ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট কিংবা তার বিরোধী শিবির, কেউই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। এ পরিস্থিতিতে আরব দলগুলোর সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
তবে আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনে বিরোধী শিবিরের কয়েকটি দলের আপত্তি থাকায় রাজনৈতিক অচলাবস্থার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বুধবার আংশিক নির্বাচনী ফলাফলে দেখা যায়, ইসরায়েলের ১২০ সদস্যের পার্লামেন্ট নেসেটে নেতানিয়াহুর জোট ৫৩টি আসন পেয়েছে। গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন। আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলো পেয়েছে ১৯টি আসন, যা তাদের জন্য ঐতিহাসিক সাফল্য। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৬১টি আসন।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজ ও দ্য টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৮৮ দশমিক ৬২ শতাংশ ভোট গণনার পরও আসনবণ্টনে কোনো পরিবর্তন হয়নি। নিয়মিত ভোটকেন্দ্রগুলোর ফল যাচাইয়ের পাশাপাশি সেনাসদস্য, কূটনীতিক, বন্দি ও নিজ এলাকার বাইরে ভোট দেওয়া অন্যদের ব্যালট গণনা বাকি রয়েছে। এসব ভোট ‘ডাবল এনভেলপ’ বা দ্বিস্তর খামের ভোট হিসেবে পরিচিত।
নির্বাচনের ফলাফল চূড়ান্ত না হলেও সরকার গঠনের আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে আরব দলগুলোর সমর্থন নেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে বিরোধী জোটের নেতাদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।
ইহুদি-আরব সরকার গঠনের দাবিতে বিক্ষোভ
ইহুদি ও আরব দলগুলোর সমন্বয়ে সরকার গঠনের দাবিতে জেরুজালেম, তেল আবিব ও হাইফায় বিক্ষোভ করেছেন প্রায় ৩০০ মানুষ। জেরুজালেমের প্যারিস স্কয়ার, তেল আবিবের মেসিলা পার্ক এবং হাইফার ইউনেসকো স্কয়ারে এ বিক্ষোভ হয়।
বিক্ষোভকারীদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘নদী থেকে সাগর পর্যন্ত সবার স্বাধীনতা’ এবং ‘ইহুদি-আরব সরকার চাই’।
নির্বাচনে কোনো পক্ষই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় আরব দলগুলোর সমর্থন নিয়ে নতুন সরকার গঠনের দাবি জোরালো হচ্ছে। হারেৎজ জানিয়েছে, বিক্ষোভকারীদের দাবিও সেই রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন।
বিরোধী শিবিরের একাংশও চায় আরব দলগুলোর সমর্থন
বিরোধী দলগুলোর মধ্যে ইহুদি ও আরব দলকে নিয়ে সরকার গঠনের পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছেন বামপন্থী দল দ্য ডেমোক্র্যাটসের নেতা ইয়াইর গোলান। তিনি বিরোধী জোটের নেতাদের আরব দলগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছেন।
গোলানের মতে, নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে বিরোধীদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ এসেছে। এ সুযোগ কাজে লাগাতে হলে আরব ভোটারদের সমর্থনকে রাজনৈতিকভাবে স্বীকৃতি দিতে হবে।
দ্য টাইমস অব ইসরায়েলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে গোলান বলেন, তিনি বিরোধী দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে সরকার গঠনের বিষয়ে আলোচনা করতে চান। তার ভাষ্য, ইসরায়েলের মানুষের জন্য আশা ফিরিয়ে আনা, নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি এবং বর্তমান সরকারের বিচার বিভাগ সংস্কার পরিকল্পনা বন্ধ করার জন্য নতুন সরকার গঠন প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, ইসরায়েলে তরুণদের মধ্যেও এমন প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে যে, তারা আদৌ এ দেশে থাকতে চান কি না।
জয়েন্ট লিস্ট জোটের নেতা ইউসেফ জাবারিনও নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে বিকল্প সরকার গঠনে সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, রক্তপাতের রাজনীতির বিকল্প দিতে চাইলে বিরোধীদের আরব দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করতে হবে।
অন্যদিকে, জয়েন্ট লিস্টের একটি অংশের নেতা আহমাদ তিবি বলেছেন, আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের নেতানিয়াহু সরকারকে সরিয়ে দেওয়ার বাস্তব সুযোগ রয়েছে।
তবে বিরোধী জোটের গুরুত্বপূর্ণ নেতা নাফতালি বেনেট ও আভিগদর লিবারম্যান নির্বাচনের আগে আরব দলগুলোর ওপর নির্ভর করে সরকার গঠনের বিরোধিতা করেছিলেন।
আইজেনকোটও আরব দলগুলোকে নিয়ে জোট গঠনের বিষয়ে আগে আপত্তি জানিয়েছিলেন। ফলে তাদের অবস্থান পরিবর্তন হবে কি না, তা এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
আরব দলগুলোর ঐতিহাসিক সাফল্য
এবারের নির্বাচনে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলো সম্মিলিতভাবে ১৯টি আসন পেয়েছে বলে আংশিক ফলাফলে দেখা গেছে। ইসরায়েলের পার্লামেন্টে আরব দলগুলোর জন্য এটি রেকর্ড সংখ্যক আসন।
আরব ভোটারদের উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ এ ফলাফলে ভূমিকা রেখেছে। এর ফলে নেতানিয়াহুবিরোধী দলগুলো সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের সম্ভাবনা পেলেও আরব দলগুলোর সমর্থন ছাড়া তাদের সরকার গঠন কঠিন।
জয়েন্ট লিস্ট জোট সরকারে সরাসরি যোগ না দিয়েও বাইরে থেকে বিকল্প সরকারকে সমর্থন করার প্রস্তাব দিয়েছে। জোটটির নেতারা বলেছেন, পার্লামেন্টে তাদের বাড়তি আসন ব্যবহার করে নেতানিয়াহু এবং তার সরকারের কট্টর ডানপন্থী মন্ত্রীদের ক্ষমতা থেকে সরানোর চেষ্টা করা হবে।
