কান চলচ্চিত্র উৎসবের স্বর্ণজয়ী ইরানি নির্মাতা জাফর পানাহিকে নতুন এক মামলায় পাঁচ বছর এক মাসের কারাদণ্ড দিয়েছে দেশটির আদালত।
সেই সঙ্গে তার সব সম্পদ বাজেয়াপ্ত এবং দুই বছরের জন্য বিদেশ ভ্রমণ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
ইরানের সংবাদমাধ্যম এমতেদাদের বরাতে দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, ঠিক কী অভিযোগে এবার তাকে দণ্ডিত করা হয়েছে, তা প্রকাশ করা হয়নি। ৬৬ বছর বয়সী এই নির্মাতার অনুপস্থিতিতেই আদালত রায় দিয়েছেন বলে জাফর পানাহির আইনজীবী মোস্তফা নিলি জানিয়েছেন।
এর আগে, গত বছর রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণার অভিযোগে এক বছরের কারাদণ্ড পেয়েছিলেন পানাহি। সেই সাজা মাথায় নিয়েই চলতি বছরের মার্চে ইরানে ফেরেন তিনি। কারাদণ্ড কার্যকর করা হলেও নিজের দেশেই থাকতে ও কাজ করতে চান বলে জানিয়েছিলেন তিনি।
২০২৫ সালে পানাহির ‘ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাকসিডেন্ট’ চলচ্চিত্র কান চলচ্চিত্র উৎসবের সর্বোচ্চ পুরস্কার স্বর্ণপাম জেতে। ছবিটির প্রচারণায় বিদেশে থাকার পর দেশে ফেরেন তিনি।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন মামলার শুনানির তারিখ পানাহিকে জানানো হয়নি। গত সপ্তাহে তার ব্যাংক হিসাব জব্দ হওয়ার পর বিষয়টি জানতে পারেন আইনজীবী। পরে আদালতের নতুন রায়ের কথা জানা যায়।
পানাহির বিরুদ্ধে বর্তমানে তিনটি মামলা বিচারাধীন বলে জানিয়েছেন নিলি। অন্যদিকে বার্তাসংস্থা এপিকে তার এক বন্ধু বলেছেন, সোমবার সন্ধ্যায় নির্মাতার সঙ্গে তার কথা হয়েছে। তখন পর্যন্ত তাকে আটক করা হয়নি।
পানাহির সম্পদ বাজেয়াপ্তের নির্দেশের আইনগত ভিত্তি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ইরানের অধিকারকর্মীদের আইনি পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান দাদবানের মানবাধিকার আইনজীবী মইন খাজায়েলি গার্ডিয়ানকে বলেন, কোনো অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির সুস্পষ্ট আইনগত সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা না গেলে এ ধরনের নির্দেশ দেশটির সংবিধান লঙ্ঘন করতে পারে।
নতুন সাজা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন ইরানের চলচ্চিত্র অঙ্গনের শিল্পীরাও। মোহাম্মদ রাসুলফের অস্কার মনোনীত ছবি ‘দ্য সিড অব দ্য স্যাক্রেড ফিগ’-এর অভিনেত্রী সেতারেহ মালেকির মতে, মানুষের গল্প বলার ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানো কর্তৃত্ববাদী শাসনের অন্যতম বড় ভয়।
তিনি বলেন, গল্প যখন দেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বে পৌঁছে যায়, তখন তা থামানো কঠিন হয়ে পড়ে। পানাহির বিরুদ্ধে এই রায় আবারও প্রমাণ করে, গল্প বলার মতো কাজকেও কতটা ভয় পায় ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্র।
ইরানে গোপনে চলচ্চিত্র নির্মাণ করছেন এমন এক নির্মাতাও পানাহির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, পানাহি ইরানের মানুষের দাবির কথা তুলে ধরেছেন এবং নীরব থাকেননি।
তার ধারণা, জানুয়ারির বিক্ষোভের সময় পানাহির ঐক্যের আহ্বান এবং বিভিন্ন মতের মানুষের প্রতি সমর্থনের কারণেও এই সাজা দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। তাদের মধ্যে নির্বাসিত সাবেক শাহর ছেলে রেজা পাহলভির সমর্থকেরাও রয়েছেন।
ইরানি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ অভিনেত্রী নাজানিন বনিয়াদি রায়টিকে সাহসী শিল্পীর কণ্ঠ রুদ্ধ করার আরেকটি চেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার ভাষ্য, কয়েক দশক ধরে পানাহি চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সেন্সরশিপের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন এবং ইরানের মানুষের দুর্ভোগ ও লড়াইয়ের চিত্র তুলে ধরেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস ইন ইরানও সম্প্রতি দেশটিতে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষের ওপর দমন-পীড়ন বাড়ার বিষয়ে সতর্ক করেছে।
সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিল্পী, লেখক, কবি ও সংগীতশিল্পীদের মতো শান্তিপূর্ণভাবে মত প্রকাশকারীদেরও ভিন্নমত দমনে ব্যবহৃত নিরাপত্তা ও বিচারব্যবস্থার আওতায় আনা হচ্ছে।
পানাহি এর আগেও একাধিকবার ইরানি কর্তৃপক্ষের নিষেধাজ্ঞা ও কারাবাসের মুখে পড়েছেন। ২০১০ সালে তার চলচ্চিত্র নির্মাণ, সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলা ও বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। তবু গোপনে কাজ চালিয়ে যান তিনি। ‘দ্য সার্কেল’, ‘অফসাইড’, ‘দিস ইজ নট আ ফিল্ম’, ‘ট্যাক্সি’ ও ‘নো বেয়ার্স’-এর মতো ছবি তাকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি এনে দেয়। ২০১৫ সালে ‘ট্যাক্সি’র জন্য বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে স্বর্ণ ভালুক (গোল্ডেন বেয়ার) এবং ২০১৮ সালে ‘থ্রি ফেসেস’-এর জন্য কান উৎসবে সেরা চিত্রনাট্যের পুরস্কার পান।
২০২২ সালের জুলাইয়ে কয়েকজন নির্মাতার গ্রেপ্তারের প্রতিবাদের পর পানাহিকেও গ্রেপ্তার করা হয়। প্রায় সাত মাস কারাবন্দি থাকার পর ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে জামিনে মুক্তি পান তিনি।
গত বছর ‘ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাকসিডেন্ট’-এর জন্য স্বর্ণপাম জেতা পানাহি ছবিটি নির্মাণ করেন নিজের কারাবাসের অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে। কাহিনিতে কয়েকজন সাবেক রাজনৈতিক বন্দিকে তাদের ওপর নির্যাতন চালানো কারারক্ষী বলে সন্দেহ করেন। এরপর প্রতিশোধ, ন্যায়বিচার ও নৈতিক দ্বন্দ্ব ঘিরে এগিয়ে যায় গল্প। ছবিটি ২০২৬ সালের অস্কারে সেরা আন্তর্জাতিক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বিভাগে ফ্রান্সের প্রতিনিধিত্ব করে মনোনয়ন পায়।
চলতি বছরের শুরুর দিকে দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের সহিংস পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন পানাহি। তার আশঙ্কা, রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন চলতে থাকলে সহিংসতার চক্র থামানো কঠিন হয়ে পড়বে।
নতুন রায়ের ফলে পানাহির ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও ভবিষ্যতে চলচ্চিত্র নির্মাণের সুযোগ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বাড়ল। তবে নতুন মামলার অভিযোগ, সম্পদ বাজেয়াপ্তের সুনির্দিষ্ট ভিত্তি এবং আগের সাজাসহ কারাদণ্ড কীভাবে কার্যকর হবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়।

