কুয়াকাটায় নলকূপ ও কলের লালচে, হলদেটে এমনকি ‘পেট্রোলের মতো’ রঙের পানি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পর্যটকরা। অনেকে এ পানি পান ও গোসলে ব্যবহার করছেন না।
সম্প্রতি উপকূলীয় শহরটিতে বেড়াতে আসা সাব্বির আহমেদ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, এমন পানি দেখে এটি পানযোগ্য, তা বিশ্বাস করাই কঠিন। পরে তিন দিন অবস্থান করেও একই সমস্যা দেখতে পাই। এরপর খাওয়া ও গোসলের জন্য ওই পানি ব্যবহার বন্ধ করে বোতলজাত পানি ব্যবহার করি।
তিনি আরও বলেন, প্রথমবার কুয়াকাটা যাওয়ার পর ওই পানি ব্যবহারের কারণে আমার শরীরে চুলকানি হয়েছিল।
এ বিষয়ে স্থানীয় ২০ জন ও ১৫ পর্যটকের সঙ্গে কথা বলেছে ডেইলি স্টার।
প্রায় অর্ধেক বাসিন্দা কোনো নির্দিষ্ট স্বাস্থ্য সমস্যার কথা জানাননি। তবে ছয়জন চুলকানি, চুল পড়া, গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা বা প্রস্রাবের রঙ পরিবর্তনের অভিযোগ করেছেন। এসব সমস্যার জন্য তারা পানিকে সন্দেহ করছেন। তবে পানির সঙ্গে এসব সমস্যার যোগসূত্র প্রমাণ করে এমন চিকিৎসা-সংক্রান্ত কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই।
বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটায় বিপুলসংখ্যক পর্যটক আসায় বিষয়টি নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোতালেব শরীফ ডেইলি স্টারকে বলেন, বছরে প্রায় ১৫-২০ লাখ মানুষ এ এলাকায় আসেন। তাদের অনেকেই পানির রঙ নিয়ে অভিযোগ করেন।
তবে পানির রঙ দেখেই তা নিরাপদ কি না, তা নির্ধারণ করা যায় না বলে জানিয়েছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই)। পানিতে আর্সেনিক ও লোহার মতো দূষিত পদার্থ আছে কি না, তা নির্ধারণে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
গত ৯ মার্চ কুয়াকাটার একটি অগভীর নলকূপ থেকে সংগ্রহ করা পানির নমুনা পরীক্ষা করে শূন্য দশমিক ২৫৭৭২ মিলিগ্রাম/লিটার আর্সেনিক পেয়েছে ডিপিএইচই। পানিতে আর্সেনিকের অনুমোদিত মাত্রা শূন্য দশমিক শূন্য ৫ মিলিগ্রাম/লিটার। এছাড়া নমুনায় ১০ দশমিক ৮৬১ মিলিগ্রাম/লিটার লোহা পাওয়া গেছে, যেখানে গ্রহণযোগ্য মাত্রা শূন্য দশমিক ৩-১ দশমিক শূন্য মিলিগ্রাম/লিটার।
তবে এই ফলাফল শুধু ওই নির্দিষ্ট উৎসের পানির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কুয়াকাটার সব অগভীর নলকূপের পানিতে একই মাত্রায় দূষিত পদার্থ রয়েছে, তা এ ফলাফল প্রমাণ করে না।
কুয়াকাটা পৌরসভায় ২৫ হাজার ১২৭ জন বাসিন্দা, তিনটি পাম্প হাউস, ৫৭৭টি আবাসিক সংযোগ ও প্রায় ২৫০টি হাতচালিত নলকূপ রয়েছে। গভীর নলকূপের পানি মূলত পান করার জন্য ব্যবহার করা হয়। আর অগভীর নলকূপের পানি সাধারণত গোসল, ধোয়া ও অন্যান্য গৃহস্থালির কাজে ব্যবহৃত হয়।
ডিপিএইচই কর্মকর্তারা বলেন, গভীর নলকূপের পানি বর্তমানে পান ও ব্যবহারের জন্য নিরাপদ মাত্রায় রয়েছে। তবে পানিতে লবণাক্ততা ও ক্লোরাইডের মাত্রা বাড়তে থাকায় বিষয়টি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ডিপিএইচই পটুয়াখালীর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আশরাফুজ্জামান ডেইলি স্টারকে বলেন, লিগনিন ও ট্যানিনের মতো প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট জৈব পদার্থের কারণে পানির অস্বাভাবিক রঙ হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ডিপিএইচই নিয়মিতভাবে এসব পদার্থের পরীক্ষা করে না।
কলাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. মো. আহসানুল হক ডেইলি স্টারকে বলেন, পানিবাহিত রোগ হিসেবে নির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করা অসুস্থতা নিয়ে সাধারণত রোগীরা আসেন না।
তিনি বলেন, শিশুদের মধ্যে ডায়রিয়া ও টাইফয়েডের প্রকোপ রয়েছে। এছাড়া ত্বকের সমস্যাও দেখা যায়। তবে চিকিৎসা ও পরীক্ষাগারের প্রমাণ ছাড়া এসব সমস্যার সঙ্গে স্থানীয় পানির সরাসরি যোগসূত্র স্থাপন করা যায় না।
পৌরসভা ও ডিপিএইচই পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহের একটি প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে। প্রস্তাবিত দ্বিতীয় ধাপে একটি পানি শোধনাগার, একটি ওভারহেড ট্যাংক, প্রায় আট কিলোমিটার পাইপলাইন ও প্রায় ১ হাজার ৬০০টি পরিবারের সংযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
রিভার্স অসমোসিসের খরচ বেশি হওয়ায় ডিপিএইচই কোয়াগুলেশন, ফ্লকুলেশন, ফিল্ট্রেশন ও অ্যাক্টিভেটেড কার্বন ট্রিটমেন্টের বিষয়টিও বিবেচনা করছে।
আশরাফুজ্জামান বলেন, পরীক্ষাগারের ফলাফলে দেখা গেছে, এসব বিকল্প পদ্ধতিতেও পানি পরিষ্কার করা সম্ভব।

