‘জনপ্রত্যাশার অধ্যাদেশগুলো’ পাস না হওয়ায় ক্ষোভ জানিয়ে ৩১ নাগরিকের বিবৃতি

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা মানবাধিকার কমিশন, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগসহ ‘জনপ্রত্যাশার অধ্যাদেশগুলো’ জাতীয় সংসদে পাস না হওয়ায় ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন দেশের ৩১ জন বিশিষ্ট নাগরিক।

আজ রোববার এক বিবৃতিতে এ প্রতিবাদ জানান তারা।

বিবৃতিতে বলা হয়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বিশেষ পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কার, মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রতিরোধ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় বেশ কয়েকটি অধ্যাদেশ জারি করেছিল। সেসময় সব রাজনৈতিক দল বিষয়গুলোকে সাধুবাদ জানিয়েছিল। সংবিধান অনুযায়ী তা জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে পাস হতে হবে।

‘গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত জাতীয় সংসদে এসব অধ্যাদেশ পর্যালোচনার জন্য সরকারি ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে একটি বিশেষ কমিটি গঠিত হয়। এই কমিটি অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি অপরিবর্তিতভাবে পাস করার সুপারিশ করলেও চারটি অধ্যাদেশ রহিতকরণ ও ১৬টি অধিকতর পর্যালোচনার সুপারিশ করে।’

বিবৃতিতে বলা হয়, সাধারণ জনগণ ও নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ এবং তথ্য অধিকার (সংশোধন) অধ্যাদেশ সংসদের প্রথম অধিবেশনেই পাস করার দাবি জানানো হচ্ছিল। কিন্তু বিরোধী দলসহ কয়েকজন সদস্যের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ ও প্রবল আপত্তি উপেক্ষা করে ৯ এপ্রিল সংসদে মানবাধিকার কমিশন (রহিতকরণ) বিল, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিল এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারক (রহিতকরণ) বিল পাস করা হয়। এটি বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার ও বারবার উচ্চারিত অঙ্গীকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এ ছাড়া তথ্য অধিকার (সংশোধন) এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ অধিকতর যাচাই-বাছাইয়ের সুপারিশও দরকার ছিল না।

এতে বলা হয়, এর ফলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হবে এবং অধস্তন আদালত আবার শাসন বিভাগ তথা সরকারদলীয় প্রভাব বিস্তারের পুরোনো রেওয়াজে আনার অবস্থায় চলে যাবে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনটি আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ করে সংশোধন করা জরুরি ছিল। কিন্তু তা না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি আগের মতোই অকার্যকর, আমলাতান্ত্রিক বা দলীয় অনুগত ব্যক্তিদের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা প্রবল হলো। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত এসব সংস্কারমূলক অধ্যাদেশ গ্রহণ না করে বর্তমান সরকারও অতীতের মতো প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের সরকার হিসেবে বিবেচিত হবে, এটাই আমাদের দুর্ভাগ্য।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় বর্তমান আইনমন্ত্রী তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন, তাই এ বিষয়ে সরকারের আপত্তি বিস্ময়কর। তাছাড়া সরকারি দল তার নির্বাচনী ইশতেহারে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় কার্যকর করার স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। 

তারা বলেন, মনে রাখা দরকার ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনটি কোনো সাধারণ নির্বাচন ছিল না। এই নির্বাচন হয়েছে ১৫ বছরের দুঃশাসনের অবসানের পটভূমিতে বৈষম্যহীন রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারের প্রতিশ্রুতিপূর্ণ গণঅভ্যুত্থানের সফল পরিণতি হিসেবে। তাই সরকারের ম্যান্ডেট ও অঙ্গীকার কোনো সাধারণ অঙ্গীকার নয়। সরকার, সব রাজনৈতিক দলসহ সবারই সেই ম্যান্ডেট ও অঙ্গীকারকে সম্মান করার দায়বদ্ধতা আছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশ গুম-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সনদে (দ্য ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর দ্য প্রটেকশন অব অল পারসনস ফ্রম এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স–আইসিপিপিইডি) অনুস্বাক্ষর করায় গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশটি পাস করা সরকারের বাধ্যবাধকতার একটি অংশ। অন্যদিকে সাধারণ জনগণের তথ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে তথ্য অধিকার আইন (সংশোধন) অধ্যাদেশটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। তাই এসব অধ্যাদেশকে অবিলম্বে আইনে রূপান্তরের জোর দাবি জানাচ্ছি।

বিবৃতিতে সই করা ৩১ জন বিশিষ্ট নাগরিক হলেন— অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, সুলতানা কামাল, জেড আই খান পান্না, খুশী কবির, রাশেদা কে চৌধূরী, ইফতেখারুজ্জামান, শিরীন পারভিন হক, শাহীন আনাম, অধ্যাপক স্বপন আদনান, শামসুল হুদা, অধ্যাপক গীতি আরা নাসরিন, সামিনা লুৎফা, সুমাইয়া খায়ের, শাহনাজ হুদা, জোবাইদা নাসরীন, সালমা আলী, সহযোগী অধ্যাপক তাসনিম সিরাজ মাহবুব, অধ্যাপক ফিরদৌস আজিম, অধ্যাপক নোভা আহমেদ, সুব্রত চৌধুরী, তবারক হোসেন, মনিন্দ্র কুমার নাথ, পাভেল পার্থ, রেজাউল করিম চৌধুরী, শাহ ই মবিন জিননাহ, জাকির হোসেন, ঈশিতা দস্তিদার, রোজিনা বেগম, সাঈদ আহমেদ ও দীপায়ন খীসা এবং শামস আহমেদ।

 

 

Related Articles

Latest Posts