ইরান যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম বেড়ে যাওয়ায় সরকারকে খোলা বাজার (স্পট মার্কেট) থেকে অনেক বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হয়েছে। এর ফলে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গ্যাস খাতের ভর্তুকি তিন গুণেরও বেশি বেড়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ, সার ও খাদ্য খাতেও ভর্তুকির চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
সংশোধিত বাজেটে গ্যাস খাতের ভর্তুকি ৬ হাজার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে জানা গেছে, মে মাস পর্যন্ত জ্বালানি মন্ত্রণালয়কে ১৩ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্চ থেকে জুনের মধ্যে স্পট মার্কেট থেকে ৩৮টি এলএনজি কার্গো কেনা হবে। যুদ্ধের আগে প্রতি এমএমবিটিইউ (১ মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট) এলএনজির দাম ছিল ৯ থেকে ১১ ডলারের মধ্যে। বর্তমানে সেই দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গড়ে ২০ ডলারে পৌঁছেছে।
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য এলএনজি ভর্তুকি ধরা হয়েছে ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ধারণা, যুদ্ধ দ্রুত শেষ হলে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম কমে আসতে পারে।
চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ভর্তুকি, প্রণোদনা ও ঋণের জন্য মোট বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ২৮ হাজার ৯৫৬ কোটি টাকা, যা মূল বাজেটে ছিল ১ লাখ ২৫ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে এই বরাদ্দ কিছুটা কমিয়ে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫৬৩ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানকে সরকার ঋণ হিসেবেই অর্থ বরাদ্দ দেয়। কিন্তু পরবর্তীতে অনেক প্রতিষ্ঠান সেই ঋণ পরিশোধ করে না বলে বাজেটে সেই অর্থকে ভতুর্কি হিসেবে দেখানো হয়।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, যুদ্ধের কারণে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়া এবং বিদ্যুৎ খাতের ক্যাপাসিটি চার্জের কারণে বিদ্যুৎ, সার ও খাদ্য খাতে ভর্তুকির চাপ বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
আগামী অর্থবছরে বিদ্যুৎ ও সার খাতে ভর্তুকির জন্য মোট ৬৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৭ হাজার কোটি টাকা শুধু বিদ্যুৎ খাতের জন্য। ২০২০-২১ অর্থবছরে বিদ্যুৎ ও সারে ভর্তুকি মিলিয়ে ব্যয় ছিল প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
এই পরিস্থিতির কারণেই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) গত কয়েক বছর ধরে সরকারকে বিদ্যুৎ ও সারের দাম বাড়ানোর পরামর্শ দিয়ে আসছে। যদিও বিদ্যুতের দাম সময় সময় বাড়ানো হয়েছে, তবে সারের দাম বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা আপাতত সরকারের নেই।
বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ খাতের ক্যাপাসিটি পেমেন্ট নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, বেসরকারি বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোকে ব্যাংকঋণের জন্য গ্রহণযোগ্য করে তুলতে রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টির ‘সোভেরেন গ্যারান্টি’ আওতায় এসব চুক্তি করা হয়েছিল।
তার ভাষায়, চুক্তিগুলো বিনিয়োগকারীদের জন্য অত্যন্ত সুবিধাজনক হলেও সরকারের স্বার্থ রক্ষার ব্যবস্থা ছিল দুর্বল।
মন্ত্রী বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বসেছি। তারা বলেছেন, ক্যাপাসিটি পেমেন্ট বন্ধ করে দিলে ব্যাংকগুলো সঙ্গে সঙ্গে ঋণ ফেরত চাইবে। সেক্ষেত্রে তারা বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রাখতে পারবে না।
তিনি বলেন, হঠাৎ করে এসব পেমেন্ট বন্ধ করে দিলে বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটতে পারে এবং নতুন করে বিদ্যুৎ সংকট দেখা দিতে পারে।
সরকার এ বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত চেয়েছে। অনুকূল মতামত পাওয়া গেলে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
