রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও ৭০ অনুচ্ছেদ: জুলাই সনদে যেসব পরিবর্তনের প্রস্তাব ছিল

৩৫ বছর পর অনুষ্ঠিত হলো প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। এতে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পেয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন না। সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ সদস্যদের (এমপি) ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। বর্তমান ব্যবস্থায় এই নির্বাচনে ভোট হয় উন্মুক্তভাবে। প্রত্যেক এমপি একটি করে ভোট দেন। একাধিক প্রার্থী থাকলে যে প্রার্থী বেশি ভোট পান, তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ভোট সমান হলে লটারির মাধ্যমে ফল নির্ধারণের বিধান রয়েছে।

এই নির্বাচনে বারবার আলোচনায় এসেছে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ। এতে বলা হয়েছে, সংসদ সদস্যরা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ভোট দিলে তাদের সংসদ সদস্য পদ হারানোর ঝুঁকি থাকে। চলতি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে প্রধান হুইপ নূরুল ইসলাম মনি স্পষ্ট করে বলেছেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ৭০ অনুচ্ছেদ কার্যকর থাকবে।

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সংসদ সদস্য যে দলের মনোনয়নে নির্বাচিত হয়েছেন, তিনি ওই দল থেকে পদত্যাগ করলে বা সংসদে দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে তার আসন শূন্য হবে।

ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কোনো সংসদ সদস্য নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে চাইলে এবং সেটা তার দলের সিদ্ধান্তের বিপরীত হলে তিনি সংসদ সদস্য পদ হারাতে পারেন।

যেহেতু ভোট হচ্ছে উন্মুক্তভাবে, অর্থাৎ কোন সংসদ সদস্য কোন প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন, তা গোপন থাকছে না। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দেওয়ার সাংবিধানিক সুযোগও নেই।

১৯৯১ সালে সংসদীয় ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের এই পদ্ধতিই চালু আছে। এরপর ১৯৯৬ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত আটটি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হয়েছে। প্রতিবার ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীই নির্বাচিত হয়েছেন।

৭০ অনুচ্ছেদ পরিবর্তনের আলোচনা অবশ্য শুধু রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সংবিধান সংস্কার কমিশনসহ ছয়টি সংস্কার কমিশনের সুপারিশ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা হয়। সেই আলোচনার ভিত্তিতেই জুলাই জাতীয় সনদ তৈরি করা হয়।

বিএনপিও আগে থেকে ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কারের কথা বলে আসছে। দলটির ‘রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফায়’ বলা হয়েছিল, আস্থা ভোট, অর্থ বিল, সংবিধান সংশোধনী বিল ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত বিষয় ছাড়া অন্য বিষয়ে এমপিদের স্বাধীনভাবে মতামত দেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করার জন্য ৭০ অনুচ্ছেদ বিবেচনা করা হবে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের ইশতেহারেও দলটি এ বিষয়ে সংস্কারের কথা বলে।

জুলাই জাতীয় সনদের ২৫ নম্বর ক্রমিকে ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে বলা হয়েছে, এমপিরা শুধু অর্থ বিল ও আস্থা ভোটের ক্ষেত্রে নিজদলের প্রতি অনুগত থাকবেন। অন্য যেকোনো বিষয়ে তারা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন।

অর্থাৎ কোনো সাধারণ আইন, নীতি বা সংসদীয় প্রস্তাব নিয়ে দলীয় সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত থাকলেও একজন এমপি নিজের অবস্থান অনুযায়ী ভোট দিতে পারবেন। তবে অর্থ বিল ও আস্থা ভোটের ক্ষেত্রে দলীয় অবস্থানের বাইরে যাওয়ার সুযোগ থাকবে না।

রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনাতেও এই কাঠামো নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন দল অর্থ বিল ও আস্থা ভোটসহ নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে ৭০ অনুচ্ছেদ বহাল রেখে অন্য বিষয়ে সংসদ সদস্যদের স্বাধীন ভোটের পক্ষে সম্মতি দিয়েছিল।

