দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সবুজ সংকেত পাওয়ার পর আজ বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী হিসেবে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম ঘোষণা করতে যাচ্ছে বিএনপি। দলীয় সূত্রে এমনটি জানা গেছে।
সূত্র জানায়, গত ১০ দিনে বিএনপির নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কয়েক দফা আলাপ-আলোচনা ও মতবিনিময় শেষে এলজিআরডি মন্ত্রী ফখরুলকেই রাষ্ট্রপতি পদের জন্য দলের চূড়ান্ত প্রার্থী হিসেবে বেছে নিয়েছেন তারেক রহমান।
এই সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণার আগে সচিবালয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যদের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন দলের চেয়ারম্যান।
দলীয় একটি সূত্র জানিয়েছে, ওই বৈঠকেই তারেক রহমান প্রার্থীর নাম প্রকাশ করতে পারেন। এ ছাড়া রাষ্ট্রপতি প্রার্থীর নাম প্রস্তাব ও সমর্থন করার জন্য উপযুক্ত ব্যক্তি নির্বাচনের বিষয়ে তিনি সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ করবেন।
স্থায়ী কমিটির এক সদস্য বলেন, ‘বৈঠকে সম্ভাব্য প্রার্থীর স্বাক্ষর নেওয়া হবে। এরপর প্রস্তাবক ও সমর্থকের স্বাক্ষরসহ মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনে একটি প্রতিনিধিদল পাঠানো হবে।’
সূত্র জানায়, ৭৮ বছর বয়সী ফখরুল এই বৈঠকেই তার মন্ত্রিত্বের পদ ছাড়তে পারেন, এমনটি ধারণা করা হচ্ছে।
এরপর বিএনপি নেতারা নির্বাচন কমিশনে যাবেন। সেখানে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ফখরুলের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হতে পারে এবং এরপরই আনুষ্ঠানিকভাবে তার প্রার্থিতা ঘোষণা করা হবে।
বিএনপির চিফ হুইপ ও দলের ভাইস চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম মনি জানান, জামায়াতে ইসলামী তাদের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর বিএনপি তাদের মনোনয়নপত্র জমা দেবে।
তিনি আরও বলেন, ‘মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর রাষ্ট্রপতি প্রার্থীর নাম জনসমক্ষে ঘোষণা করা হবে।’
তফসিল অনুযায়ী, আজ সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া যাবে।
গত ১ আগস্টের এক বৈঠকে বিএনপির স্থায়ী কমিটি দলের রাষ্ট্রপতি প্রার্থী নির্বাচনের জন্য তারেক রহমানকে পূর্ণ ক্ষমতা দেয়।
৯ আগস্ট মনি এবং বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী নির্বাচন কমিশন (ইসি) থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন। এর পরের দিন রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে এলডিপির চেয়ারম্যান অলি আহমদের জন্য মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করে জামায়াত-নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য।
২০ আগস্ট দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সংসদীয় অধিবেশনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। সংসদ সদস্যরা প্রকাশ্য ব্যালটের মাধ্যমে তাদের ভোট দেবেন।
২৪ জুলাই মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করার পর রাষ্ট্রপতির পদটি শূন্য হয়। তখন থেকে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন।
এলজিআরডি মন্ত্রী ছাড়াও ফখরুল বর্তমানে একজন সংসদ সদস্য এবং বিএনপির মহাসচিবের পদে রয়েছেন। তিনি যদি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন, তবে তাকে এই তিনটি পদই ছেড়ে দিতে হবে। সেক্ষেত্রে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ও দলকে তার স্থলাভিষিক্ত বা বিকল্প ব্যক্তি নির্বাচন করতে হবে।
কেন ফখরুল?
বিএনপি মনে করে, দলের ভেতরে একজন পরীক্ষিত নেতা হওয়ার পাশাপাশি অন্যান্য রাজনৈতিক দল এবং সাধারণ মানুষের কাছে ফখরুলের একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি ও ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।
বেশ কয়েকজন সিনিয়র নেতা জানিয়েছেন, এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব ফখরুলকে সম্মানিত করতে চায়।
আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে দমন-পীড়ন ও নির্যাতনের মুখে বিএনপি ভয়াবহ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছিল। দলের প্রধান খালেদা জিয়া কারাবন্দি ছিলেন এবং তারেক রহমান লন্ডনে নির্বাসিত অবস্থায় ছিলেন।
এই দুই শীর্ষ নেতার অনুপস্থিতিতে ফখরুল দীর্ঘ সময় ধরে দেশের ভেতরে বিএনপির প্রধান দৃশ্যমান নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি সংকটের সময়ে দলকে সঠিক পথ দেখিয়েছেন এবং আওয়ামী লীগ বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
দল বিশ্বাস করে, তাকে পুরস্কৃত করা হলে তা একটি জোরালো উদাহরণ সৃষ্টি করবে এবং দলের সর্বস্তরের নেতা-কর্মীদের মাঝে ইতিবাচক বার্তা দেবে।
বিদ্যমান সংবিধানে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সীমিত হলেও রাজনৈতিক বা সাংবিধানিক সংকটের সময় এই পদটি বিভিন্ন সময়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
জাতীয় নির্বাচন পরিচালনার জন্য এখন তিন মাসের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল করা হয়েছে। অতীতে এ ধরনের সময়ে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।
এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির অবস্থান, দলের ভেতর থেকেই একজন সক্রিয় রাজনীতিবিদকে রাষ্ট্রপতি করা উচিত।
রাজনৈতিক জীবন
ফখরুল ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ থেকে বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে, ২০১১ সালের ২০ মার্চ থেকে পাঁচ বছর তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে তাকে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।
২০০১ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচনে ফখরুল তার নিজ জেলা ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হন।
২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তিনি কৃষি এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ সালে তিনি নবম সংসদ নির্বাচনেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।
ফখরুল ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেন। ১৯৮৮ সালে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে দেশব্যাপী এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় ফখরুল বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯২ সালে তাকে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি করা হয়।
১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে এই নেতার জন্ম।

