গান্ধি বনাম গডসে! বিজেপির গলায় জ্ঞানেশ-কাঁটা। ভারতে গণতন্ত্রের ‘গঙ্গাযাত্রা’?

মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধি। ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ। অহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায়ের পথ দেখিয়েছিলেন তিনি। দুনিয়াজুড়ে তার খ্যাতি ‘মহাত্মা’ হিসেবে। তিনি ভারতের জাতির পিতা। তবে তিনি যে সবার প্রিয় নন, তা দিবালোকের মতো পরিষ্কার হয় ভারতের স্বাধীনতার পরের বছর; অর্থাৎ, ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি।

মহাত্মা গান্ধির নামের পাশে আরেকটি নাম উল্লেখ করা খুবই বিব্রতকর। কেননা, তিনি মহাত্মার হত্যাকারী। নাম: নথুরাম গডসে।

১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি নতুন দিল্লির বিড়লা হাউসে আয়োজিত বহু ধর্মমতের এক প্রার্থনা সভায় মহাত্মা গান্ধিকে সামনে থেকে সরাসরি গুলি করেছিলেন মহারাষ্ট্রের অধিবাসী নথুরাম গডসে।

২০২২ সালের ২৪ জানুয়ারি বিবিসির এক প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল—‘নথুরাম গডসে: মহাত্মা গান্ধির হত্যাকারীকে ঘিরে রহস্য’।

এতে জানানো হয়, ৩৮ বছর বয়সী নথুরাম গডসে চরম ডানপন্থি দল ‘হিন্দু মহাসভা’র সদস্য ছিলেন। তার অভিযোগ, গান্ধি মুসলিমদের পক্ষে অবস্থান নিয়ে হিন্দুদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। এমনকি, গান্ধি পাকিস্তানের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন।

গান্ধি হত্যার এক বছর পর ভারতের আদালত গডসেকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। ১৯৪৯ সালের নভেম্বরে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, হিন্দু মহাসভায় যোগ দেওয়ার আগে নথুরাম গডসে উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক বা আরএসএস-এর সদস্য ছিলেন। আদর্শগতভাবে এই সংগঠনটি ভারতের বর্তমান ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপির ‘গুরু’।

দেশটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দীর্ঘদিন এই শতবর্ষী হিন্দু সংগঠন আরএসএস-এর সদস্য ছিলেন।

ভারত সরকারের পিএম ইন্ডিয়া ওয়েবসাইটে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর জীবনীতে বলা হয়—১৯৭২ সালে তরুণ নরেন্দ্র মোদি সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন আরএসএস-এর প্রচারক হয়েছিলেন।

আরএসএস ক্ষমতার বাইরে থেকে মোদি সরকারে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে চলেছে বলেও বিবিসির প্রতিবেদনটিতে জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুসারে, ভারতের জাতির পিতাকে হত্যার কারণে গত কয়েক দশক আরএসএস নথুরাম গডসের নাম উচ্চারণ করেনি। কিন্তু, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সংগঠনটি গান্ধি হত্যাকে উৎসব হিসেবে ‘উদযাপন’ করেছে। গডসেকে বানাচ্ছে ‘দেশপ্রেমিক’।

তাই দেশটির রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন, ভারতে এখন চলছে ‘গান্ধি বনাম গডসে’ লড়াই। অর্থাৎ, সেখানে গান্ধির বহুত্ববাদী মতাদর্শের সঙ্গে গডসের হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শের সংঘাত হচ্ছে।

গত ৪ অক্টোবর সাংবাদিক অনিকেত চট্টোপাধ্যায় তার এক পডকাস্টের শিরোনাম করেন—‘গান্ধিকে সামনে রেখেই দ্বিতীয় স্বাধীনতার লড়াইয়ে নেমেছে দেশ।’

তিনি বলেন, ‘অনেকদিন পর আবার আমরা এক দ্বিতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের দিকে। আমাদের সংবিধান বিপন্ন। আমাদের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিপন্ন। আমাদের গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভিত্তি নির্বাচন, সেটাও ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে।’