টুকু আরও বলেন, আগের সরকারগুলো রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর রক্ষণাবেক্ষণে অবহেলা করেছে এবং বেসরকারি খাতের বিদ্যুৎ ক্রয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল। এর ফলে প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকার বকেয়া দায় জমেছে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাব থেকে দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষকে কিছুটা স্বস্তি দিতে খাদ্য ভর্তুকিও বাড়ানো হচ্ছে। আগামী অর্থবছরে খাদ্য ভর্তুকির জন্য ৯ হাজার ৭৯৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা চলতি অর্থবছরের মূল বরাদ্দের সমান। তবে চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে ১০ হাজার ২১৫ কোটি টাকা করা হয়েছে।
এদিকে প্রবাসী আয় ও অন্যান্য প্রণোদনার বরাদ্দ প্রায় ১৩ শতাংশ বাড়িয়ে ৭ হাজার ২০০ কোটি টাকা করা হয়েছে। অন্যদিকে রপ্তানি প্রণোদনার বরাদ্দ কিছুটা কমিয়ে ৮ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা চলতি অর্থবছরে ছিল ৯ হাজার ২৫ কোটি টাকা।
বাংলাদেশের ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর রপ্তানি প্রণোদনা প্রত্যাহার করার কথা ছিল। তবে উত্তরণের সময়সীমা আরও তিন বছর পিছিয়ে যাওয়ায় এই সুবিধা আরও কিছুদিন অব্যাহত থাকবে। এছাড়া পাটজাত পণ্যসহ বিভিন্ন খাতে দেওয়া অন্যান্য ভর্তুকি ও প্রণোদনাও আগামী অর্থবছরে বহাল থাকবে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, সারের ভর্তুকি কমাতে হলে কৃষক পর্যায়ে সারের দাম বাড়াতে হবে, যা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত কঠিন সিদ্ধান্ত। তাছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণে ভর্তুকি কমানোর সুযোগও সীমিত হয়ে এসেছে।
বিদ্যুৎ ভর্তুকি সম্পর্কে তিনি বলেন, এটা অনেকটা ঘড়ির কাটার মতো—সময় যত এগোয়, ব্যয়ও তত বাড়তে থাকে। এর মূল কারণ ক্যাপাসিটি চার্জ, যা টিকটিক করতে থাকা টাইম বোমার মতো।
তার মতে, সমস্যার দুটি সম্ভাব্য সমাধান রয়েছে। প্রথমটি হলো খরচ কমানো। কিন্তু তা করতে হলে বিদ্যমান ক্যাপাসিটি চার্জ চুক্তিগুলো পুনর্বিবেচনা করতে হবে। এসব চুক্তি ইতোমধ্যে চূড়ান্ত হওয়ায় বিষয়টি সহজ নয়।
তিনি বলেন, বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদকরা বর্তমানে চুক্তিগতভাবে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। সরকার একতরফাভাবে চুক্তি বাতিল করলে আন্তর্জাতিক সালিশে ক্ষতিপূরণ (আর্বিট্রেশন) দিতে হতে পারে। তাই আলোচনার মাধ্যমে অথবা চুক্তি প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সেটিকে কাজে লাগিয়ে চুক্তিগুলো সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে।
তার মতে, বিদ্যুৎ বিতরণে সিস্টেম লস কমানো এবং ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়িয়ে কিছু সাশ্রয় করা সম্ভব হলেও তা মোট ব্যয়ের তুলনায় খুব বেশি নয়।
দ্বিতীয় সমাধান হলো বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি। তিনি বলেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা গেলে বছরে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় সম্ভব। তবে এরপরও বড় অঙ্কের ভর্তুকি প্রয়োজন হবে।
রপ্তানি প্রণোদনা সম্পর্কে জাহিদ হোসেন বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশকে ধীরে ধীরে রপ্তানি ভর্তুকি প্রত্যাহার করতে হবে। তবে সরাসরি প্রণোদনা কমানোর পরিবর্তে উৎসে করের হার বাড়িয়ে একই ফল অর্জন করা যেতে পারে।
রেমিট্যান্স প্রণোদনা নিয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে ডলারের বিনিময় হার অনেক বেড়ে যাওয়ায় আগের তুলনায় এ ধরনের প্রণোদনার প্রয়োজন কমেছে। প্রণোদনা চালুর সময় ডলারের দাম ছিল ৮৫ টাকা, যা এখন প্রায় ১২৩ টাকা।
তবে এটি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। প্রণোদনা কমানো হলে অর্থনীতিবিদ ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সমালোচনার মুখে পড়তে হতে পারে সরকারকে।