আরব দলগুলো নতুন সরকারের কাছে নিজেদের সম্প্রদায়ের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতিও চাইতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে সংঘবদ্ধ অপরাধ, আবাসন সংকট, বৈষম্য এবং দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ ঘাটতি।
হারেৎজের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আরব দলগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা না করলে নেতানিয়াহুবিরোধী শিবিরের সামনে বিকল্প হিসেবে আবার নির্বাচন অথবা নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে ঐক্য সরকার গঠনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। সেক্ষেত্রে নেতানিয়াহু অন্তত স্বল্প মেয়াদে ক্ষমতায় থেকে যেতে পারেন।
আরব দলগুলোর বিরুদ্ধে কারচুপির অভিযোগ নেতানিয়াহুর
আংশিক ফলাফলে আরব দলগুলোর আসন বাড়তে দেখা যাওয়ার পর নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি তাদের বিরুদ্ধে নির্বাচন ‘চুরি’র অভিযোগ তুলেছে। এ অভিযোগের পক্ষে দলটি কোনো প্রমাণ দেয়নি বলে হারেৎজের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
লিকুদ পুলিশ ও ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেতকে বিষয়টি তদন্তের দাবি জানিয়েছে। দেশটির কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি জানিয়েছে, তারা এ বিষয়ে লিকুদের অভিযোগ পেয়েছে এবং নির্বাচনের পর নিয়মিত যাচাইপ্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে তা পরীক্ষা করবে।
এদিকে, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ আইজেনকোটের একটি বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন। সোমবার সন্ধ্যায় আইজেনকোট নেতানিয়াহুকে সতর্ক করে বলেছিলেন, নিজের রাজনৈতিক স্বার্থে ইসরায়েলের নিরাপত্তাকে ব্যবহার করা উচিত নয়।
কাৎজ এ বক্তব্যকে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের নেতানিয়াহুর নির্দেশ না মানার আহ্বান হিসেবে ব্যাখ্যা করেন এবং একে অগণতান্ত্রিক বলে মন্তব্য করেন।
সরকার গঠন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান স্পষ্ট নয়
নির্বাচনের পর ইসরায়েলে সরকার গঠনের আলোচনায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন হস্তক্ষেপ করবে কি না, তা এখনো নির্ধারণ করেনি বলে জানিয়েছেন একজন মার্কিন কর্মকর্তা।
দ্য টাইমস অব ইসরায়েলকে ওই কর্মকর্তা বলেন, ওয়াশিংটন কোন ধরনের সরকার গঠনকে সমর্থন করবে, এ নিয়ে প্রকাশিত কিছু প্রতিবেদন ‘মিথ্যা ও অপরিণত’। তার মতে, নির্বাচনের ফল এখনো পুরোপুরি চূড়ান্ত হয়নি, তাই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আসেনি।
অন্যদিকে, ইসরায়েলের নির্বাচনের পর ট্রাম্প বলেছেন, ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কাজ এখনো শেষ হয়ে যায়নি। চ্যানেল ১২-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলমান আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতা হোক বা অন্য কোনো উপায়ে, ইরানকে ঘিরে লক্ষ্য পূরণ করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নতুন সরকারের প্রতি আন্তর্জাতিক প্রত্যাশা
ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ রাজনৈতিক দলগুলোকে নতুন নির্বাচন এড়াতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করার আহ্বান জানিয়েছেন। রেকর্ড করা এক বক্তব্যে তিনি বলেন, আগামী সপ্তাহে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে পরামর্শ শুরু করবেন।
দলীয় নেতাদের খোলা মন নিয়ে আলোচনায় অংশ নেওয়ার প্রত্যাশাও জানিয়েছেন তিনি।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইসরায়েলের নির্বাচনের জন্য দেশটির জনগণকে অভিনন্দন জানিয়েছে। উচ্চ ভোটার উপস্থিতিকে ‘প্রাণবন্ত গণতন্ত্রের’ প্রতিফলন উল্লেখ করে ইইউ বলেছে, তারা পরবর্তী সরকারের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী।
Congratulations to 🇮🇱 , the only democratic state in the region, on an election with high voter turnout. Congratulations to @netanyahu and @Likud_Party on their victory. It is not easy to fight on two fronts and win. We value our dialogue and the longstanding friendship between our countries. We sincerely wish peace and security for the people of Israel and better future for a whole region.
তবে স্লোভেনিয়ার নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ইয়ানেজ জানশা নেতানিয়াহু ও তার লিকুদ পার্টিকে আগেভাগেই ‘বিজয়ের’ জন্য অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি ইসরায়েলকে ‘অঞ্চলের একমাত্র গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র’ বলে উল্লেখ করেছেন।
অন্যদিকে, জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক বলেছেন, ইসরায়েলের পরবর্তী সরকারকে বর্তমান নীতি থেকে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলতে হবে।
নিউইয়র্কে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তুর্ক বলেন, ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক আইন, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের অধীনে নিজেদের বাধ্যবাধকতা মেনে চলতে হবে।
এর আগে পশ্চিম তীরের হেবরনে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন তিনি। ওই অভিযানকে কেন্দ্র করে জাতিগত নির্মূলের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলেও সতর্ক করেছিলেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান।