‘আর তাই গান্ধি পথ দেখাবেন। গান্ধি আর গডসের লড়াইয়ে আমাদের অস্ত্র গান্ধি,’ মন্তব্য অনিকেত চট্টোপাধ্যায়ের।

অক্টোবর ২—মহাত্মা গান্ধির জন্মদিন। সেদিন মুম্বাইয়ের ঐতিহাসিক শিবাজি পার্কে ‘আরশোলাদের’ সমাবেশে মহাত্মা-মাহাত্ম্য তুলে ধরেছিলেন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে।

হাজারো বিক্ষোভকারীর উদ্দেশে তিনি বলেছিলেন, মহাত্মা গান্ধি মানুষের ভোটাধিকার নিয়ে আন্দোলন করতে শিখিয়েছেন। তিনি আরও শিখিয়েছেন কীভাবে অহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায় করে নেওয়া যায়।

মহাত্মা গান্ধি শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষুকে তোয়াক্কা না করে এমনকি, তাদের নির্যাতন-নিপীড়নকে উপেক্ষা করে গণমানুষের অধিকার আদায় না হওয়া পর্যন্ত রাজপথে থাকার শিক্ষাও দিয়েছেন। দাবি আদায়ে কারাভোগের শিক্ষাও তিনি দিয়েছেন।

সমর্থকদের মহাত্মা গান্ধির শিক্ষা ও আন্দোলন-কৌশল অনুসরণ করার অনুরোধ জানান ‘আরশোলাপ্রধান’ অভিজিৎ দীপকে।

এ কথা সবার জানা যে, গত জুলাইয়ে ভারতের শিক্ষাখাতে দুর্নীতি দমনে ব্যর্থতার দায় নিয়ে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি তুলেছিল ‘আরশোলারা’। প্রথমদিকে, এই তরুণ-যুবাদের দাবিকে আমলে না নিলেও পরে যখন তা দেশব্যাপী গণআন্দোলনের রূপ নেয়, তখন সেই দাবি মানতে বাধ্য হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার।

আর সেসময় অনেকে রসিকতা করে বলেছিলেন, ‘আরশোলাদের উৎপাতে নরেন্দ্র মোদির ঘুম নষ্ট। তাই মধ্যরাতেও তাকে আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে “হ্যালো ফ্রেন্ডজ” বলতে শোনা যায়!’

সেদিন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি তুলে সাফল্য পেয়ে উজ্জীবিত হয়েছিলেন আরশোলারা। এবার তারা দাবি তুলেছেন নির্বাচন নিয়ে জালিয়াতির অভিযোগে অভিযুক্ত দেশটির প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ। কেননা, আইনগতভাবে সব দায়ের ঊর্ধ্বে থাকা এই ব্যক্তির বিরুদ্ধে উঠেছে সংবিধান অমান্য করে এককভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া বা স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ।

অভিযোগ হিসেবে বলা হচ্ছে—জ্ঞানেশ কুমারের ‘একক’ নির্দেশে ভোটার তালিকা থেকে যথাযথ কারণ ছাড়াই বাদ পড়েছে অন্তত ১৩ কোটি মানুষের নাম। তাদের বেশিভাগই সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের, যারা সাধারণ বিজেপিকে ভোট দেন না।

আরও বলা হচ্ছে—ছলে-বলে-কৌশলে বিপুল সংখ্যক মানুষকে ভোটের বাক্স থেকে দূরে রেখে বিজেপিকে নির্বাচনে বাড়তি সুবিধা পাইয়ে দিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার।

নির্বাচন কমিশনের অন্য দুই কমিশনারের বারংবার লিখিত আপত্তি সত্ত্বেও জ্ঞানেশ কুমার এ কাজ করতে দ্বিধা করেননি।

—এসব অভিযোগের সর্বশেষ ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে গত ২৫ সেপ্টেম্বর দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে প্রকাশিত ’১০ মাসে ১৪ বার, ২ নির্বাচন কমিশনার লিখিতভাবে অভিযোগ দিয়েছিলেন নির্বাচন প্যানেলের ভূমিকা নিয়ে’ শিরোনামের প্রতিবেদনটি।

প্রতিবেদনটিতে দেশটির প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে সংবিধান লঙ্ঘনের নানান ‘দৃষ্টান্ত’ তুলে ধরা হয়।

