প্রায় ২ হাজার ৮০০ বছর আগে লেখা হোমারের মহাকাব্য ‘দ্য ওডিসিকে’ অনেকে শুধু একজন বীর যোদ্ধার ঘরে ফেরার গল্প মনে করেন। কিন্তু সাহিত্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটা আসলে শুধু বীরত্বের গল্প নয়।
এতে আছে নারী, ক্ষমতা, লোভ আর বুদ্ধির জটিল এক মিশেল। ঠিক এই কারণেই এত বছর পরও গল্পটি এখনো মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়।
সম্প্রতি পরিচালক ক্রিস্টোফার নোলান ‘দ্য ওডিসি’ নিয়ে সিনেমা বানিয়েছেন, আর এতেই প্রাচীন গ্রিক এই সাহিত্যকর্ম নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ম্যাট ডেমন অভিনীত এই সিনেমা মুক্তির আগেই সারা বিশ্বে মানুষের আগ্রহ তৈরি করেছিল। ছবিটি ১৭ জুলাই যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে মুক্তি পায়।
দেবী অ্যাথেনার চালাকি, জাদুকরী সার্সি ও সাইরেনদের রহস্যময় আকর্ষণ আর ইথাকায় স্ত্রী পেনেলোপির চতুরতা নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সংবাদমাধ্যম বিবিসি।
এই মহাকাব্যের প্রধান চরিত্র ওডিসিউস ট্রয় যুদ্ধ থেকে ফেরা এক গ্রিক বীর। যুদ্ধ শেষে নিজের রাজ্য ইথাকায় ফিরতে তাকে টানা দশ বছর সমুদ্রে বিপজ্জনক যাত্রা করতে হয়। এই দীর্ঘ পথে তিনি নানা দৈত্য, দেবতা, জাদুকরী আর অপ্সরার মুখোমুখি হন।
তবে গবেষকরা বলেন, গল্পের নায়ক পুরুষ হলেও গল্পের মোড় ঘুরে যাওয়ার পেছনে বেশিরভাগ সময় নারীদেরই ভূমিকা বেশি। ওডিসিউসের ভাগ্য কী হবে, তা অনেকটাই তার স্ত্রী, দেবী, অপ্সরা কিংবা জাদুকরীরা তাদের সিদ্ধান্ত আর বুদ্ধির মাধ্যমে ঠিক করে দেন।
গল্পের শুরুতেই দেখা যায়, ওডিসিউস সাত বছর ধরে অপ্সরা ক্যালিপসোর দ্বীপ ওগিজিয়ায় থাকছেন। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় তিনি বন্দি। কিন্তু কিছু গবেষক মনে করেন, আসল কারণ অন্য—ট্রয় যুদ্ধের ভয়ংকর অভিজ্ঞতা তার মনে এমন গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল যে তিনি নিজেই এগোতে পারছিলেন না।
তবে ক্যালিপসোর সৌন্দর্যও কম আকর্ষণীয় ছিল না। খোদ ওডিসিউসই স্বীকার করেন, সৌন্দর্যের দিক থেকে তার স্ত্রী পেনেলোপিও ক্যালিপসোর সমান নন।
ওডিসিউস দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকায় তার স্ত্রী পেনেলোপিকে বিয়ে করতে ১০৮ জন পাত্র জড়ো হয়। তারা সবাই পেনেলোপিকে বিয়ে করে ইথাকার রাজা হতে চান।
কিন্তু পেনেলোপি বুদ্ধি খাটিয়ে পরিস্থিতি সামলান। তিনি বলেন, শ্বশুর লায়ার্তেসের জন্য একটা কাফনের কাপড় বুনছেন, সেটা শেষ হলেই তিনি বিয়ে ঠিক করবেন। কিন্তু প্রতিদিন দিনের বেলা বুনে রাতের বেলা তিনি গোপনে সেটা খুলে ফেলতেন। এভাবে কাজটা আর কখনো শেষ হয় না, বিয়ের সিদ্ধান্তও পিছিয়ে যেতে থাকে।
এই বুদ্ধির কারণেই ওডিসিউস ফিরে এসে আবার নিজের সিংহাসন ফিরে পাওয়ার সুযোগ পান।
