যুদ্ধ অবসানে একটি চুক্তিতে সম্মত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। তেহরান জানিয়েছে, এই চুক্তিতে লেবাননের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সেখানে গত ২ মার্চ থেকে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল।
চুক্তির ঘোষণা দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ আগামী শুক্রবার থেকে সব ধরনের জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে।
এতদিন এই পথটি ইরানের কার্যত অবরোধের মুখে ছিল। অন্যদিকে, তেহরান জানিয়েছে যে তাদের বন্দরগুলোর ওপর থাকা মার্কিন নৌ-অবরোধ অবিলম্বে তুলে নেওয়া হবে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার মধ্যেই দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা চালায়। এর মধ্য দিয়ে ইরান যুদ্ধের সূত্রপাত হয়।
চুক্তি নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র কী বলছে?
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল সচিবালয় সোমবার জানায়, চুক্তিতে সব ফ্রন্টে বা রণাঙ্গনে অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ করার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
সচিবালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, সমঝোতার ভিত্তিতে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ ও সামরিক অভিযান আজ রোববার রাত থেকে অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে বন্ধ হবে। এর পাশাপাশি ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত নৌ-অবরোধ অবিলম্বে এবং সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করা হবে।
এতে আরও বলা হয়, এই সমঝোতা স্মারক বা চুক্তি সইয়ের আনুষ্ঠানিকতা আগামী শুক্রবার, ১৯ জুন সম্পন্ন হবে।
বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, চূড়ান্ত চুক্তির জন্য আলোচনা ততক্ষণ পর্যন্ত স্থগিত থাকবে, যতক্ষণ না অপরপক্ষ প্রাথমিক চুক্তির অধীনে তাদের শর্তাদি পূরণ করে।
এতে আরও বলা হয়, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান এই প্রক্রিয়ায় পাকিস্তান ও কাতার সরকারের প্রচেষ্টার প্রশংসা করছে।
চুক্তির ঘোষণা দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, এই চুক্তি পুরো অঞ্চলে শান্তি বয়ে আনবে এবং নিরাপত্তা বজায় রাখবে।
ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘আমি হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ টোল-মুক্তভাবে চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার অনুমোদন দিচ্ছি এবং একইসঙ্গে মার্কিন নৌ-অবরোধ অবিলম্বে প্রত্যাহারের নির্দেশ দিচ্ছি। বিশ্বের জাহাজগুলো, তোমাদের ইঞ্জিন চালু করো। তেলের প্রবাহ চলুক।’
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স বলেন, নতুন যুদ্ধবিরতি মধ্যপ্রাচ্যে এক নতুন যুগের সূচনা করতে পারে। এই চুক্তি সম্পন্ন করতে উপসাগরীয় দেশগুলো এবং অন্যান্য আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে ট্রাম্পের সফল কূটনীতিকে তিনি কৃতিত্ব দেন।
ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ভ্যান্স বলেন, প্রেসিডেন্ট যা করেছেন, তা হলো ওই অঞ্চলকে বদলে দেওয়ার জন্য একটি প্রকৃত ক্ষেত্র তৈরি করা। আশা করি, ইরানের সঙ্গে এক নতুন সম্পর্কের সূচনা হবে।
তিনি আরও বলেন, আমার মনে হয়, আমরা আত্মবিশ্বাসের সাথে বলতে পারি, ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারবে না।
এর আগে, ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি জানান, খুব দ্রুতই সামরিক তৎপরতা শেষ হতে যাচ্ছে।
তিনি জানান, লেবাননসহ বিভিন্ন ফ্রন্টে যুদ্ধ এবং সামরিক অভিযানের অবিলম্বে ও স্থায়ী অবসান সোমবার থেকে কার্যকর হবে, এমন ঘোষণা আসতে পারে।
তিনি আরও যোগ করেন, একটি চূড়ান্ত চুক্তির বিষয়ে আলোচনা ৬০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন হবে। তবে এটি নির্ভর করবে ইরান কর্তৃক যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণের বিষয়টি যাচাইয়ের ওপর। এই প্রতিশ্রুতিগুলোর মধ্যে রয়েছে যুদ্ধ বন্ধ করা, নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার করা এবং ইরানের জব্দকৃত সম্পদ অবমুক্ত করা।
চুক্তির কথা কে প্রথম জানান?
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ রোববার এক্সে চুক্তির খবরটি দেন। তার দেশ তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনায় মধ্যস্থতা করে আসছে।
শরিফ বলেন, লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান স্থায়ীভাবে বন্ধ করার বিষয়ে একমত হওয়া গেছে।
এই চুক্তিতে কী কী অন্তর্ভুক্ত রয়েছে?
ইরানি সংবাদ সংস্থা মেহেরের তথ্য অনুযায়ী, খসড়া চুক্তিতে ১৪টি পয়েন্ট রয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে, লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ করা; ৩০ দিনের মধ্যে নৌ-অবরোধ সম্পূর্ণ প্রত্যাহার; ইরানের আশপাশ থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি; এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া।
খসড়ায় তেল বিক্রির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করা, চুক্তি সইয়ের ৬০ দিনের মধ্যে পারমাণবিক ইস্যুতে চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানো এবং ৬০ দিনের আলোচনা চলাকালীন ইরানের জব্দকৃত ২৪ বিলিয়ন ডলার সম্পদ অবমুক্ত করার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
মেহের আরও জানায়, ইরানের জব্দ সম্পদের অর্ধেক অবমুক্ত করা এবং হরমুজ প্রণালি সংক্রান্ত বিধিনিষেধ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত আলোচনা শুরু হবে না।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোর প্রতি দেশটির সমর্থন সংক্রান্ত বিষয়গুলো আলোচনার এজেন্ডা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
আল জাজিরা মেহেরের দেওয়া এই তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে পারেনি।
মধ্যস্থতাকারীরা কী বলছে?
যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে কাতারের পাশাপাশি পাকিস্তান প্রধান মধ্যস্থতাকারী দেশ হিসেবে কাজ করেছে এবং চুক্তি ঘোষণার আগে শেষ মুহূর্তের আলোচনায় তারা জড়িত ছিল।
শেহবাজ রোববার বলেন, মধ্যস্থতাকারীরা এই সপ্তাহে ধারাবাহিক বৈঠকের ব্যবস্থা করবে। তিনি আরও যোগ করেন, উভয়পক্ষ লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী এই চুক্তিতে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে তাদের অঙ্গীকারের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে এবং সহযোগিতার জন্য কাতারকে ধন্যবাদ জানান।
তিনি আরও বলেন, আমি এই বিষয়ে সৌদি আরব এবং তুরস্কের প্রতি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছে। তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে তাদের মধ্যকার অনিষ্পন্ন সমস্যাগুলো সমাধানের লক্ষ্যে হওয়া চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে।
মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে যে, তারা হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়াসহ এই চুক্তিকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিকভাবে টেকসই শান্তি সুসংহত করার এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রসারের দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে।
কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুলরহমান বিন জাসিম আল থানি পাকিস্তান এবং সেই আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পক্ষগুলোর প্রশংসা করেছেন, যারা এই চুক্তিতে পৌঁছানোর পরিবেশ তৈরিতে অবদান রেখেছে।
চুক্তিটি কবে-কোথায় সই হবে?
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ জানান, ১৯ জুন সুইজারল্যান্ডে চুক্তি সই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। পুরো সপ্তাহজুড়ে চুক্তির কারিগরি দিক নিয়ে আলোচনা চলবে।