তালিকা থেকে বৈধ ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার ঘটনা নিয়ে প্রথমে প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসসহ অন্যান্য দলগুলো আপত্তি জানালেও বিজেপি সরকার একে বিরোধীদের ‘অপপ্রচার’ বলে পাশ কাটিয়ে গেছে।

কিন্তু, সংবাদমাধ্যমটি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ‘কর্মকাণ্ড’ নিয়ে সবিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করার পর যেন ‘থলের বেড়াল’ বেরিয়ে যায়। পরে অন্যান্য সংবাদমাধ্যমে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে নিয়ে আরও ‘আপত্তিকর’ তথ্য প্রকাশিত হতে থাকে।

এমন পরিস্থিতিতে আরশোলারা দাবি তোলে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ। ঘোষণা দেয়—‘ইট ইজ ডান ব্রো’। অর্থাৎ, ‘অনেক হয়েছে, এবার আপনি বিদায় হোন’।

গত ৬ অক্টোবর ভারতের বিরোধীদলের নেতা রাহুল গান্ধিও ‘জেন জি’দের কথার প্রতিনিধিত্ব করে এক টুইটে লিখেছেন, ‘জ্ঞানেশ, ইট ইজ ডান, ব্রো। টাইম টু রিজাইন’। সঙ্গে পোস্ট করেন একটি ভিডিও ক্লিপ।

ভিডিওতে দেখা যায়, রাহুলের হাতে প্ল্যাকার্ড। তাতে লেখা: ‘জ্ঞানেশ, ইট ইজ ডান, ব্রো।’

আর ভারতের আমজনতার একটি বড় অংশ প্রশ্ন তুলেছে—যদি মানুষের মন থেকে স্বচ্ছ নির্বাচনের বিশ্বাসটাই উবে যায় তাহলে গণতন্ত্র কীভাবে বাঁচে? ভারতের গণতন্ত্রে ‘সার্কাস’ চলছে।

তারাও একে একে আওয়াজ তুলছেন: ‘জ্ঞানেশ কুমার, ইউ আর ডান ব্রো’।

একটু ফিরে আসা যাক এক ভিন্ন প্রসঙ্গে।

ভারতের বিহার রাজ্যের ‘অপারেশন গঙ্গাজল’-এর কথা মনে আছে? ১৯৮০-র দশকের ঘটনা। এখনো সে দেশে তা নিয়ে আলোচনা হয়। বিভিন্ন ঘটনায় ব্যবহার করা হয় সেই পরিভাষা। ‘ছিঁচকে চোরদের উপযুক্ত শিক্ষা’ দিতে বিহার রাজ্য পুলিশ চালু করেছিল বিচারবহির্ভূত নৃশংস ‘গঙ্গাজল’ অভিযান। এর মাধ্যমে ‘অপরাধীদের’ দুই চোখ অ্যাসিড দিয়ে নষ্ট করে দিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।

গত ২ অক্টোবর ভারতীয় দৈনিক আনন্দবাজারের এক প্রতিবেদনের শিরোনামে চোখ আটকে গেল। এতে বলা হলো: মোদি-শাহের রাজ্য গুজরাটে এবার ‘অপারেশন গঙ্গাজল’!

জানানো হলো: পশ্চিমের রাজ্যটিতে দুর্নীতি, অনৈতিক কার্যকলাপে অভিযুক্ত ২ সরকারি কর্মকর্তার চাকরি যাওয়ার খবর।

প্রতিবেদন অনুসারে: দুর্নীতি ও গুরুতর অসদাচরণে অভিযুক্ত সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিশেষ প্রশাসনিক ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্দেশ্যে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ভূপেন্দ্র পাটেলের নেতৃত্বে রাজ্য সরকার ‘গঙ্গাজল’ অভিযান শুরু করেছে।

ভারতের ‘গঙ্গাজল’ অভিযান সম্পর্কে অনলাইনে খোঁজ নিতে গিয়ে বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেল—পুলিশের এমন পাশবিক নির্যাতনে স্তম্ভিত হয়েছিল ভারতবর্ষ।