জুলাই সনদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদ্ধতিতেও পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। বর্তমান এককক্ষ সংসদের বদলে দ্বিকক্ষ সংসদ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। সেই দুই কক্ষের সদস্যদের গোপন ব্যালটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের কথা বলা হয়েছে।

বর্তমানে এমপিরা উন্মুক্ত ভোট দেন। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় ভোট হবে গোপন ব্যালটে। ফলে একজন এমপি কোন প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন, তা প্রকাশ্যে জানা যাবে না।

তবে এখানে ৭০ অনুচ্ছেদের বিষয়টি আলাদা করে গুরুত্বপূর্ণ। জুলাই সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনায় বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে ৭০ অনুচ্ছেদ কার্যকর থাকবে। অর্থাৎ ৭০ অনুচ্ছেদে সাধারণভাবে সংসদ সদস্যদের স্বাধীন ভোটের সুযোগ বাড়ানো হলেও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন তার ব্যতিক্রম হতে পারে।

জুলাই সনদের প্রস্তাব শুধু রাষ্ট্রপতি কীভাবে নির্বাচিত হবেন, সেখানে থেমে নেই। রাষ্ট্রপতির কিছু সাংবিধানিক ক্ষমতা বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে।

বর্তমান ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া প্রায় সব ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করেন। ফলে রাষ্ট্রপতির স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্র সীমিত।

প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়াই জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং জ্বালানি নিয়ন্ত্রণ কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগ করতে পারবেন।

এ ছাড়া সার্চ কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার, ন্যায়পাল, সরকারি কর্ম কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য এবং মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক নিয়োগ করবেন।

রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদানের ক্ষেত্রেও প্রস্তাবিত পরিবর্তন আছে। দণ্ড মওকুফ, স্থগিত, কমানো বা পরিবর্তনের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির থাকবে। তবে এ ক্ষমতা প্রয়োগের আগে অভিযোগকারী বা ভুক্তভোগীর পরিবারের সম্মতির বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

জুলাই সনদের প্রস্তাবগুলোতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরির কয়েকটি ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

একদিকে রাষ্ট্রপতির নির্বাচনে গোপন ব্যালটের প্রস্তাব করা হয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ কিছু নিয়োগে তার স্বাধীন ক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ একজন ব্যক্তির জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছর করার প্রস্তাব রয়েছে। একই ব্যক্তি একই সময়ে প্রধানমন্ত্রী ও রাজনৈতিক দলের প্রধান থাকতে পারবেন না, এমন প্রস্তাবও রয়েছে।

এ ছাড়া দ্বিকক্ষ সংসদ গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। নিম্নকক্ষ ও উচ্চকক্ষের মাধ্যমে আইন প্রণয়ন ও সাংবিধানিক ক্ষমতার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত একটি স্তর যুক্ত করার পরিকল্পনাও এর অংশ।

অর্থাৎ জুলাই সনদের কাঠামোতে তিনটি বিষয় একসঙ্গে পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে, সংসদ সদস্যদের ভোটের স্বাধীনতা, রাষ্ট্রপতির নির্বাচনের পদ্ধতি এবং রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা। এর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ ও ক্ষমতার ক্ষেত্রেও সীমা আনার প্রস্তাব রয়েছে।

বর্তমান ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হন এবং ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে সংসদ সদস্যদের দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দেওয়ার সুযোগ সীমিত। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় অধিকাংশ বিষয়ে সংসদ সদস্যদের স্বাধীন ভোটের সুযোগ তৈরি হবে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে গোপন ব্যালট থাকবে এবং রাষ্ট্রপতির কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগের ক্ষমতা বাড়বে। একইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরির জন্য আলাদা কিছু সাংবিধানিক বিধান যুক্ত হবে।

এটাই জুলাই সনদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও ৭০ অনুচ্ছেদ ঘিরে প্রস্তাবিত পরিবর্তনের মূল কাঠামো।

Related Articles

Latest Posts