ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাসের বেঞ্চমার্ক মূল্য আজ বুধবার ১০০ ইউরোতে পৌঁছেছে। ২০২২ সালের জ্বালানি সংকটের পর এই প্রথম এ পর্যায়ে উঠল গ্যাসের দাম।
মধ্যপ্রাচ্যে এলএনজি পরিবহনে বিঘ্নের কারণে সরবরাহ সংকুচিত থাকায় শীতের আগেই জ্বালানিটির দাম বাড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে ভোক্তা ও শিল্পখাতে।
বার্তাসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত তীব্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপে গ্যাসের দাম বেড়ে ২০২২ সালের সর্বোচ্চ দামের কাছাকাছি পৌঁছেছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় বর্তমানে গ্যাসের দাম প্রায় তিন গুণ।
ইন্টারকন্টিনেন্টাল এক্সচেঞ্জের তথ্য অনুযায়ী, ডাচ টিটিএফ হাবে আগামী মাসে সরবরাহের জন্য গ্যাসের চুক্তিমূল্য সাময়িকভাবে প্রতি মেগাওয়াট ঘণ্টায় ১০০ ইউরোতে ওঠে। আগের কার্যদিবসের তুলনায় দাম বাড়ে প্রায় ৪ শতাংশ।
পাইকারি বাজারে গ্যাসের দাম বাড়ার প্রভাব পড়ছে ভোক্তা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের গ্যাস এবং বিদ্যুতের বিলে। বিদ্যুতের চাহিদা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছালে সাধারণত গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোই বিদ্যুতের দাম নির্ধারণে ভূমিকা রাখে।
জার্মানিতে আগামী এক বছরের জন্য বিদ্যুতের বেজলোড চুক্তির দাম ১ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে প্রতি মেগাওয়াট ঘণ্টায় ১৫৯ দশমিক ৩০ ইউরো হয়েছে। ২০২৩ সালের জুনের পর এটিই সর্বোচ্চ। ফ্রান্সে একই ধরনের চুক্তির দাম প্রায় দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠে ১২২ দশমিক ৫০ ইউরোতে দাঁড়িয়েছে।
শীতের আগে গ্যাসের মজুত কম
ইউরোপে শীতকালীন জ্বালানি ব্যবহারের মৌসুম শুরু হয়েছে। এ সময়ে সাধারণত গ্যাসের চাহিদা বাড়ে। কিন্তু বর্তমানে ইউরোপের গ্যাস মজুতাগারগুলো প্রায় ৭৫ শতাংশ পূর্ণ। জার্মানিতে মজুতের পরিমাণ প্রায় ৬০ শতাংশ, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিস্টাড এনার্জির গ্যাস ও এলএনজি বিশ্লেষক ম্যাথিউ উটিং বলেন, শীত যত এগিয়ে আসছে, ইউরোপের গ্যাসের মজুত দিয়ে সরবরাহের ঘাটতি সামাল দেওয়ার সক্ষমতা তত কমছে। সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে দ্রুত বিকল্প উৎস থেকে গ্যাস সংগ্রহের সুযোগও সীমিত।
তিনি বলেন, ৯ অক্টোবর শেষ হওয়া সপ্তাহে ইউরোপে এলএনজি আমদানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩০ শতাংশ কম ছিল। আবহাওয়া তুলনামূলক উষ্ণ থাকায় আপাতত গ্যাসের চাহিদা কম থাকলেও শুধু তাপমাত্রার কারণে ইউরোপের জ্বালানি নিরাপত্তার ঝুঁকি দূর হবে না।
ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে গ্যাসের মজুত
গ্রীষ্মকালে গ্যাসের মজুত পুনরায় পূরণের কার্যক্রম ধীরগতির হওয়ায় ইউরোপের মজুতাগারগুলোতে জ্বালানির পরিমাণ ২০১১ সালের পর বছরের এই সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। বেশি দাম এবং বিশ্ববাজারে এলএনজির সীমিত সরবরাহ মজুত বাড়ানোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ২০২৬-২৭ সালের শীত শেষে ইউরোপের গ্যাসের মজুত রেকর্ড সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে ২০১৭-১৮ সালের শীতকালে ‘বিস্ট ফ্রম দ্য ইস্ট’ নামে পরিচিত তীব্র শৈত্যপ্রবাহের সময়ের মজুত পরিস্থিতির সঙ্গে এর তুলনা করা হতে পারে।
নরওয়ের গ্যাস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ইকুইনরের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বুধবার বলেছেন, চলতি শীতের পরবর্তী সময়ে তাপমাত্রা কমে গ্যাসের চাহিদা বাড়লে ইউরোপে গ্যাসের দাম আবারও বড় ধরনের উল্লম্ফনের মুখে পড়তে পারে।
২০২২ সালের আগস্টে ইউরোপের টিটিএফ গ্যাসের দাম সর্বোচ্চ প্রায় ৩৪০ ইউরোতে উঠেছিল। বর্তমান সংকটে দাম এখনো সেই পর্যায়ে না পৌঁছালেও ১০০ ইউরোর সীমা শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও ভোক্তাদের জন্য যথেষ্ট উদ্বেগজনক।
উৎপাদন কমাচ্ছে শিল্পপ্রতিষ্ঠান
রাসায়নিক, সার ও ইস্পাত উৎপাদনের মতো জ্বালানিনির্ভর শিল্পে গ্যাস গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় এসব খাতের কিছু প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান পাইকারি বাজারের দামের কাছাকাছি দামে গ্যাস কেনে। ফলে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব তাদের ব্যয়ে দ্রুত পড়ছে।
তবে ভোক্তাদের ক্ষেত্রে খুচরা পর্যায়ের গ্যাসের চুক্তিমূল্য পাইকারি বাজারের দামের তুলনায় ধীরে পরিবর্তিত হয়। তাই গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির বড় অংশের প্রভাব ২০২৭ সালে ভোক্তাদের বিলে পড়তে পারে।
যুক্তরাজ্যে আগামী জানুয়ারিতে জ্বালানি বিল আবারও বাড়ার কথা রয়েছে। অন্যদিকে, জার্মানিতে নতুন গ্রাহকদের জন্য গ্যাসের শুল্ক চলতি বছরেই ৫৫ শতাংশ বেড়েছে।
ইউরোপীয় কমিশনের এক নোটে বলা হয়েছে, তেল ও গ্যাসের বাড়তি দামের প্রভাব থেকে পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে সুরক্ষা দিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সরকারগুলো চলতি বছর এ পর্যন্ত ১৭৯০ কোটি ইউরো ব্যয় করেছে।

