‘নির্দেশনা না মানলে ব্যবসা চালাতে পারবে না বিমা কোম্পানি’

আর্থিক সংকটে থাকা যেসব বিমা কোম্পানি নিয়ন্ত্রকের নির্দেশনা মেনে চলবে না, তাদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)।

এ বিষয়ে আইডিআরএ চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, প্রয়োজনে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, আমরা সেগুলো নেবো।

সম্প্রতি দ্য ডেইলি স্টারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আইডিআরএর নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে—প্রথম বছরের প্রিমিয়াম সংগ্রহ স্থগিত করা, লাইসেন্স বাতিল করা, প্রশাসক নিয়োগ এবং শেষ পর্যন্ত কোম্পানি অবসায়ন করা।

নাদিয়া নিভিন বলেন, ৬০ শতাংশ সময় আমি কোম্পানিগুলোকে সহযোগিতা করার জন্য অংশীদার হিসেবে কাজ করব। তবে ৪০ শতাংশ সময় আমি নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করব। তারা নিয়ন্ত্রকের নির্দেশনা না মানলে তাদের ব্যবসা চালিয়ে যেতে দেওয়া হবে না।

ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, কোম্পানিটির প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার দাবি পরিশোধ বাকি রয়েছে। বিপরীতে, আদায়যোগ্য সম্পদের পরিমাণ আনুমানিক ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা হতে পারে। কোম্পানিটির প্রথম বছরের প্রিমিয়াম সংগ্রহ স্থগিত করা হয়েছে। ফলে বিদ্যমান দায়-দেনা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কোম্পানিটি ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারছে না।

আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, দাবি পরিশোধ করতে পারবেন না জেনেও যদি কোনো পলিসি বিক্রি করে, তাহলে তা প্রতারণা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

তিনি বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার এখন মূল লক্ষ্য—বিদ্যমান সম্পদ বিক্রি করে যতটা সম্ভব দাবি পরিশোধ করা, মানুষের আস্থা পুনর্গঠন করা এবং এরপর কোম্পানিটিকে ঘুরে দাঁড় করানো সম্ভব কি না, তা মূল্যায়ন করা।

তবে বিমা খাতের তাৎক্ষণিক সংকট সমাধান আইডিআরএ চেয়ারম্যানের সংস্কার পরিকল্পনার একটি অংশ মাত্র। তার লক্ষ্য, দীর্ঘমেয়াদে বিমা কোম্পানিগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী হিসেবে গড়ে তোলা।

তিনি বলেন, উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোতে জীবন বিমা কোম্পানিগুলো দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ করে। কারণ তাদের দায়ও দীর্ঘমেয়াদি।
বাংলাদেশ অবকাঠামো খাতে অর্থায়নে একই মডেল ব্যবহার করতে পারে।

চলতি বছরের জুনে নাদিয়া নিভিনকে তিন বছরের জন্য আইডিআরএর চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয় বিএনপি সরকার।

বাংলাদেশি শাসনব্যবস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বিশেষজ্ঞ নাদিয়া নীভিন ২০২৪ সালের অক্টোবরে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

তিনি বলেন, জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের বড় উৎস হিসেবে গড়ে উঠতে বাংলাদেশের বিমা খাতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, শক্তিশালী আর্থিক শৃঙ্খলা ও পরিচালনব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন।

নাদিয়া বলেন, দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও তীব্র আস্থার সংকটে থাকা এই খাতে আমার সংস্কার-অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যাবে বলেই আমি আইডিআরএর দায়িত্ব নিয়েছি। তবে এখন আমার প্রধান অগ্রাধিকার—পলিসিধারীরা যেন তাদের প্রাপ্য অর্থ পান, তা নিশ্চিত করা।

‘বাংলাদেশে বিমা গ্রহণের হার মাত্র প্রায় শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ এবং তা কমছে। এর মাধ্যমে গ্রাহকদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান আস্থাহীনতার প্রতিফলন ঘটছে, কারণ তারা প্রায়ই সময়মতো বিমার দাবি পান না’, বলেন তিনি।

আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর বুঝতে পারি, বিমা খাতে আস্থার সংকটের প্রধান কারণ হলো—মানুষ সময়মতো তাদের দাবি পাচ্ছেন না।

‘এ কারণে আইডিআরএ সবচেয়ে সংকটাপন্ন বিমা কোম্পানিগুলোকে দিয়ে কাজ শুরু করেছে। বিশেষ করে সাত বা আটটি কোম্পানি, যাদের বিপুল পরিমাণ দাবি অনিষ্পন্ন রয়েছে, তাদের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এসব কোম্পানির মালিক ও ব্যবস্থাপনাকে গভর্ন্যান্স পর্যালোচনা বৈঠকে আনা হয়েছে। একইসঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থা তাদের সম্পদ, তারল্য এবং দাবি পরিশোধের সক্ষমতা পরীক্ষা শুরু করেছে,’ বলেন তিনি।

