যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালি নিয়ে দীর্ঘদিনের ‘ট্যাবু’ বা জড়তা ভেঙে দিয়েছে ইরান। যুদ্ধ চলার সময় বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দিয়ে বিশ্বব্যাপী ভয়াবহ জ্বালানি সংকট তৈরি করেছে তেহরান। তাই দ্বিতীয় দফায় আলোচনার টেবিলে এটি একটি কার্যকর দরকষাকষির হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে উঠে আসে হরমুজ সংকট নিয়ে কী ভাবছে উপসাগরীয় দেশগুলো এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের দ্বিতীয় দফা আলোচনায় কী সমাধান আসতে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উপসাগরীয় কর্মকর্তার বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসলামাবাদে পরবর্তী দফার আলোচনায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র বা আঞ্চলিক প্রক্সিগুলোর পরিবর্তে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সীমা এবং বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের প্রভাব কীভাবে সামলানো যাবে, সেদিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে।
সাবেক রুশ প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ বলেন, ‘ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার আলোচনার সর্বোচ্চ অর্জন হতে পারে কেবল হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া। কিন্তু ওই অঞ্চলের জন্য সামগ্রিক উত্তেজনা প্রশমন হয়তো অধরাই থেকে যাবে।’
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে আনুষ্ঠানিক আলোচনার টেবিল থেকে বাইরে রাখায় ক্ষোভ জানিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, ‘বর্তমান প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহের ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণকে ধ্বংস করার পরিবর্তে বরং তাকে ব্যবস্থাপনা করার মাধ্যমে আরও প্রতিষ্ঠিত করার ঝুঁকি তৈরি করছে।’
উপসাগরীয় সূত্রগুলোর মতে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান কূটনীতি এখন ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি কমানোর বদলে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা এবং হরমুজ প্রণালির ওপর তেহরানের প্রভাবকে পরোক্ষভাবে মেনে নেওয়ার দিকেই বেশি মনোযোগী হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে মেদভেদেভ বলেন, ‘ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার যুদ্ধবিরতি কীভাবে কার্যকর হবে তা স্পষ্ট নয়। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—ইরান তার পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা করেছে। এর নাম হরমুজ প্রণালি। এর সম্ভাবনা অফুরন্ত।’
বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সরবরাহ করা হয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে।
সরকারি মহলের ঘনিষ্ঠ এক উপসাগরীয় সূত্রও রয়টার্সকে বলেন, ‘দিনশেষে হরমুজই হবে রেড লাইন। এটি আগে ইস্যু ছিল না, কিন্তু এখন হয়েছে। লক্ষ্যের সীমানা বদলে গেছে।’
তার মতে, হরমুজ এমন এক হাতিয়ার যার মাধ্যমে ইরান পারমাণবিক সীমা অতিক্রম না করেই খরচ বাড়াতে ও নিয়ম নির্ধারণ করতে সক্ষম।
ইরানি নিরাপত্তা কর্মকর্তারা হরমুজ প্রণালিকে ‘গোল্ডেন অ্যাসেট’ আখ্যা দিয়েছেন। তাদের মতে, হরমুজ প্রণালি কোনো আপদকালীন ব্যবস্থা নয় বরং দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত প্রতিরোধের হাতিয়ার।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইরানের এক জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, ‘ইরান বছরের পর বছর ধরে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার পরিস্থিতি তৈরির জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে এবং প্রতিটি পদক্ষেপের পরিকল্পনা করেছে। আজ এটি ইরানের সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ারগুলোর একটি।’
