অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি থেকে পণ্য আমদানিতে যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার পর পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে ইসরায়েল। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সার মঙ্গলবার একাধিক প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা ঘোষণা করেছেন।
বিবিসি জানিয়েছে, এর মধ্যে রয়েছে পূর্ব জেরুজালেমে ব্রিটিশ কনস্যুলেট বন্ধ করে দেওয়া, গাজা-সংক্রান্ত একটি আন্তর্জাতিক সমন্বয়কেন্দ্র থেকে ব্রিটিশ প্রতিনিধিদের সরিয়ে দেওয়া, পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া ব্রিটিশ কর্মসূচি বন্ধ করা এবং ১২ জন ব্রিটিশ নাগরিকের ইসরায়েলে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা।
ইসরায়েলের এই পদক্ষেপ এসেছে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডার সমন্বিত সিদ্ধান্তের পর। মঙ্গলবার তিন দেশ অধিকৃত পশ্চিম তীরের ইসরায়েলি বসতিগুলো থেকে পণ্য আমদানি বন্ধের ঘোষণা দেয়। তাদের দাবি, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ এবং বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতা দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের জন্য সরাসরি হুমকি হয়ে উঠেছে।
ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এডওয়ার্ড মিলিব্যান্ড বলেছেন, বসতি সম্প্রসারণের ফলে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি পশ্চিম তীরের কিছু এলাকায় ফিলিস্তিনিদের ‘জাতিগত নিধন’ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন।
ইসরায়েল অবশ্য এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সার যুক্তরাজ্যের পদক্ষেপকে ‘নৈতিকভাবে বিকৃত’ এবং একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ‘নির্লজ্জ হস্তক্ষেপ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞার জবাবে ইসরায়েল যে চারটি পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা করেছে, সেগুলো হলো—
পূর্ব জেরুজালেমে ব্রিটিশ কনস্যুলেট বন্ধ
ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সার জানিয়েছেন, জেরুজালেমে অবস্থিত ব্রিটিশ কনস্যুলেট বন্ধ করে দেওয়া হবে। এই কনস্যুলেট পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
গাজা-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সমন্বয়কেন্দ্র থেকে ব্রিটিশ প্রতিনিধিদের প্রত্যাহার
দক্ষিণ ইসরায়েলের কিরিয়াত গাতে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত আন্তর্জাতিক গাজা সহায়তা কেন্দ্র থেকে ব্রিটিশ প্রতিনিধিদের সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গাজা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে কেন্দ্রটি কাজ করে।
ফিলিস্তিনি নিরাপত্তা বাহিনীকে ব্রিটিশ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বন্ধ
রামাল্লায় ব্রিটিশ সাপোর্ট টিমের মাধ্যমে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কার্যক্রমও বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে ইসরায়েল। পশ্চিম তীরে নিরাপত্তা সমন্বয়ের ক্ষেত্রে এই কর্মসূচি দীর্ঘদিন ধরে চলছিল।
১২ ব্রিটিশ নাগরিকের ইসরায়েলে প্রবেশ নিষিদ্ধ
ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ ও অন্যান্য নাগরিকসহ ১২ জনকে ইসরায়েলে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। ইসরায়েলের দাবি, তারা ‘ইহুদিবিদ্বেষী ও ইসরায়েলবিরোধী কর্মকাণ্ডে’ জড়িত অথবা ইসরায়েল রাষ্ট্রের অস্তিত্ব অস্বীকার করেন।
নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রয়েছেন ১১ জন ব্রিটিশ পার্লামেন্ট সদস্য ও একজন আইনজীবী। তাদের মধ্যে সাবেক লেবার নেতা জেরেমি করবিন এবং এমপি জারা সুলতানাও রয়েছেন।