ওডিসিউসের সবচেয়ে বড় সাহায্যকারী ছিলেন যুদ্ধ ও জ্ঞানের দেবী অ্যাথেনা।
ট্রয় যুদ্ধ থেকে শুরু করে ইথাকায় ফেরা পর্যন্ত অনেকবার তিনি ওডিসিউসকে সাহায্য করেন। কখনো সাধারণ মানুষের ছদ্মবেশে, কখনো দূত সেজে তিনি এমনভাবে পরিস্থিতি সাজান, যাতে ওডিসিউস নিরাপদ আশ্রয় পান, দরকারি সাহায্য পান আর শেষ পর্যন্ত নিজের দেশে ফিরতে পারেন।
গবেষকরা বলেন, অ্যাথেনা বুঝতেন—ক্ষমতা পুরুষদের হাতে থাকলেও, ঘটনার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার আসল শক্তি অনেক সময় নারীদের বুদ্ধি আর কৌশলের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে।
ওডিসিউসের যাত্রায় সাইরেন আর জাদুকরী সার্সি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
সাইরেনদের মিষ্টি গান শুনলে নাবিকরা এমনভাবে মুগ্ধ হয়ে যেত যে, তারা মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যেত। ওডিসিউসেরও সেই গান শোনার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু সঙ্গীদের জীবন বাঁচাতে তিনি নিজেকে জাহাজের মাস্তুলের সঙ্গে বেঁধে রাখেন। মৌচাকের মোম নরম করেও নাবিকদের কানে শক্ত করে গুঁজে দেন, যাতে তারা গানটি একেবারেই শুনতে না পায় এবং নিরাপদে জাহাজ চালিয়ে নিয়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে জাদুকরী সার্সি জাদু দিয়ে ওডিসিউসের সঙ্গীদের শূকরে পরিণত করে দেন। কিন্তু পরে তিনিই ওডিসিউসকে পাতাললোকে যাওয়ার পথ দেখান। সেখানে গিয়ে ভবিষ্যৎদ্রষ্টা টিরেসিয়াসের কাছ থেকে ওডিসিউস ঘরে ফেরার জরুরি দিকনির্দেশনা পান।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, ওডিসিউসের পথে আসা দৈত্য, জাদুকরী কিংবা অপ্সরাদের শুধু বাস্তব চরিত্র হিসেবে দেখলে গল্পের আসল গভীরতা বোঝা যায় না। অনেকে মনে করেন, এগুলো আসলে মানুষের মনের ভেতরের ভয়, লোভ, কামনা আর দুর্বলতার প্রতীক।
ওডিসিউসকে বারবার নিজের ধৈর্য, সংযম আর বুদ্ধির পরীক্ষা দিতে হয়। কখনো তিনি লোভের কাছে হার মানেন, আবার ঠিক সময়ে নিজেকে সামলেও নেন।
হোমারের ওডিসিউস কোনো নিখুঁত নায়ক নন। তিনি বুদ্ধিমান আর কৌশলী ঠিকই, কিন্তু একইসঙ্গে প্রতারণাও করেন, দুর্বলও হন, আর নিজেকে লুকিয়ে রাখতেও ওস্তাদ। প্রয়োজন হলে তিনি নিজের পরিচয় আর গল্পও বদলে ফেলেন।
গবেষকদের মতে, ঠিক এই মানবিক দিকগুলোই তাকে প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যের সবচেয়ে জীবন্ত আর বাস্তব চরিত্রগুলোর একটা করে তুলেছে।
ব্রিটিশ ক্লাসিসিস্ট ও লেখক ডেইজি ডান মনে করেন, ‘ওডিসি’ মূলত এমন একজন মানুষের গল্প, যাকে বারবার লোভ, ক্ষমতা, ভয় আর আকাঙ্ক্ষার মুখোমুখি হতে হয়। আর এ কারণেই প্রায় তিন হাজার বছর পরও এই মহাকাব্য এখনকার পাঠক-দর্শকের কাছে সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

