দেশের হাঁস-মুরগি পালন খাতকে আরও নিরাপদ ও রপ্তানিমুখী করতে প্রায় দুই দশক পর একটি নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করেছে সরকার। পরিবেশবান্ধব উপায়ে ফার্মের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদনব্যবস্থাকে আধুনিক করতে এই উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় গত ১৪ জুন ‘জাতীয় পোলট্রি উন্নয়ন নীতিমালা ২০২৬’ অনুমোদন দিয়েছে। এটি ২০০৮ সাল থেকে চালু থাকা পুরোনো নীতিমালার স্থলাভিষিক্ত হলো।
বর্তমানে দেশের পোলট্রি খাতের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৬০ লাখ মানুষের জীবিকা নির্ভর করছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে নিবন্ধিত পোলট্রি খামারের সংখ্যা ৯০ হাজার। এর পাশাপাশি আরও প্রায় দুই লাখ অনিবন্ধিত খামার রয়েছে।
ডিম ও মাংসের উৎপাদন বাড়ানো, মুরগির খাবারে (ফিড) স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, খাবারে ক্ষতিকর উপাদানের ব্যবহার বন্ধ করা, মুরগির জাত উন্নয়ন, দেশীয় জাত সংরক্ষণ, প্রাণিস্বাস্থ্য উন্নয়ন করা এবং অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার কমানোই এই নতুন নীতিমালার লক্ষ্য।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নতুন এই নীতিমালা সময়োপযোগী। এতে পোলট্রি খাতের বড় চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলার কথা বলা হয়েছে।
কোথায় হবে খামার
নতুন নীতিমালায় খামার স্থাপন ও বায়ো সিকিউরিটি নিয়ে বেশ কিছু নিয়মের কথা বলা হয়েছে। খামার করতে হবে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার বাইরে অপেক্ষাকৃত বিচ্ছিন্ন বা ফাঁকা জায়গায়। এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বসতবাড়ি বা জনবসতি থাকলে অন্তত ৩০০ মিটার দূরে খামার করতে হবে। আর একটি খামার থেকে আরেকটি খামারের দূরত্ব হতে হবে কমপক্ষে ২০০ মিটার। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) মতে, এমন দূরত্ব বা ‘বাফার জোন’ খামারের ধুলাবালি ও দুর্গন্ধ কমানোর পাশাপাশি রোগব্যাধি নিয়ন্ত্রণেও কার্যকর।
নীতিমালায় বলা হয়েছে, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের নিবন্ধন ছাড়া কোনো বাণিজ্যিক পোলট্রি খামার পরিচালনা করা যাবে না।
দেশীয় জাতের মুরগি পালন উৎসাহিত করতে এবং ভোক্তাদের চাহিদা মেটাতে ‘অর্গানিক’ খামারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। মুরগির জন্য মানসম্মত ওষুধ ও টিকার সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে নীতিমালায়। নতুন বা সংক্রামক রোগ থেকে পোলট্রি খাতকে বাঁচাতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে দেশে টিকা আবিষ্কার ও উৎপাদনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ফার্মের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
নীতিমালা অনুযায়ী, বাণিজ্যিক খামারগুলোয় বায়ো গ্যাস প্ল্যান্ট এবং তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা থাকতে হবে।
বাণিজ্যিক পোলট্রি খামারের জন্য বায়ো গ্যাস প্ল্যান্ট বিদ্যুতের দারুণ এক বিকল্প উৎস হতে পারে। মুরগির বিষ্ঠা প্রক্রিয়াজাত করে বায়ো গ্যাস ও তা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। এতে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমতে পারে। বায়োগ্যাস প্লান্টের তরল বর্জ্য জৈব সার হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের আহ্বায়ক এবং ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের সভাপতি মশিউর রহমান বলেন, ২০০৮ সালের পর এই খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে এবং এর আকার আগের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে।
তিনি বলেন, ‘দেশের জমির পরিমাণ একই থাকলেও জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে ডিম ও মুরগির মাংসের চাহিদা অনেক বেড়েছে। খামারের সংখ্যা ও ঘনত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জোরদার জৈব নিরাপত্তার বিষয়টিও এখন অনেক বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে।’
এই নীতিমালাকে বর্তমান সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন মশিউর রহমান। তবে তার মতে, এর সফলতা নির্ভর করছে সঠিক বাস্তবায়নের ওপর।
বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মো. শফির রহমান বলেন, নতুন এই নীতিমালায় অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বা এর ক্ষতিকর প্রভাব ঠেকাতে কঠোর নিয়ম আনা হয়েছে, যা ২০০৮ সালের নীতিমালায় ছিল না। প্রথমবারের মতো এখানে অর্গানিক পোলট্রি উৎপাদনকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। মুরগির ওজন বাড়াতে রাসায়নিক গ্রোথ প্রমোটার, জিনগত পরিবর্তন করা উপাদান বা অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, ‘এই নীতিমালায় নিরাপদ মুরগির খাবারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে এবং ট্যানারির বর্জ্য ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, শুধু দেশে মুরগির বাচ্চার সংকট থাকলেই ‘গ্র্যান্ড প্যারেন্ট স্টক’ এবং এক দিন বয়সী বাচ্চা আমদানি করা যাবে। ‘প্যারেন্ট স্টক’ আমদানির অনুমতি দেওয়া হলেও এটি অনিয়ন্ত্রিতভাবে আমদানির সুযোগ নেই।