২০১৯ সালের ২৯ নভেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনটিতে ‘সন্দেহভাজন অপরাধীদের প্রতি বিহার পুলিশের বীভৎস আচরণের’ চিত্র তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়েছে: পুলিশ সন্দেহভাজন অপরাধীদের কারাগারে আনার আগেই তাদেরকে থানায় নিয়ে সাইকেলের স্পোক দিয়ে চোখ ফুটো করে দিত। তারপর সেই ফুটোর ভেতর অ্যাসিড ঢেলে নিশ্চিতভাবে তাদের চোখ নষ্ট করে দেওয়া হতো।

প্রতিবেদনটিতে জানানো হয়—অপরাধীদের ফুটো চোখে অ্যাসিড ঢালার আগে পুলিশ বলতো, যন্ত্রণা কমাতে ‘এবার তোর চোখে গঙ্গার পবিত্র জল’ দেওয়া হবে। আসলে পুলিশ ‘গঙ্গাজলের’ নামে চোখে অ্যাসিড ঢেলে দিত।

এ ঘটনা প্রকাশের পর দেশজুড়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধি লোকসভায় আবেগময় কণ্ঠে জানিয়েছিলেন যে, এমন ঘটনার কথা শুনে তিনি অসুস্থ বোধ করছেন।

তবে বিহারের ঘটনাস্থল ভাগলপুরের বেশিরভাগ মানুষের এ নিয়ে অনুতাপ ছিল না বলেও প্রতিবেদনটিতে জানানো হয়। তাদের ভাষ্য ছিল: ‘অপরাধীদের শিক্ষা হওয়া উচিৎ’।

এবার একটু চোখ ফেরানো যাক আনন্দবাজারের প্রতিবেদনটিতে। এতে বলা হয়—ফের ‘অপারেশন গঙ্গাজল’! তবে আশির দশকের বিহারে দাগি দুষ্কৃতিকারীদের চোখে অ্যাসিড ঢেলে অপরাধ দমনের মতো প্রচেষ্টা নয়, এ উদ্যোগ দুর্নীতিমুক্ত গুজরাট গড়ার!

আরও বলা হয়—প্রথম দফাতেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের রাজ্যে সেই ‘গঙ্গাজল’ অভিযানের নিশানা হয়েছেন সেখানকার দুই সরকারি কর্মকর্তা।

এরইমধ্যে, ভারতবাসী একটু একটু করে সোচ্চার হচ্ছেন ‘গণতন্ত্র রক্ষার’ দাবি নিয়ে। তারা বলছেন, চরম হিন্দুত্ববাদী আরএসএস-এর আশীর্বাদপুষ্ট বিজেপি সরকার ভারতের বহুল প্রশংসিত গণতন্ত্রের ভিত্তি নির্বাচন ব্যবস্থাকে কলুষিত করেছে।

দেশটির প্রধান বিরোধীদলের নেতা রাহুল গান্ধির ভাষায়: ‘নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহ, মোহন ভগবত ও জ্ঞানেশ কুমার—এরা দেশের গণতন্ত্র ধ্বংস করে দিয়েছে। নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহ, মোহন ভগবত ভোট চুরির মধ্য দিয়ে দেশকে ছিনতাই করেছেন।’

‘জ্ঞানেশ কুমার তাতে সাহায্য করেছেন,’ যোগ করেন এই কংগ্রেস নেতা।

দেশটির রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে বলছেন—বিজেপিবিরোধী জোট ভারতে গণতন্ত্রের ‘গঙ্গাযাত্রা’র অভিযোগ তুলছে। কেননা, তারা দেখতে পাচ্ছে যে ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে মোদি-শাহ সরকার ‘জালিয়াতি’ করে ক্ষমতা দখল করছে। গণতন্ত্রের ভিত্তি স্বচ্ছ নির্বাচন ব্যবস্থা যদি কলুষিত হয় তাহলে দেশের আপামর জনগণ বুঝতে পারবে যে বিজেপির হাতে দেশ নিরাপদ নয়।

মোদি-শাহ সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে দেশটির গণতন্ত্রের ‘গঙ্গাযাত্রা’ ঘটিয়ে দিয়েছেন।

