ভারতীয় সাংবাদিক ভরত সুন্দরেশন অস্ট্রেলিয়ার একটি গণমাধ্যমের হয়ে ডারউইন টেস্ট কাভার করছিলেন। ম্যাচ শেষে বিশ্লেষণে তিনি বলে উঠলেন, ‘টেস্ট ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা একটি দিন আজ’। টেস্ট খেলা হয় প্রায় দেড়শো বছর ধরে, ডারউইন টেস্টের আগে হয়েছে আরও ২৬২৮ টেস্ট। এত শতো টেস্টের ভেতরে অন্যতম সেরা দিনের তকমা পাওয়া কত বড় ব্যাপার আসলে?
ভরত একা নন, ‘টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অঘটন’ বলছেন অনেকে। এখানে অঘটন বলতে আবার নেতিবাচক কিছু নয় কিন্তু। এমন অপ্রত্যাশিত কিছু যা ঘুণাক্ষরেও ভাবেননি কেউ।
ধারাভাষ্যকার হার্শা ভোগলে ব্যস্ত ছিলেন ভারত-শ্রীলঙ্কার গল টেস্ট নিয়ে। কিন্তু ডারউইনে এমন লঙ্কাকাণ্ড হয়ে গেল যে লঙ্কা থেকে সরে তাকেও যেতে হলো ডারউইনের আলোচনায়। এশিয়ান দলগুলোর অস্ট্রেলিয়ার মাঠের ইতিহাস তুলে ধরে হার্শা রীতিমতো এক ভিডিও পোস্ট করে বোঝাতে চাইলেন কত বড় কীর্তি করে ফেলেছে বাংলাদেশ!
রিকি পন্টিং থেকে মার্ক ওয়াহ, ওয়াসিম আকরাম থেকে রবিচন্দ্রন অশ্বিন, ইয়ান বিশপ থেকে মাইকেল ভন। দুনিয়ার তাবৎ প্রাক্তন ক্রিকেটার, বিশ্লেষক তাদের ক্রিকেট বোধের গভীরতা দিয়ে মন্তব্য করেছেন প্রাণখুলে।
অস্ট্রেলিয়ার মাঠে গিয়ে কখনো টেস্ট জেতেনি শ্রীলঙ্কা। প্রথম জয় পেতে ভারতের খেলতে হয়েছে ১২ টেস্ট, পাকিস্তানের ৭। সম্প্রতি ভারত অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে নিয়মিত জিতছে। এমনকি একমাত্র এশিয়ান দল হিসেবে টানা দুই সিরিজও সেখানে জিতেছে তারা। তবে ভারতীয় বর্তমান দলের ক্রিকেটীয় দক্ষতা মাথায় রাখতে হবে। মাথায় আনতে হবে আরেক তথ্য, পাকিস্তান অস্ট্রেলিয়ার মাঠে সর্বশেষ টেস্ট জিতেছে ৩০ বছর আগে! এমনকি ওয়াসিম আকরাম, শোয়েব আখতারদের প্রাইম টাইমে খেলা লম্বা সময়েও তারা জেতেনি! আর বাংলাদেশ তৃতীয় টেস্টেই জিতে গেছে। তাও খেলার সুযোগ পেয়েছে ২৩ বছর পর।
কেউ বলতে পারেন, যে ভেন্যুতে খেলা হয়েছে সেখানে তো অস্ট্রেলিয়াও টেস্ট খেলে না ২২ বছর। সেখানকার আবহাওয়া বরং উপমহাদেশের সঙ্গে বেশি মানানসই। মূল ভেন্যুতে খেলা হলে কি এমন ফল করতে পারত বাংলাদেশ? প্রথমত, বাংলাদেশ কিন্তু ভেন্যু বাছাই করেনি। দ্বিতীয়ত খেলা যেখানেই হোক আয়োজক অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট সংস্কৃতি মাথায় নিতে হবে। টেস্ট ক্রিকেট ইতিহাসে অস্ট্রেলিয়ার চেয়ে বেশি সাফল্য কারো নেই। ক্রিকেট অবকাঠামো, ক্রিকেট সংস্কৃতি তাদের অতুলনীয়।
অস্ট্রেলিয়া ভীষণ সমৃদ্ধ এক টেস্ট জাতি। টেস্ট ম্যাচে তাদের গ্যালারি কেন ভরপুর থাকে, ক্রিকেটের অন্য সংস্করণের ঝলকের ভিড়েও টেস্ট নিয়ে তাদের আলোচনা, গুরুত্ব কেন এত বেশি এসবের মাঝে লুকিয়ে আছে উত্তর।
অস্ট্রেলিয়া প্রতিপক্ষকে কোনো সুযোগ দিতে চায় না, ক্রিকেটীয় দক্ষতায়, মানসিক শক্তিতে একদম ছিন্নভিন্ন করে ফেলতে চায়। অনেক সময়ই তা তারা করেও।
এমন একটা দলের বিপক্ষে, এমন এক ক্রিকেট জাতির বিপক্ষে ২০ বা ৫০ ওভার নয়, রীতিমতো পাঁচদিনের খেলায় প্রতিটি সেশন এমনকি প্রতিটি ঘণ্টা দাপট দেখিয়ে ম্যাচ জেতার মাহাত্ম্য অপরিসীম। অপরিসীম শব্দটা ক্লিশে লাগতে পারে। কিন্তু আদতেই এটা তা।
সত্যিকারের ক্রিকেট সংস্কৃতির ঘাটতিতে বাংলাদেশের ক্রিকেট সমর্থকদের অনেকেই হয়তো বিষয়টার বিশালত্ব অনুধাবন করতে পারছেন না। অনুধাবন করতে পারছেন ভোগলে, বিশপরা। বাংলাদেশের এই জয় টেস্ট ক্রিকেটের আগামীর গতির পথেও প্রভাব রাখতে পারে। ভবিষ্যৎ সূচি পরিকল্পনায় বড়সড় বিবর্তন আসা, বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের আদল পরিমার্জনের মতো কিছু দেখাও অস্বাভাবিক না।
বাংলাদেশ দল স্রেফ একটা টেস্ট জেতেনি আসলে, বিশ্ব ক্রিকেটকেই নাড়িয়ে দিয়েছে।