নাদিয়া বলেন, কোম্পানিগুলো তাদের দায় এড়ানোর অজুহাত হিসেবে অতীতের ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতাকে ব্যবহার করতে পারে না। বাংলাদেশের আইনে একটি কোম্পানি একটি পৃথক সত্তা। আগের পরিচালনা পর্ষদ যা করেছে, সেটি ভিন্ন বিষয়। কোম্পানি তার পলিসিধারীদের কাছে দায়বদ্ধ থাকে।

আইডিআরএ আর্থিক সংকটে থাকা কোম্পানিগুলোর সরকারি বন্ড, স্থায়ী আমানত, ব্যাংকে থাকা অর্থ ও জমিসহ বিভিন্ন সম্পদের তথ্য সংগ্রহ করেছে।

দাবি পরিশোধে এসব অর্থ ব্যবহার করতে আর্থিকভাবে দুর্বল ব্যাংকগুলোতে আটকে থাকা অর্থ ছাড় করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে কাজ করছে সংস্থাটি। প্রয়োজন অনুযায়ী সম্পদ চিহ্নিত, মূল্যায়ন এবং বিক্রির জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে।

সম্পদ বিক্রি, বন্ড নগদায়ন বা স্থায়ী আমানত থেকে পাওয়া অর্থ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া ঠেকাতে কোম্পানিগুলোকে দাবি পরিশোধের জন্য পৃথক ব্যাংক হিসাব রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এসব হিসাব পর্যবেক্ষণে নিরীক্ষকদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একসঙ্গে নিয়মিত বিবরণী আইডিআরএর কাছে জমা দেওয়া হচ্ছে।

নিরীক্ষকদের মাধ্যমে দাবি যাচাই করে ‘আগে এলে আগে পরিশোধ’ ভিত্তিতে অর্থ দেওয়া হচ্ছে।

এর অংশ হিসেবে আইডিআরএর উদ্যোগে দুই ধাপে সাতটি সংকটাপন্ন জীবন বিমা কোম্পানির ৮ হাজার ৪১৭ জন গ্রাহককে মোট ৩৭ কোটি ৫৪ লাখ টাকার বিমা দাবি পরিশোধ করা হয়েছে।

প্রথম ধাপে বায়রা লাইফ ইনস্যুরেন্স, ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স, গোল্ডেন লাইফ ইনস্যুরেন্স, হোমল্যান্ড লাইফ ইনস্যুরেন্স, পদ্মা ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স, প্রগ্রেসিভ লাইফ ইনস্যুরেন্স ও সানফ্লাওয়ার লাইফ ইনস্যুরেন্সের ২ হাজার ৫৪৯ জন গ্রাহককে ১৪ কোটি ৫১ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়।

দ্বিতীয় ধাপে পদ্মা ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স, হোমল্যান্ড লাইফ ইনস্যুরেন্স, ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স, সানফ্লাওয়ার লাইফ ইনস্যুরেন্স ও সানলাইফ ইনস্যুরেন্সের ৫ হাজার ৮৬৮ জন গ্রাহককে ২৩ কোটি ৩ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়।

নাদিয়া নিভিন বলেন, বিমা খাতকে শক্তিশালী করতে বেশ কিছু কোম্পানির অভ্যন্তরীণ সংস্কার প্রয়োজন। লাইফ ফান্ড, অ্যাকচুয়ারিয়াল মূল্যায়ন, পরিশোধিত মূলধন, বিশেষ নিরীক্ষা, বিনিয়োগ পদ্ধতি এবং আগের নিরীক্ষা প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, তা পরীক্ষা করছে আইডিআরএ।

‘তবে একটি উদ্বেগের বিষয় হলো—অ্যাকচুয়ারিয়াল মূল্যায়নে কখনো কখনো এমন কিছু অনুমানের ওপর নির্ভর করা হতে পারে, যার ফলে কোম্পানির আর্থিক অবস্থান প্রকৃত অবস্থার চেয়ে শক্তিশালী বলে মনে হতে পারে’, বলেন তিনি।

বাংলাদেশে অ্যাকচুয়ারিয়াল বাজার ছোট এবং স্বার্থের সংঘাতের সম্ভাবনা থাকায়, বিমা কোম্পানিগুলো মূল্যায়নের ক্ষেত্রে যে ভিত্তি ব্যবহার করে, তা পর্যালোচনার জন্য আইডিআরএ একজন স্বাধীন অ্যাকচুয়ারি নিয়োগের পরিকল্পনা করছে।