গত ৭ অক্টোবর ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মেঘালয় ও মাদ্রাজ হাইকোর্টের সাবেক প্রধান বিচারপতি সঞ্জীব ব্যানার্জি মন্তব্য করেছেন, ‘রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করা হলে গণতন্ত্রে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না।’

‘গঙ্গাজলের’ দেশে এবার গণতন্ত্রের ‘গঙ্গাযাত্রা’ দেখতে পাচ্ছে বিশ্ববাসী—এমন মন্তব্যও করছেন সমালোচকদের একাংশ।

বীভৎস মানবতাহীন ‘গঙ্গাজল’-এর সংবাদ পড়ার দিন তথা গত ২ অক্টোবর ভারতের সংবাদমাধ্যমগুলোর ভিডিও প্রতিবেদনে দেখা গেল ভিন্ন এক দৃশ্য। দেশটিতে ছাত্র-জনতার অহিংস আন্দোলন দমনে পুলিশের চরম সতর্কতা ও মারমুখী উদ্যোগ।

ভিডিওগুলোয় দেখা গেল—বিক্ষোভকারীদের মুখে ‘ভোট চোর গদি ছোড়’ স্লোগান। হাতে ‘জ্ঞানেশ ইস্তফা দো’ ব্যানার।

এমন দৃশ্য এখন প্রতিদিনের বাস্তবতা হয়ে দেখা দিয়েছে। ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বাই থেকে প্রশাসনিক রাজধানী দিল্লি হয়ে জ্ঞানেশবিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে দেশটির অন্যান্য ছোট-বড় শহরের অলিগলি-রাজপথে।

অর্থাৎ, ভারতজুড়ে এখন যে স্লোগানটিই বেশি শোনা যাচ্ছে তা হলো: ‘জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ চাই।’

শুধু তাই নয়, বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে খ্যাত ভারতে গণতন্ত্রের ‘গঙ্গাযাত্রা’র অভিযোগও তুলছেন সরকারবিরোধীরা।

গত ২ অক্টোবর বিবিসি এক প্রতিবেদনের শিরোনাম করে: ভারতের ‘আরশোলা’ বিক্ষোভকারীরা আবার ফিরেছে—এবার দাবি নির্বাচন প্রধানের পদত্যাগ। এতে জানানো হয়—মুম্বাইয়ে জেন জিদের বিক্ষোভে যোগ দিয়ে হাজারো মানুষ ‘গণতন্ত্র রক্ষা’র ডাক দিয়েছেন।

আল জাজিরার এক প্রতিবেদনের শিরোনামে প্রশ্ন রাখা হয়—ভারতে ‘আরশোলাদের’ আন্দোলন মোদির নির্বাচনপ্রধানকে সরাতে পারবে?

এতে বলা হয়, সেদিন ভারতের রাজধানী নতুন দিল্লির কেন্দ্রস্থল ‘ভূতুরে’ এলাকায় পরিণত হয়েছিল।

‘নরেন্দ্র মোদির পুলিশ কয়েক শ বিক্ষোভকারীকে আটক করে,’ উল্লেখ করে প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, সরকার দিল্লির মেট্রো রেলের বেশ কয়েকটি স্টেশন বন্ধ রাখে, যাতে বিক্ষোভকারীরা পার্লামেন্ট ও আন্দোলনস্থল ‘যন্তর মন্তর’ এলাকায় ঢুকতে না পারে।

এদিকে, গত ২ অক্টোবর মুম্বাইয়ের শিবাজী পার্কে সফল সমাবেশ সেরে আরশোলারা ঘোষণা দেয় আগামী ১০ অক্টোবর দিল্লির ‘যন্তর মন্তর’ এলাকায় সমবেত হওয়ার। দেশটির সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, আরশোলাদের আগামী বিক্ষোভ-সমাবেশকে ঘিরে দিল্লিতে ব্যাপক পুলিশি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

প্রতিদিন সংবাদমাধ্যমগুলোয় সরকারবিরোধীদের সঙ্গে পুলিশের ধ্বস্তাধস্তি ও ধরপাকড়ের ছবি-খবর প্রকাশিত হচ্ছে।

