স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক মৃত্যু হয়েছে এবং দলটির ‘রাজনৈতিক দাফন’ দিল্লিতে সম্পন্ন হয়েছে।
একইসঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা নিয়ে কেউ কেউ রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চাইছে, যার পরিণতি ভবিষ্যতে জাতি দেখবে।
আজ শনিবার রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘জুলাই ২৪ শহীদ পরিবার সোসাইটি’ এবং ‘আমরা জুলাই যোদ্ধা’ কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘জুলাই জাতীয় সম্মেলন-২০২৬’ আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আজকে যারা এই অনুষ্ঠানের আয়োজক, তাদের প্রতি আমার অনুরোধ রইল—এই জুলাইয়ের চেতনা নিয়ে যেন আমরা কেউ ব্যবসা না করি।’
তিনি বলেন, ‘যারা জুলাইয়ের চেতনা নিয়ে বিভিন্নভাবে রাজনৈতিক সংগঠন করে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার জন্য চেতনা বিক্রি করছে, তাদের পরিণতি কিন্তু ভবিষ্যতে দেখা যাবে। ইতিহাস কিন্তু তাই।’
ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘যারা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিক্রি করত, তারা চেতনা বিক্রি করতে করতে আজকে দিল্লিতে বসে আছে। বাংলাদেশের মানুষ তাদের উৎখাত করেছে। সুতরাং চেতনা বিক্রির ব্যবসা ভালো নয়, রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার উদ্দেশ্যেও ভালো নয়।’
তিনি বলেন, ‘আমরা মহান চব্বিশের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসকে ধারণ করব, স্মৃতিকে ধারণ করব। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন দেখে, স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের পতন কীভাবে হয়েছিল এবং ভবিষ্যতে কোনো সরকার যেন এমন ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরাচারী আচরণ না করে।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘কিছু পর্দার আড়ালের কথা আজকে অবমুক্ত করতে চাই। আমি ও আমার নেতা তারেক রহমান দুজনেই নির্বাসিত ছিলাম। আল্লাহর কী মহিমা, আমরা যদি নির্বাসিত না থাকতাম, হয়তো জুলাইয়ের মতো একটি উত্থান সফলভাবে সমাপ্ত করা সম্ভব হতো না। এটাই হচ্ছে পর্দার অন্তরালের কথা।’
তিনি বলেন, ‘কোনোদিন আমরা ঘুমাইনি। ২৪ ঘণ্টা সমন্বয় করে আমাদের নেতাকর্মীদের বিভিন্নভাবে সংগঠিত করে জুলাই যোদ্ধাদের সম্মুখে রেখে অরাজনৈতিক পরিচয়ে এই আন্দোলনকে একটি পর্যায় পর্যন্ত নিয়ে এসেছি। ৩ ও ৪ জুলাই আমরা নৈতিক সমর্থন দিই। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আন্দোলনেও সমর্থন দেওয়া হয়।’
সালাহউদ্দিন বলেন, ‘১৬ জুলাই আমার নেতা তারেক রহমান বলেছেন—দফা এক, দাবি এক, স্বৈরাচারের পদত্যাগ। অন্য কোনোভাবে সমস্যার সমাধান হবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আজকে যারা জুলাই যোদ্ধাদের নেতৃত্ব দাবি করেন, তাদের অনেকেই তখন বলেছিলেন, আমাদের কোনো রাজনৈতিক দাবি নেই, আমাদের দাবি কেবল কোটা বৈষম্য দূর করা। কিন্তু আমরা জানতাম, স্বৈরাচারকে রেখে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। তাদের আমরা বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলাম, কিন্তু তখন তাদের সেই সাহস ছিল না।’
তিনি দাবি করেন, ‘অরাজনৈতিকভাবে সমগ্র বাংলাদেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে, শত শত শহীদের রক্তের মধ্য দিয়ে আমরা এই জায়গায় এসেছি। ৫ আগস্টের বিজয়ের কৃতিত্ব রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে ভাগ করলে সবচেয়ে বড় অংশটি থাকবে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, যুবদল ও বিএনপির অঙ্গসংগঠনগুলোর।’
সালাহউদ্দিন বলেন, ‘জাতিসংঘের প্রতিবেদনে ১ হাজার ৪০০ শহীদের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন পত্রিকা ও জরিপে ৭০০ থেকে ৮০০ জনের হিসাব পাওয়া যায়। বাকিরা কোথায় গেল? কারণ হাসপাতালগুলো শহীদদের তথ্য সংরক্ষণ করতে পারেনি, অনেক নথি গায়েব করে দেওয়া হয়েছে। অনেককে বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে দাফন করা হয়েছে। আজও স্বজনরা তাদের কবরের সন্ধান চাইলেও আমরা দিতে পারি না।’
তিনি বলেন, ‘এত বড় গণহত্যার পরও শেখ হাসিনার কোনো অনুশোচনা নেই। তারা জুলাই যোদ্ধাদের অপরাধী হিসেবে আখ্যা দিচ্ছে, গণঅভ্যুত্থানকে জঙ্গি কর্মকাণ্ড বলছে। এর চেয়ে লজ্জাজনক আর কিছু হতে পারে না।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আওয়ামী লীগের মধ্যে অনুশোচনা নেই, দোষ স্বীকারের মানসিকতাও নেই। উল্টো বিদেশে বসে তারা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।’
তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পতন হয়েছে, রাজনৈতিকভাবে নিপাত হয়েছে, নির্মূল হয়েছে। দাফন হয়ে গেছে দিল্লিতে। সেই আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে আর কোনোদিন রাজনীতি করতে পারবে না।’
রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচারের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার দাবি করেছি আমরা, আপনারাও দাবি করেছেন। তদন্ত পরিচালিত হচ্ছে। ইনশাআল্লাহ খুব শিগগির রাজনৈতিক দল হিসেবে সেই দলকে বিচারের কাঠগড়ায় নেওয়া হবে।’
তিনি বলেন, ‘সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইন সংশোধন করা হয়েছে। সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের বিচার করার সুযোগ রয়েছে। সুতরাং অপেক্ষা করুন।’
শহীদ ওয়াসীম আকরামের প্রসঙ্গ টেনে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘শহীদ হওয়ার মাত্র দুই দিন আগে আমাকে শিলংয়ে দেখতে গিয়েছিল ছেলেটা। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, এত টাকা খরচ করে পাসপোর্ট-ভিসা করে কেন এলে? সে বলেছিল, আপনাকে সামনে থেকে একবার দেখব—এটাই ছিল আমার বড় আশা। ছবি তুলে ফেসবুকের প্রোফাইলেও দিয়েছিল। দুই-তিন সপ্তাহ পরে দেশে ফিরে বাংলাদেশের জন্য জীবন দিয়ে দিল।’
তিনি বলেন, ‘এই ইতিহাস বড় করে তুলে ধরুন। তার বাবা তখন বিদেশে ছিলেন। তার মায়ের সঙ্গে কথা বলে চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি। তিনি আজও একটাই কথা বলেন—আগে শহীদদের হত্যার বিচার করুন। আমরা দেখতে চাই, এ দেশের প্রতিটি হত্যার বিচার হয়েছে।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘পাঁচটি গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় হয়েছে। বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে ২৭টি মামলা এবং তদন্তের শেষ পর্যায়ে রয়েছে ৭২টি মামলা।’
তিনি বলেন, ‘শহীদ আবু সাঈদের মামলায় দুজনের ফাঁসির আদেশ হয়েছে। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ সংশ্লিষ্টদের বিভিন্ন মেয়াদের সাজা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রথম গণহত্যা মামলায় শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের ফাঁসির আদেশ হয়েছে। তৎকালীন আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী হওয়ায় তার সাজা কম হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানোর মামলায় দুজনের ফাঁসি হয়েছে। সেখানে সাবেক এক সংসদ সদস্য, একজন ওসি, একজন ডিআইজিসহ অন্যদের যাবজ্জীবনসহ বিভিন্ন মেয়াদের সাজা হয়েছে।’
চাঁনখারপুল হত্যা মামলায় তৎকালীন পুলিশ কমিশনার হাবিব ও যুগ্ম কমিশনার সুদীপ্তর ফাঁসির আদেশ হয়েছে বলেও জানান তিনি। এছাড়া রামপুরা টিভি সেন্টার এলাকায় গুলিবিদ্ধ এক তরুণ ও কয়েকজন শিশুকে হত্যার মামলাতেও পুলিশ কমিশনার হাবিব, সংশ্লিষ্ট ওসি ও অন্যদের বিভিন্ন মেয়াদের সাজা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন।
সর্বশেষ হাসানুল হক ইনুর মামলার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘তাকে ১০ বছরের সাজা দেওয়ায় বাদীপক্ষ সন্তুষ্ট নয়। শুনেছি, তারা আপিল করবে। আশা করি, অন্যান্য মামলায়ও তিনি সর্বোচ্চ সাজা পাবেন।’
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় সংসদের প্রধান হুইপ নুরুল ইসলাম মনি। বক্তব্য দেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আজম খান, প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতীকুর রহমান রুমন, ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি আবু হুরায়রা, কওমি ছাত্র ফোরামের সভাপতি মাওলানা জামিল সিদ্দিকী, ‘আমরা জুলাই যোদ্ধা’র সভাপতি আমিনুল ইসলাম ইমন ও সাধারণ সম্পাদক আল মিরাজ, এবং ‘জুলাই ২৪ শহিদ পরিবার সোসাইটি’র সভাপতি গোলাম রহমান ও সাধারণ সম্পাদক রবিউল আওয়াল।
এ সময় জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদের ভাই আবু হোসেইন, শহীদ শাহরিয়ার হোসেন আলভীর বাবা আবুল হোসেন, শহীদ আবদুল্লাহ বিন জাহিদের মা ফাতেমাতুজ্জোহরা, শহীদ ওয়াসীম আকরামের বাবা শফিউল আলম এবং যাত্রাবাড়ীর শহীদ মিরাজ হোসেনের বাবা আবদুর রব মিয়া স্মৃতিচারণ করেন। এছাড়া আহত শাহিন মালু, সুজন মোল্লা, মিল্লাত হোসেন, আল-আমীন ও মেহেদি হাসান মিরাজ নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।

