কেন ককরোচদের ভূত তাড়াতে পারছেন না মোদি?

ভারতে পরীক্ষা নিয়ে অনিয়মের প্রতিবাদে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের ওপর বড় ধরনের রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে। এই আন্দোলনের জেরেই গত ২৫ জুলাই শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতে হয়। এরপর তরুণদের কাছে পৌঁছাতে মোদি সরকার যেমন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন কৌশল নিয়েছে, তেমনি প্রতিবাদী কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণে সরকারের চাপ বাড়ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

এএফপির এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দিল্লিতে শুরু হওয়া আন্দোলনটি পরীক্ষা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। দ্রুতই তা তরুণদের কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক সুযোগের সংকট এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থাহীনতার মতো বৃহত্তর ক্ষোভে রূপ নেয়। অনলাইনে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামে পরিচিত একটি যুবগোষ্ঠী আন্দোলনটির নেতৃত্ব দেয়।

আন্দোলনের বড় অংশ এখন থেমে গেলেও এর প্রভাব নিয়ে মোদি সরকারের ওপর চাপ রয়েছে। এএফপি বলছে, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দৃঢ় ও আপসহীন নেতা হিসেবে নিজের ভাবমূর্তি তৈরি করা মোদির জন্য বিরল রাজনৈতিক পিছু হটার ঘটনা।

তবে আন্দোলনের পর সরকার তরুণদের কাছে পৌঁছানোর উদ্যোগ নিয়েছে এবং সংসদে প্রশ্নপত্র ফাঁসের জন্য শাস্তি বাড়ানো হয়েছে। কয়েকটি শহরে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে করা মামলাও প্রত্যাহার করেছে পুলিশ।

A post shared by Narendra Modi (@narendramodi)

ইনস্টাগ্রামে মোদির নতুন রাজনৈতিক কৌশল

আন্দোলনের পর মোদি নিজেও তরুণদের কাছে পৌঁছাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কৌশল বদলেছেন। দ্য হিন্দুর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, গত ২৩ জুলাই থেকে তিনি ইনস্টাগ্রামে একের পর এক ‘রিল’ প্রকাশ করছেন। একই সময়ে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) প্রধান মোহন ভাগবতও তরুণদের উদ্দেশে বক্তব্য দিতে শুরু করেছেন।

দ্য হিন্দুর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই প্রচেষ্টা সরাসরি ১৪ থেকে ২৯ বছর বয়সী ‘জেন-জি’ তরুণদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা বলে মনে হলেও এর লক্ষ্য সম্ভবত তাদের বাবা-মায়ের একটি বড় অংশ। বিশ্লেষণটির যুক্তি হলো, মোদি ও ভাগবত হয়তো ইনস্টাগ্রাম প্রজন্মের মন জয় করার চেয়ে আগে থেকেই বিজেপির সমর্থক ‘হোয়াটসঅ্যাপ প্রজন্মের’ সমর্থন ধরে রাখতে চাইছেন।

মোদির জনপ্রিয়তা গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে হোয়াটসঅ্যাপের ভূমিকার কথাও তুলে ধরেছে দ্য হিন্দু। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে হোয়াটসঅ্যাপভিত্তিক বিভিন্ন কমিউনিটির মাধ্যমে মোদির রাজনৈতিক বার্তা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ওই সময় ভারতে প্রায় ছয় কোটি মানুষ হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করতেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

মোদির সাম্প্রতিক রিলগুলোর একটি তার বিরুদ্ধে তরুণ বিক্ষোভকারীদের অশালীন মন্তব্যের প্রসঙ্গে। সেখানে তিনি তাদের ক্ষমা করে ‘বিভ্রান্ত শিশু’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। দ্য হিন্দুর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই বার্তার মাধ্যমে তরুণদের পাশাপাশি তাদের অভিভাবকদের উদ্দেশেও একটি সাংস্কৃতিক ও পারিবারিক মূল্যবোধের বার্তা দেওয়া হয়েছে।

আন্দোলনের ক্ষোভ শুধু পরীক্ষা নিয়ে নয়

এএফপির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রশ্নপত্র ফাঁস ও পরীক্ষায় অনিয়ম ছিল আন্দোলনের সূচনা, কিন্তু তরুণদের ক্ষোভ দ্রুত আরও গভীর সমস্যার দিকে ছড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘ সময় পড়াশোনা করার পরও অনিশ্চিত কর্মসংস্থান, সীমিত অর্থনৈতিক সুযোগ এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থার সংকটও তরুণদের মধ্যে বড় হতাশা তৈরি করেছে।

ফলে শুধু পরীক্ষায় অনিয়ম বন্ধ করা বা প্রশ্নপত্র ফাঁসের শাস্তি বাড়ালেই আন্দোলনের পেছনে থাকা সব ক্ষোভ দূর হবে না বলে মনে করছে এএফপি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই কারণেই আন্দোলনের রাজনৈতিক প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে বলেছেন, সংগঠনটি আপাতত রাজনৈতিক দল হিসেবে নয়, একটি ‘চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী’ হিসেবে কাজ করবে। একইসঙ্গে তরুণদের সমস্যাগুলো শুনতে দেশজুড়ে একটি ‘লিসেনিং ট্যুর’ আয়োজনের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে সংগঠনটি।