উপসাগরীয় সূত্রগুলো বলছে, হরমুজ বিরোধের মূল বিষয়টি প্রণালিটি কার নিয়ন্ত্রণে এটা নয়। বরং প্রণালি দিয়ে নৌ চলাচলের ক্ষেত্রে নিয়মনীতিগুলো কে নির্ধারণ করছে তার ওপর। এটি আন্তর্জাতিক নিয়মের পরিবর্তে ক্ষমতা-ভিত্তিক ব্যবস্থার দিকে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর হামলা নিয়ে উপসাগরীয় আরব দেশগুলো সবচেয়ে বেশি আতঙ্কে থাকলেও আলোচনায় একচেটিয়াভাবে গুরুত্ব পাবে হরমুজের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রভাব।
আরব আমিরাতের গবেষণা সংস্থা এমিরেটস পলিসি সেন্টারের প্রেসিডেন্ট ইবতেসাম আল-কেতাবি বলেন, ‘আজ যা তৈরি হচ্ছে তা কোনো ঐতিহাসিক মীমাংসা নয়, বরং টেকসই সংঘাতের একটি পরিকল্পিত কৌশল।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রক্সিদের কারণে কারা ভুগছে? ইসরায়েল ও বিশেষ করে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো। আমাদের জন্য একটি ভালো চুক্তি হতো সেটিই যা ক্ষেপণাস্ত্র, প্রক্সি এবং হরমুজ—সবগুলোকেই মোকাবিলা করবে। কিন্তু মনে হচ্ছে তারা (যুক্তরাষ্ট্র) ক্ষেপণাস্ত্র বা প্রক্সি নিয়ে মোটেও চিন্তিত নয়।’
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধের প্রভাবে ইতোমধ্যে জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা থেকে শুরু করে রপ্তানি ও বিমা খরচ বৃদ্ধি—সবই উপসাগরীয় অর্থনীতিকে সইতে হচ্ছে। বিকল্প বাণিজ্য পথ খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং সেগুলোও ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হুমকির মুখে রয়ে গেছে।
পুরো আরব উপসাগরজুড়ে ওয়াশিংটনের প্রতি অনুভূতি এখন চাপা ক্ষোভ থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর ক্রমবর্ধমান হতাশা ও বিভ্রান্তিতে রূপ নিয়েছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
সৌদি আরব-ভিত্তিক ‘গালফ রিসার্চ সেন্টার’-এর চেয়ারম্যান আবদুল আজিজ সাগের বলেন, ‘ইরান ইস্যুটি মোকাবিলার জন্য ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ, তবে এর মানে এই নয় যে অঞ্চলকে অন্তর্ভুক্ত না করে একতরফাভাবে সবকিছু করা।’
এ অবস্থায় উপসাগরীয় কর্মকর্তারা ওয়াশিংটনকে ঢালাওভাবে ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা না তোলার জন্য অনুরোধ করেছেন এবং ইরানের আচরণ পরীক্ষার জন্য পর্যায়ক্রমিক পদ্ধতির পরামর্শ দিয়েছেন।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের শিক্ষাবিদ আবদুলখালেক আবদুল্লাহ বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রও ভুল করতে পারে।’ তিনি উদাহরণ হিসেবে বলেন যে, হরমুজ নিয়ে সংঘাতের সম্ভাবনাকে খাটো করে দেখেছিল যুক্তরাষ্ট্র। যুদ্ধ চলার সময় যুক্তরাষ্ট্র বারবার বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, নৌ-নিরাপত্তা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে সুরক্ষা দেবে বলে উপসাগরীয় মিত্রদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
দুবাই-ভিত্তিক গবেষণা কেন্দ্র ‘বিহুথ’-এর পরিচালক মোহাম্মদ বাহারুন বলেন, ‘এই যুদ্ধের একটি শিক্ষা হলো কোনো একক বহিঃশক্তির ওপর নির্ভরতার সীমাবদ্ধতা। উপসাগরীয় আরবরা দীর্ঘদিন ধরে ইরানের সঙ্গে সংঘাতের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনকে সতর্ক করে আসলেও যুদ্ধ শুরুর পর তারা নীরব। তাদের এই অবস্থান সংঘাত নিয়ে অনিশ্চয়তাকে প্রতিফলিত করে। যার অর্থ হচ্ছে অর্থনৈতিক ক্ষতি ও প্রতিরক্ষা ব্যয় বহন করলেও যুদ্ধের ওপর তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।’
বিশ্লেষকদের মতে, দ্বিতীয় দফা আলোচনায় চলমান উত্তেজনা পুরোপুরি নিরসন হবে না, তবে সহনীয় পর্যায়ে পৌঁছুবে। এই ফলাফল ওয়াশিংটন ও তেহরানের জন্য উপযুক্ত হতে পারে, কিন্তু এটি ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকির মুখে থাকা উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য অস্থিতিশীলতাকে স্থায়ী করার ঝুঁকি তৈরি করে।