আরশোলাপ্রধান অভিজিৎ দীপকে সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়ে দিয়েছেন, পুলিশ যেখানেই আটকে দেবে সেখানেই জন্ম নেবে ‘যন্তর মন্তর’। অর্থাৎ, সমাবেশকারীরা সেখানেই বসে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ দেখাবে।

‘ভোট চোর’ জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি থেকে সরবে না, বলেও পরিষ্কার জানিয়ে দেন অভিজিৎ দীপকে।

বিজেপি নেতাদের প্রশ্ন—কংগ্রেস ও বিরোধীরা কী চান? তারা কি দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করতে চাচ্ছেন? দিল্লির সবচেয়ে সংবেদনশীল এলাকায় বসে রাহুল গান্ধি কি নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা করছেন?

বিরোধীদের অভিযোগ—পুলিশ দমনপীড়ননীতি গ্রহণ করেছে।

আরশোলাদের বক্তব্য: সরকার ভয় পাচ্ছে।

একথা সবাই জানেন যে, আরশোলাদের দাবির মুখে দেশটির শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ মোদি-শাহ সরকারের ‘ইস্পাতকঠিন’ আত্মবিশ্বাসে ফাটল ধরিয়ে দিয়েছিল। এবার যদি জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি জোরালো হয় এবং আন্দোলনকারীরা তাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেন, তাহলে জ্ঞানেশ কুমারের অধীনে আয়োজিত নির্বাচনগুলোর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন জাগবে।

দেশটির রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে বলছেন—যদি প্রমাণ করা যায় যে ‘বিজেপি-ভক্ত’ জ্ঞানেশ কুমারের অধীনে আয়োজিত নির্বাচনগুলোয় সরকারিভাবে কারচুপি করা হয়েছে, তাহলে সেগুলো ‘অবৈধ’ ঘোষণা দিয়ে নতুন করে নির্বাচনের আয়োজন করতে হবে।

এমনটি হলে তা হবে বিজেপি শাসনের ভীষণ কলঙ্কিত অধ্যায়। এটি বিজেপিকে অস্তিত্ব সংকটে ফেলে দেবে বলেও মনে করছেন তারা।

গত ৬ অক্টোবর ভারতীয় দৈনিক আনন্দবাজার এক প্রতিবেদন জানায়—বামপন্থি অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এআইএসএ) নেত্রী নেহা বোরা বলেছেন, ‘শুধু জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফা নয়, বদলাতে হবে গোটা ব্যবস্থা।’

এতে আরও বলা হয়, এই নেতা ভোটার তালিকা নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়া বন্ধ এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশন সংক্রান্ত আইন বাতিলের দাবিও তুলেছেন।

এর পরদিন ভারতীয় পত্রিকা ‘বর্তমান’ জানায়—‘কোনো ভুল করেননি জ্ঞানেশ কুমার, কমিশনের হয়ে ব্যাট ধরা শুরু বিজেপির।’

ক্ষমতাসীন বিজেপির মুখপাত্রদের বক্তব্য: নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে যা যা অভিযোগ তোলা হচ্ছে, রাহুল গান্ধি যে নথিপত্র প্রকাশ করে প্রশ্ন করছেন, সেগুলোর ভিত্তি নেই। বরং কমিশন এখনো পর্যন্ত যা যা করেছে সবই বিধিনিয়ম মেনেই করেছে। নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তির নিয়মে কোনো বদল হয়নি বলে দাবি বিজেপির।

প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়: বিজেপি মুখপাত্রদের চ্যালেঞ্জ, কংগ্রেস কিংবা বিরোধীরা একের পর এক ভোটে হেরেই চলেছে। সেই কারণেই তারা এসব আজগুবি অভিযোগ করছে। জ্ঞানেশ কুমার না হয় এখন নির্বাচন কমিশনার হয়েছেন। তার আগে লোকসভা ও রাজ্য বিধানসভার ভোটগুলোয় কীভাবে জয়ী হলো বিজেপি? আসলে ভোটে জিততে পারবে না বুঝেই বিরোধীদের এমন অভিযোগ।

বিজেপির নেতাদের কেউ কেউ আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতাদের বিদ্রূপ করে বলছেন, ‘আরশোলাদের সিজেপির অর্থ দাঁড়ায় কংগ্রেস জেতাও পার্টি।’

একই দিনে একই দৈনিকটির অপর এক প্রতিবেদনের শিরোনামে বলা হয়—‘উত্তরপ্রদেশে নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকায় ১৬ লাখ নাম নিয়ে রহস্য!’

