক না গলালেও গত সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকাইচির প্রশংসা করেন। তিনি তাকে একজন ‘শক্তিশালী, বলিষ্ঠ, জ্ঞানী ও দেশপ্রেমিক নেতা’ আখ্যা দেন।
সিরাকিউস বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মার্গারিটা এস্তেভেজ-আবে মত দেন, চীনের সঙ্গে ‘ঝগড়া’ বাধিয়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন তাকাইচি।
‘২০২৮ সাল পর্যন্ত তাকে আর কোনো নির্বাচন নিয়ে মাথা ঘামাতে হবে না। সে সময় উচ্চকক্ষের নির্বাচন আয়োজিত হবে’, বলেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ‘এখন জাপান ও তাকাইচির উচিৎ চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোড়া দেওয়া।’

