ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস আর লবণাক্ততা যখন তার ভিটেমাটি ও কাজ কেড়ে নিয়েছিল, তখন বাধ্য হয়েই এলাকা ছেড়েছিলেন হাবিব গাজি। তবে প্রতিকূল সেই পরিস্থিতির কাছে হার মানেননি তিনি। ‘ঘটি গরম’ বিক্রি করে অভাবের সেই দিনগুলো পেছনে ফেলেছেন তিনি।
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার সুন্দরবনঘেঁষা ও দুর্যোগপ্রবণ গাবুরা ইউনিয়নের সন্তান হাবিব গাজি। বর্তমানে তিনি খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার রংপুর গ্রামে বাস করলেও মূলত সাতক্ষীরা শহর ও এর আশপাশের হাটবাজারে ঘটি গরম বিক্রি করেন।
চানাচুর, মুড়ি, চিড়া, বাদাম, ঝাল ও নানা মসলা মিশিয়ে তৈরি করা মুখরোচক খাবার নিয়ে তিনি রঙিন পোশাকে হাঁক দেন—‘ঘটি গরম লেবে!’
নিজের ফেলে আসা জীবনের গল্প বলতে গিয়ে হাবিব গাজি বলেন, ‘গাবুরায় থাকতে খুব কষ্ট হতো। কাজ ছিল না বললেই চলে। এক দিন কাজ পেলে কয়েক দিন বসে থাকতে হতো। অভাব বাড়তে থাকায় মনে হলো অন্য কোথাও গিয়ে নিজের মতো কিছু করতে হবে। তাই ডুমুরিয়ায় চলে আসি। সামান্য পুঁজিতে ঘটি গরম বিক্রি শুরু করি।’
তিনি জানান, প্রতিদিন গড়ে দেড় হাজার টাকার ঘটি গরম বিক্রি হয় তার। সব খরচ বাদ দিয়ে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা লাভ থাকে। এই আয়েই তার সংসার চলছে। দুই ছেলে ও এক মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। ছোট মেয়েটিকে স্কুলে ভর্তি করেছেন। এখন আর সংসারের অভাব তাকে তাড়িয়ে বেড়ায় না।
ভিন্নধর্মী পোশাকের জন্যও হাবিব গাজি জনপ্রিয়। প্রতিদিনই তিনি ভিন্ন রঙের পোশাক পরে ও অভিনব সাজে নিজেকে উপস্থাপন করেন।
সাতক্ষীরা শহরের নিউমার্কেট এলাকার বাসিন্দা সাগর বৈদ্য বলেন, ‘আমরা তার জন্য অপেক্ষা করে থাকি। তিনি আমাদের এলাকায় এলেই বন্ধুদের নিয়ে ঘটি গরম কিনে খাই।’
পাটকেলঘাটা বাজার কমিটির সভাপতি লতিফ সরকার জানান, গতকাল বুধবারও হাবিব গাজিকে পাটকেলঘাটা বাজারে দেখা গেছে। সেখানে নানা বয়সের মানুষ ভিড় করে তার ঘটি গরম কিনেছে।
লতিফ সরকার বলেন, ‘রঙিন ও আকর্ষণীয় পোশাক পরে ঘুরে ঘুরে তিনি বিক্রি করেন। তার উপস্থিতিই আলাদা প্রাণচাঞ্চল্য এনে দেয় বাজারে। সুস্বাদু চানাচুর আর হাস্যরসে ক্রেতাদের আনন্দ দেন তিনি।’
গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাসুদুল আলম বলেন, ‘হাবিব গাজির জীবনটা ছিল সংগ্রামের। গাবুরায় দীর্ঘদিন কাজের অভাবে তিনি মানবেতর জীবন কাটিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত জীবিকার সন্ধানে ভিটেমাটি ছেড়ে খুলনার ডুমুরিয়ায় চলে যান।’
তিনি আরও বলেন, ‘কয়েক দিন আগে সাতক্ষীরা শহরে তার সঙ্গে আমার দেখা হয়। তাকে দেখে সত্যিই খুব ভালো লেগেছে। পরিশ্রম আর সততার জোরে তিনি আজ নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন।’

