মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ব্যবস্থায় পরিবর্তন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বড় ধরনের স্বস্তি এনে দিয়েছে। এখন থেকে চাইলে প্রতি মাসে নয়, প্রতি তিন মাস পরপর ভ্যাট রিটার্ন জমা দেওয়া ও ভ্যাট পরিশোধ করা যাবে।
নতুন এই ব্যবস্থাকে ঘিরে ভিন্নমত দেখা দিয়েছে। ব্যবসায়ীরা একে স্বাগত জানিয়েছেন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তাদের মতে, এতে ভ্যাট আইন মেনে চলা সহজ হবে এবং রিটার্ন ও পরিশোধের মধ্যে অসামঞ্জস্য কমবে।
তবে কর বিশেষজ্ঞ ও এনবিআরের সাবেক কর্মকর্তারা বলছেন, এমন সময়ে এই পরিবর্তন আনা হলো, যখন সরকার রাজস্ব আদায় নিয়ে আগে থেকেই চাপে রয়েছে। ফলে সরকারের নগদ অর্থপ্রবাহে সাময়িক চাপ তৈরি হতে পারে।
অতীতে অধিকাংশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে প্রতি মাসে ভ্যাট রিটার্ন জমা দিতে হতো।
কিন্তু অর্থ আইন, ২০২৬ অনুযায়ী এখন থেকে তিনটি কর মেয়াদ শেষে, অর্থাৎ প্রতি তিন মাস পরপর একবার রিটার্ন জমা দেওয়া যাবে। তৃতীয় কর মেয়াদ শেষ হওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করতে হবে। নির্ধারিত দিন সরকারি ছুটি হলে পরবর্তী কর্মদিবসে রিটার্ন জমা দেওয়া যাবে।
তবে মাসিক ব্যবস্থা বাতিল করা হয়নি। কোনো প্রতিষ্ঠান চাইলে আগের মতো প্রতি মাসেও ভ্যাট রিটার্ন জমা দিতে ও ভ্যাট পরিশোধ করতে পারবে।
অর্থাৎ, সরকার মাসিক ব্যবস্থার পরিবর্তে ত্রৈমাসিক ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করেনি; বরং এটি বিকল্প হিসেবে চালু করেছে।
ব্যবসায়ীদের স্বস্তি
ব্যবসায়ীরা এই সিদ্ধান্তকে দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ বলে মন্তব্য করেছেন।
নেসলে বাংলাদেশের সাবেক কর ও করপোরেট অ্যাফেয়ার্স পরিচালক দেবব্রত রায় চৌধুরী বলেন, ত্রৈমাসিক রিটার্ন চালু হলে প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক ঝামেলা কমবে। কার্যকর মূলধন ব্যবস্থাপনা সহজ হবে এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে ব্যবসাগুলো আর্থিকভাবে আরও নমনীয়ভাবে চলতে পারবে।
তিনি স্বীকার করেন, এতে সরকারের স্বল্পমেয়াদি নগদ প্রবাহে কিছু চাপ তৈরি হতে পারে। তবে তার মতে, ব্যবসার সুবিধাই এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, তিন মাস সময় পাওয়ায় কিছু প্রতিষ্ঠান ভ্যাটের টাকা অন্য কাজে ব্যবহার করতে পারে। তবে দেবব্রত রায় চৌধুরীর মতে, খেলাপির ঝুঁকি শুধু এই ব্যবস্থায় নয়, যেকোনো ব্যবস্থাতেই থাকে।
তার ভাষায়, মূল গুরুত্ব হওয়া উচিত আইন মেনে চলা নিশ্চিত করার ওপর।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাকও মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদে সরকারের তারল্য সংকট হওয়ার আশঙ্কা কম। তবে শুরুতে কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
তিনি বলেন, সরকার কোথাও বলেনি যে সবাইকে তিন মাস অপেক্ষা করেই ভ্যাট দিতে হবে। শুধু ব্যবসায়ীদের আরও বেশি নমনীয়তা দেওয়া হয়েছে। যারা নিয়মিত মাসে মাসে ভ্যাট দেয়, তারা চাইলে আগের মতোই তা চালিয়ে যেতে পারবে।
রাজস্ব নিয়ে উদ্বেগ
তবে রাজস্ব বিশেষজ্ঞরা এতটা আশাবাদী নন।
এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেসের পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, গত প্রায় ৩৫ বছর ধরে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রতি মাসে ভ্যাট পরিশোধ করে আসছে।
তার ভাষায়, প্রতিষ্ঠানগুলো যদি তিন মাস পর্যন্ত ভ্যাটের টাকা নিজেদের কাছে রাখতে পারে, তাহলে কেউ কেউ নির্ধারিত সময়ের আগে সেই অর্থ অন্য কাজে ব্যবহার করতে পারে।
এতে আর্থিক সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানের খেলাপি হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব প্রবাহও ধীর হয়ে যেতে পারে।
এনবিআরের এক সাবেক সদস্যও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, সরকার যখন রাজস্ব বাড়াতে হিমশিম খাচ্ছে ও ব্যয় বাড়ছে, তখন রাজস্ব আদায় আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন ছিল। বিলম্বিত করার নয়।
তার মতে, কঠোর নজরদারি না থাকলে এই পরিবর্তন রাজস্ব সংগ্রহকে দুর্বল করতে পারে।
ভ্যাট সরকারের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য রাজস্ব উৎসগুলোর একটি। এই অর্থ দিয়েই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, পেনশন, ঋণের সুদ ও বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় মেটানো হয়।
এ কারণে সারা বছর নিয়মিত ভ্যাট আদায় সরকারের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে এনবিআর রাজস্ব আদায়ে চাপের মধ্যে রয়েছে। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আদায় বারবার কম হচ্ছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে এনবিআর প্রায় ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছে। এটি তাদের নিজস্ব লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ১ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকা কম। আর সরকারের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা কম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি বড় অংশের ভ্যাট তিন মাস পর আসে, তাহলে সাময়িকভাবে সরকারের কোষাগারে অর্থের সংকট দেখা দিতে পারে। যদিও বছরের শেষে মোট রাজস্ব একই থাকতে পারে।
এ পরিস্থিতির প্রভাব নির্ভর করবে সরকারের নগদ মজুত, ঋণ নেওয়ার সক্ষমতা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো সময়মতো ভ্যাট পরিশোধ করছে কি না—এসব বিষয়ের ওপর।
এনবিআরের সাবেক ওই সদস্যের মতে, ভ্যাট আদায়ে বড় ধরনের ওঠানামা হলে সরকারকে স্বল্পমেয়াদি ব্যাংকঋণের ওপর আরও বেশি নির্ভর করতে হতে পারে।
এদিকে এম এ রাজ্জাকের প্রশ্ন, এই পরিবর্তন আদৌ কতটা প্রয়োজন ছিল। তার মতে, সাধারণভাবে এক মাসের মধ্যেই একটি প্রতিষ্ঠানের ভ্যাটের হিসাব নির্ধারণ করা সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, পরিশোধের সময়সীমা বাড়লে কেউ কেউ ভ্যাটের অর্থ আটকে রাখতে, প্রকৃত দায় কম দেখাতে বা পরে পুরো অর্থ পরিশোধ না করার চেষ্টা করতে পারে। এতে রাজস্ব ফাঁকির ঝুঁকি বাড়বে।
তবে তার মতে, শেষ পর্যন্ত সরকার যদি একই পরিমাণ রাজস্ব পায় ও সামগ্রিক রাজস্ব প্রবাহ স্বাভাবিক থাকে, তাহলে শুরুতে কিছুটা সমন্বয়হীনতা দেখা দিলেও পরে পরিস্থিতি স্থিতিশীল হতে পারে।
তার ভাষায়, রাজস্ব ফাঁকির আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে এখনই এর প্রকৃত প্রভাব কতটা হবে, তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।