নাদিয়া জানান, ওই অ্যাকচুয়ারি বিদেশ থেকেও নেওয়া হতে পারে।

পরিশোধিত মূলধনের ওপরও নিয়ন্ত্রণ জোরদার করেছে কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সমন্বয় করে এখন থেকে আইডিআরএর অনুমতি ছাড়া কোনো বিমা কোম্পানি পরিশোধিত মূলধন উত্তোলন, বন্ধক রাখা বা এ নিয়ে অন্য কোনো লেনদেন করতে পারবে না।

বিনিয়োগ পদ্ধতিও নজরদারির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

নাদিয়া বলেন, বিমা কোম্পানিগুলোকে জমিতে বিনিয়োগের পরিমাণ কমাতে হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা জমিতে বিনিয়োগ অনুমোদিত ২০ শতাংশ সীমার মধ্যে আনতে চায়। যেসব কোম্পানির অতিরিক্ত জমি রয়েছে, তাদের এসব সম্পদ বিক্রি করে সেই অর্থ উপযুক্ত খাতে বিনিয়োগ করতে বলা হবে।

একইসঙ্গে আইডিআরএ কোম্পানিগুলোর নেতৃত্বের মান উন্নত করার চেষ্টা করছে। কয়েকটি বিমা কোম্পানিতে এখনো অন্তর্বর্তী বা ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক রয়েছেন।

নাদিয়া বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা শুধু বিমা খাতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আগে থেকেই যাচাই করা আরও বিস্তৃত প্রার্থী তালিকা তৈরির পরিকল্পনা করছে।

তিনি আরও বলেন, আমরা মনে করি না যে, তাদের অবশ্যই বিমা খাত থেকেই আসতে হবে। তারা ব্যাংকিং বা আর্থিক খাতের অন্য অংশ থেকেও আসতে পারেন।

জলবায়ু ঝুঁকিতেও উদ্ভাবনের সুযোগ দেখছেন নাদিয়া।

আইডিআরএ প্যারামেট্রিক বিমা পণ্য নিয়ে কাজ করছে। এ ধরনের বিমায় প্রচলিত পদ্ধতিতে দাবি মূল্যায়নের পরিবর্তে আগে থেকে নির্ধারিত কোনো ঘটনা ঘটলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্থ পরিশোধ করা হয়।

আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, যমুনা নদী প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত একটি বন্যা বিমা পরীক্ষামূলক কর্মসূচির আওতায় ইতোমধ্যে পাঁচ জেলায় মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে প্রায় ১৪ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে মিলে শস্য বিমাও তৈরি করা হচ্ছে। এছাড়া এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সহায়তায় ছোট পরিসরে তাপ বিমার একটি পরীক্ষামূলক কর্মসূচি নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

বৃহত্তর পরিসরে চালুর আগে উদ্ভাবনী বিমা পণ্য পরীক্ষামূলকভাবে চালু করে যাচাইয়ের পরিকল্পনা করছে আইডিআরএ।

তবে আরও ভালো তথ্য ও শক্তিশালী তদারকি ছাড়া এই খাতের রূপান্তর সম্ভব নয় বলে মনে করেন নাদিয়া।

নাদিয়া বলেন, আইডিআরএর পাবলিক ড্যাশবোর্ডে আগে বিমার দাবি, তামাদি হওয়া পলিসি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সূচকের তথ্য প্রকাশ করা হতো। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ড্যাশবোর্ডটি নিয়মিত হালনাগাদ করা হয়নি।

তিনি আরও বলেন, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকির দিকে বৃহত্তর পরিবর্তনের অংশ হিসেবে কর্তৃপক্ষ এখন ড্যাশবোর্ডটি পুনরায় চালু করার পরিকল্পনা করছে। ব্যবস্থাটি পুরোপুরি চালু হলে আইডিআরএ প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে বিমা কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতে পারবে, এর মধ্যে তারা কতগুলো দাবি পরিশোধ করছে, সেটিও জানা যাবে।

আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, দাবি পরিশোধের হার আমাদের অন্যতম সূচক হবে। দাবি পরিশোধের সংখ্যা বাড়তে থাকলে আমরা বুঝতে পারব যে আমাদের উদ্যোগগুলো কাজ করছে।

তার মতে, বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিমাকে শুধু গ্রাহকের কাছে বিক্রি করা একটি পণ্য হিসেবে দেখার ধারণা থেকে বের করে এমন একটি আর্থিকভাবে সুশৃঙ্খল প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়া, যা পলিসিধারীদের সুরক্ষা দিতে, পুঁজিবাজারে সহায়তা করতে এবং অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি তহবিল জোগাতে সক্ষম।

এর জন্য আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বিমা কোম্পানিগুলোর সহযোগিতাও প্রয়োজন বলে জানান নাদিয়া নিভিন।

Related Articles

Latest Posts