CJP Press Conference LIVE https://t.co/kEBSI8ZNmI

ইনস্টাগ্রামে প্রতিবাদী পোস্ট সরানোর অভিযোগ

এদিকে আন্দোলন দমাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের নজরদারি ও কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

দ্য হিন্দুর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক নেতা ও দল, সিজেপির সদস্য এবং সাধারণ বিক্ষোভকারীদের অনেক ইনস্টাগ্রাম পোস্ট দ্রুত সরিয়ে দেওয়া বা ভারতে ব্লক করা হচ্ছে। ভারতীয় যুব কংগ্রেস, আম আদমি পার্টির নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল, সিজেপির মুখপাত্র সৌরভ দাস এবং সংবাদমাধ্যম স্ক্রল.ইনের পোস্টও এর মধ্যে রয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, মেটার সঙ্গে ভারত সরকারের বৈঠকের পর প্রতিবাদসংক্রান্ত কনটেন্টের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ আরও বেড়েছে।

তবে সিজেপির মুখপাত্র সৌরভ দাস এই পদক্ষেপকে ‘অসাংবিধানিক ও বেআইনি’ বলে অভিযোগ করেছেন। তার ভাষ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমের কাজ বেআইনি কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ করা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রণ করা নয়।

এ বিষয়ে দ্য হিন্দুর মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি মেটা।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৭৯(৩)(বি) ধারার আওতায় সরকারের অনুরোধে কনটেন্ট সরানোর একটি ব্যবস্থা সক্রিয় রয়েছে। সফটওয়্যার ফ্রিডম ল সেন্টার, ইন্ডিয়া (এসএফএলসি) এটিকে এমন একটি ‘সমান্তরাল ব্যবস্থা’ হিসেবে বর্ণনা করেছে, যেখানে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৬৯এ ধারায় থাকা কিছু সুরক্ষা বা প্রক্রিয়াগত নিশ্চয়তা নেই।

এএফপির বিশ্লেষণেও আন্দোলনের সময় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-চালিত ক্যামেরার মাধ্যমে বিক্ষোভকারীদের শনাক্ত ও নজরদারির কথা উঠে এসেছে। পাশাপাশি দিল্লির প্রধান বিক্ষোভস্থলের আশপাশে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়ার ফলে আন্দোলনকারীদের যোগাযোগে সমস্যা তৈরি হয়েছিল। অ্যাকসেস নাউয়ের তথ্য উদ্ধৃত করে এএফপি বলেছে, গত বছর বিশ্বে ইন্টারনেট বন্ধের সংখ্যায় ভারত দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল।

ঝাড়খণ্ডে এখনো চলছে ছাত্র আন্দোলন

দিল্লির আন্দোলনের তীব্রতা কমে এলেও দেশটির অন্যত্র ক্ষোভ পুরোপুরি থামেনি। ঝাড়খণ্ডে সরকারি চাকরির প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন আজ শনিবার ১৫তম দিনে গড়িয়েছে বলে দ্য হিন্দুর প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

শুক্রবার রাঁচিতে প্রথমবারের মতো রাজ্য সরকারের মন্ত্রীদের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বৈঠক হয়। 

প্রায় দুই ঘণ্টার ওই বৈঠকে শিক্ষার্থীরা সরকারি চাকরির পরীক্ষায় কথিত অনিয়মের তদন্তে কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরোর (সিবিআই) তদন্তের দাবি জানায়। তবে আলোচনায় কোনো সমঝোতা হয়নি।

বৈঠকের পর ছাত্রনেতা রবীন্দ্র পাসওয়ান বলেন, সরকার তাদের দাবিগুলো শুনেছে, কিন্তু মূল দাবিগুলো নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি। তাই আপাতত আন্দোলন চলবে।

মোদির সামনে বড় পরীক্ষা

এএফপির মতে, আন্দোলনের ফলে ভারতের রাজনৈতিক দলগুলোকে তরুণ ভোটারদের চাহিদা ও ক্ষোভকে আরও গুরুত্ব দিতে হতে পারে। তবে আন্দোলনের শক্তিকে সরাসরি ভোটে রূপান্তর করা সহজ হবে না।

পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনের আগে এখনো প্রায় তিন বছর সময় রয়েছে। এই সময়ের মধ্যে মোদির নেতৃত্বাধীন দল এবং বিরোধীরা, উভয় পক্ষই তরুণদের মধ্যে তৈরি হওয়া ক্ষোভ ও হতাশাকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে কাজে লাগানোর চেষ্টা করতে পারে বলে এএফপির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে।

তবে দিল্লির আন্দোলন আপাতত স্তিমিত হলেও পরীক্ষা, কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক সুযোগ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থার মতো একাধিক প্রশ্ন এখনো ভারতের তরুণদের মধ্যে অমীমাংসিত রয়ে গেছে। ফলে সাম্প্রতিক আন্দোলন শেষ হলেও এর রাজনৈতিক অভিঘাত কতটা দীর্ঘস্থায়ী হয়, সেটিই এখন মোদি সরকারের জন্য বড় প্রশ্ন।

Related Articles

Latest Posts