তালিকায় আরও রয়েছেন লেবার পার্টির নাজ শাহ, ডায়ান অ্যাবট, হান্না স্পেন্সার, কার্লা ডেনিয়ার, সিয়ান বেরি, এলি চাউনস, জন ম্যাকডোনেল, রিচার্ড বার্গন ও অ্যাড্রিয়ান রামসে।
এ ছাড়া রয়েছেন আইনজীবী ফাহাদ আনসারি, যিনি ‘রিভারওয়ে টু দ্য সি’ নামের একটি আইনি প্রশিক্ষণ ও অধিকারভিত্তিক সংগঠনের পরিচালক।
ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নির্দিষ্টভাবে প্রত্যেক ব্যক্তির বিরুদ্ধে আলাদা অভিযোগের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়নি। তারা শুধু জানিয়েছে, ‘ইহুদিবিদ্বেষী ও ইসরায়েলবিরোধী কর্মকাণ্ডে’ জড়িত এবং ইসরায়েল রাষ্ট্রের অস্তিত্ব অস্বীকারকারীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হবে।
তালিকায় থাকা ফাহাদ আনসারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছেন, তিনি ব্রিটিশ নন এবং এমপিও নন। তবে ইসরায়েলের নিষেধাজ্ঞাকে তিনি ‘সম্মানের ব্যাজ’ হিসেবে দেখছেন।
গ্রিন পার্টিও প্রতিক্রিয়ায় বলেছে, তাদের পাঁচ এমপিকে ইসরায়েলে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলেও তারা ‘ভয় পেয়ে নীরব’ হবে না। দলটির ভাষ্য, ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিয়ে কথা বলার কারণে তারা তাদের অবস্থান থেকে সরে যাবে না।
জারা সুলতানাও বলেছেন, এই নিষেধাজ্ঞা তাকে নীরব করবে না। অন্যদিকে জেরেমি করবিন যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞাকে স্বাগত জানালেও তা যথেষ্ট নয় বলে মন্তব্য করেছেন।
টাইমস অব ইসরায়েল জানিয়েছে, ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সার যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞাকে শুধু বসতি নীতির বিরোধিতা হিসেবে দেখছেন না, তিনি এটিকে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ হিসেবেও তুলে ধরেছেন।
সার বলেন, বর্তমান ব্রিটিশ সরকার ‘শত্রুভাবাপন্ন’ এবং গত দুই বছর ধরে পদ্ধতিগতভাবে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কাজ করছে। আগামী মাসে ইসরায়েলে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি অভিযোগ করেন, যুক্তরাজ্য নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে।
তিনি মিলিব্যান্ডের পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর ‘জাতিগত নিধন’ চলছে, এমন বক্তব্যকে ‘আপত্তিকর ও মিথ্যা’ বলে প্রত্যাখ্যান করেন।
পশ্চিম তীরে ই১ বসতি প্রকল্প নিয়েও দুই দেশের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়েছে। মিলিব্যান্ড বলেছিলেন, ওই প্রকল্প ঠেকাতে যুক্তরাজ্য পদক্ষেপ নিতে চায়। জবাবে সার বলেন, ই১ নিয়ে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তার অভিযোগ, যুক্তরাজ্য নির্বাচনী প্রচারণার সময় ইসরায়েলের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে।
ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগও ব্রিটিশ পদক্ষেপকে ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচনে হস্তক্ষেপ হিসেবে সমালোচনা করেছেন।
ইসরায়েলের বসতি সংগঠনগুলোর কাছ থেকেও যুক্তরাজ্যের সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা এসেছে।
বসতি সংগঠনগুলোর আমব্রেলা সংগঠন ইয়েশা কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ইয়িসরায়েল গানজ যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞাকে ‘ইহুদিবিদ্বেষী’ এবং ‘নৈতিকভাবে লজ্জাজনক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তার দাবি, পশ্চিম তীরে বসবাস ও কাজ করার কারণে ইসরায়েলিদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া অন্যায়।
গানজ আরও বলেছেন, নিষেধাজ্ঞার জবাবে ইসরায়েলি বসতিতে আরও নির্মাণ, নতুন বসতি এবং ইসরায়েলি সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে।