এতে জানানো হয়, উত্তরাঞ্চলের রাজ্যটির ভোটার তালিকা থেকে ২ কোটির বেশি নাম বাদ গিয়েছে। পাশাপাশি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে ১৬ লাখ ১৮ হাজার ‘রহস্যময়’ নতুন ভোটারের নাম। বিরোধীদের অভিযোগ: এই অতিরিক্ত নাম কাদের? তাদের পরিচয় কী?—এসব কমিশনের ওয়েবসাইটে পাওয়া যাচ্ছে না।

এদিকে, ‘বিতর্কিত ভোটার তালিকার’ মধ্য দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে সদ্য ক্ষমতায় আসা বিজেপি নেতা শমীক ভট্টাচার্য যখন বলছেন, ‘পশ্চিমবঙ্গের মানুষের কাছে জ্ঞানেশ কুমার “ভগবান”। তাকে “পদ্ম” পুরস্কার দেওয়া উচিত’, তখন দেশটির জাতীয় দৈনিকগুলো জ্ঞানেশ কুমারের ‘অতীত কীর্তি’ নিয়ে একের পর এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে যাচ্ছে।

গত ৭ অক্টোবর ভারতের প্রভাবশালী দৈনিক দ্য হিন্দু-র এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাওয়া বৈধ নামগুলো আবার ফিরিয়ে আনা হবে।

বিশ্লেষকদের প্রশ্ন—তাহলে যাদেরকে বাদ দিয়ে যে বিধানসভার ভোট হলো তা কি সবার কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাবে? অনেকের মতে, বিজেপি এই ভোটার-তালিকা সংক্রান্ত ‘কলঙ্ক’ কোনোকিছু দিয়েই ঢাকা যাবে না।

একইদিনে সংবাদমাধ্যমটির অপর এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, গোয়ার বোম্বে হাইকোর্ট ভারতের নির্বাচন কমিশনারের কাছে ভোটার তালিকা সংশোধনের পর নাম বাদ যাওয়ার বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

অর্থাৎ, এবার জ্ঞানেশ কুমারের ‘তৈরি’ ভোটার তালিকা নিয়ে রাজ্যে রাজ্যে আইনি প্রশ্ন উঠেতে শুরু করেছে।

বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রের দেশে নির্বাচন বা ভোটার তালিকা নিয়ে অভিযোগ ওঠায় জ্ঞানেশ কুমারের প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদে থাকার নৈতিক অধিকার আছে কিনা তা নিয়ে হয়ত অনেকে ভিন্ন মত দেবেন। কিন্তু, জনমনে জ্ঞানেশকে নিয়ে যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে তা দিবালোকের মতোই পরিষ্কার নয় কি?

এবার ‘ইট ইজ ডান ব্রো’ আওয়াজ সর্বভারতীয় রূপ নিলে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের শেষ রক্ষা হয় কিনা তা ভবিষ্যৎ বলে দেবে।

বাস্তবতা হচ্ছে—জ্ঞানেশ কুমারের বিষয়টি এখন শুধু আর রাজপথের বিষয় নেই। দেশটির সুপ্রিম কোর্টও সরকার ও নির্বাচন কমিশনারের কাছে জানতে চেয়েছে, জ্ঞানেশ কুমার আইনের বরখেলাপ করেছেন কিনা।

গত ৭ অক্টোবর এআইএসএ নেতা নেহা বোরা জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়েচে ভেলের কাছে প্রশ্ন রাখেন, ‘জেন জিদের রুখবে কে?’

দেখার বিষয়, ভারতের তরুণ প্রজন্ম সরকারের বিরুদ্ধে তাদের দাবি আদায়ে কতটা সফল হয়।

এটাও দেখার বিষয়—‘মহাভারত’-এর দেশে চলমান ‘গান্ধি বনাম গডসে’র লড়াই কোথায় শেষ হয়।

Related Articles

Latest Posts