মালে আদুমিমের মেয়র গাই ইফ্রাখও ইসরায়েলিদের বসতি এলাকার ব্যবসা ও শিল্পকে সমর্থন করার আহ্বান জানিয়েছেন। তার দাবি, নিষেধাজ্ঞার ফলে বাজার বন্ধ হয়ে গেলেও নতুন বাজার তৈরির চেষ্টা করা হবে।
এদিকে, বসতি সম্প্রসারণের বিরোধিতাকারী ইসরায়েলি সংগঠন পিস নাউ যুক্তরাজ্যের পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে।
সংগঠনটির মতে, পশ্চিম তীরের বসতিগুলো ইসরায়েলের ভবিষ্যৎকেই ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। তাদের ভাষ্য, বসতি ও ইসরায়েলি ভূখণ্ডের মধ্যে পার্থক্য করে ব্যবস্থা নেওয়া মানেই পুরো ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া নয়।
পিস নাউ সতর্ক করে বলেছে, ইসরায়েল সরকার যদি ই১ বসতি প্রকল্প এগিয়ে নেয় এবং দুই-রাষ্ট্র সমাধানকে দুর্বল করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে, তাহলে ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা আরও বাড়বে এবং এর অর্থনীতি ও বৈশ্বিক ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা পর্যবেক্ষণকারী সংগঠন লুকিং দ্য অকুপেশন ইন দ্য আইও ব্রিটিশ নিষেধাজ্ঞাকে স্বাগত জানিয়েছে। তাদের মতে, পশ্চিম তীরের বসতি ও ফাঁড়িগুলোর পণ্য ভূমি দখল, বাড়িঘর ধ্বংস এবং ফিলিস্তিনিদের ওপর সহিংসতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
তবে ব্রিটিশ ইহুদি সম্প্রদায়ের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় নেতা প্রধান র্যাবাই এফ্রাইম মিরভিস যুক্তরাজ্য সরকারের সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন।
তিনি দিনটিকে ‘ব্রিটিশ ইহুদিদের জন্য অন্ধকার দিন’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, এই পদক্ষেপ শান্তি প্রতিষ্ঠায় কোনো ভূমিকা রাখবে না, বরং ইহুদিদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে।
তার অভিযোগ, ব্রিটিশ সরকার নিজ দেশের ইহুদি সম্প্রদায়ের উদ্বেগ উপেক্ষা করেছে এবং এই পদক্ষেপ উগ্রপন্থাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডার পদক্ষেপের পর যুক্তরাষ্ট্রও স্পষ্ট করেছে যে তারা একই পথে হাঁটবে না।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, ওয়াশিংটন ব্রিটেনের মতো ইসরায়েলি বসতি থেকে পণ্য আমদানি বন্ধ করবে না। তবে তিনি পশ্চিম তীরে এমন কোনো পদক্ষেপ দেখতে চান না, যা অঞ্চলটিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
রুবিও বলেন, পশ্চিম তীরের পরিস্থিতির সঙ্গে গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ২০ দফা পরিকল্পনারও সম্পর্ক রয়েছে।
পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ, গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা নিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরায়েল ও যুক্তরাজ্যের সম্পর্ক ক্রমেই উত্তপ্ত হয়েছে।
২০২৫ সালে যুক্তরাজ্য ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়া দেশগুলোর সঙ্গে যোগ দেয়। একই বছর পশ্চিম তীরের বসতি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ওপর নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করে লন্ডন।
এবার বসতি থেকে পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্ত সেই চাপকে আরও বাড়িয়েছে। যদিও বসতিগুলো থেকে ইসরায়েলের মোট রপ্তানির পরিমাণ খুবই সামান্য, ফলে সরাসরি অর্থনৈতিক ক্ষতির চেয়ে এই পদক্ষেপের রাজনৈতিক তাৎপর্য বেশি।
যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডার পাশাপাশি আরও ১০টি দেশ দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। তাদের মতে, পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ ও বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা অব্যাহত থাকলে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসবে।

