আফগানিস্তানে পাখির চেয়েও নারীদের সুরক্ষা কম, কেন বলছেন নারী অধিকারকর্মী

ফাওজিয়া কুফি আফগানিস্তানের সংসদের প্রথম নারী ডেপুটি স্পিকার। তিনি তালেবানের সঙ্গে শান্তি আলোচনা দলের সাবেক সদস্য এবং নারী অধিকারবিষয়ক সংগঠন ‘ওমেন ফর আফগানিস্তান’র পরিচালনা পর্ষদের প্রেসিডেন্ট। দীর্ঘদিন ধরে তিনি আফগান নারীদের অধিকার রক্ষা ও তাদের ক্ষমতায়নের পক্ষে সোচ্চার ভূমিকা পালন করে আসছেন।

আজ বুধবার দ্য গার্ডিয়ানে তার একটি মতামত ছাপা হয়েছে। এতে তিনি দাবি করেছেন, আফগানিস্তানে তালেবান শাসনের আওতায় নারীরা পাখির চেয়েও কম সুরক্ষা পাচ্ছেন।

ফাওজিয়া কুফি বলেন, সম্প্রতি আমার পরিবারের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে তালেবান। তাদের আটক রাখা হয়েছে, একজনকে নির্যাতন করা হয়েছে এবং আমার বাড়িও বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। উদ্দেশ্য ছিল আমাকে চুপ করিয়ে দেওয়া। পরিবারের নির্দোষ সদস্যদের মুক্তির জন্য ইউরোপীয় কূটনীতিকদের কাছে সহায়তা চেয়ে চিঠি লেখার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। ঠিক তখনই শুনলাম, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) তালেবান কর্মকর্তাদের ব্রাসেলসে আমন্ত্রণ জানিয়েছে।

প্রায় পাঁচ বছর পর আফগানিস্তানে এমন কী পরিবর্তন এসেছে, যা দেশটির নারী ও সাধারণ মানুষের জীবনকে উন্নত করেছে? এই পাঁচ বছরে ষষ্ঠ শ্রেণির পর মেয়েদের জন্য কোনো আনুষ্ঠানিক স্কুল খোলা হয়নি। অন্যদিকে হাজার হাজার ধর্মীয় বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যেখানে মেয়েদের পড়ার অনুমতি রয়েছে। পাঁচ বছর ধরে নারীদের চিকিৎসক হওয়ার পথ বন্ধ, আর এ সময়ে মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর হার বেড়েছে। কর্মসংস্থান থেকে নারীদের বাদ দেওয়ায় অনেকেই ভিক্ষাবৃত্তিতে নামতে বাধ্য হয়েছেন।

একইসঙ্গে তালেবান একের পর এক আইন ও বিধি জারি করে নারীদের জীবন আরও কঠিন করে তুলছে। সাম্প্রতিক দণ্ডবিধি-সংক্রান্ত বিধিমালায় তারা কার্যত নারীদের ওপর পুরুষের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণকে বৈধতা দিয়েছে। স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদসংক্রান্ত নতুন বিধিতেও একাধিক ধারায় বাল্যবিবাহকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। অথচ এসবের জন্য তাদের কোনো জবাবদিহি নেই।

তিনি বলেন, তালেবান ক্ষমতা দখলের আগে আমি আফগান সংসদের প্রথম নারী ডেপুটি স্পিকার ছিলাম। এখনও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নারীদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলি। সম্প্রতি এক নারী আমাকে বলেছিলেন, ‘আমরা দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও তালেবানের বাড়তে থাকা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কথা বলি। কিন্তু নারীদের বিরুদ্ধে এই নিপীড়ন বন্ধ হবে না, যতক্ষণ না জেন্ডার অ্যাপারথাইড বা লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের জন্য দায়ীদের দায়মুক্তির সংস্কৃতি শেষ হবে।’

আজ আফগানিস্তান জেন্ডার অ্যাপারথাইডের সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ। আন্তর্জাতিক আইনে এটিকে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলে শুধু আফগানিস্তান নয়, বিশ্বের যেকোনো স্থানে রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিচালিত নারীবিদ্বেষী নিপীড়নের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে।

আফগান নারীরা প্রতিদিন এই বৈষম্য অনুভব করেন। এটি তাদের জীবনের বাস্তবতা।

ফাওজিয়া কুফি বলেন, নারী বিচারক, প্রসিকিউটর কিংবা নারীদের সুরক্ষা দেওয়ার মতো আইন না থাকায় আমাদের ন্যায়বিচার পাওয়ার কোনো কার্যকর পথ নেই। এ বছরের ৪ জানুয়ারি তালেবান প্রধানের সই করা নতুন ফৌজদারি আদালত-সংক্রান্ত বিধিমালা নারীদের স্বাধীনতার কফিনে আরেকটি পেরেক ঠুকে দিয়েছে।

এই বিধিমালায় সমাজকে চার শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে—ধর্মীয় আলেম ও উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি, অভিজাত শ্রেণি, মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্ত। শাস্তির ধরনও শ্রেণিভেদে ভিন্ন।

এর একটি ধারায় স্বামী বা মালিকের মতো ব্যক্তিদের শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছে, যা একজন মানুষকে কার্যত সম্পত্তির পর্যায়ে নামিয়ে আনে এবং আন্তর্জাতিক আইনে নিষিদ্ধ দাসত্ব ও নির্যাতনের সংস্কৃতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়।

এই অধিকারকর্মী জানান, তালেবানের দণ্ডবিধির ৩২ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো স্বামী তার স্ত্রীকে এমনভাবে মারধর করেন যাতে তার হাড় ভাঙে, ক্ষত হয় বা শরীরে আঘাতের চিহ্ন পড়ে এবং স্ত্রী আদালতে তা প্রমাণ করতে পারেন, তাহলে স্বামীর শাস্তি হবে মাত্র ১৫ দিনের কারাদণ্ড।

অন্যদিকে ৭০ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি পাখি বা অন্য কোনো প্রাণীর ক্ষতি করলে তার পাঁচ মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।

এই আইনি বৈষম্যই স্পষ্ট করে দেয়, তালেবান শাসনামলে একটি পাখিও একজন নারীর চেয়ে বেশি সুরক্ষিত।

ফাওজিয়া কুফি বলেন, আমি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতি আহ্বান জানাই—জেন্ডার অ্যাপারথাইডকে আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দিন, দায়মুক্তির অবসান ঘটান এবং আফগান নারী ও মেয়েদের পাশে দাঁড়ান।

আফগানিস্তানের নারী ও কিশোরীদের জন্য জবাবদিহি ও আন্তর্জাতিক চাপ কোনো রাজনৈতিক বিষয় নয়; এটি তাদের বেঁচে থাকার প্রশ্ন। প্রতিদিন তারা জনজীবন থেকে মুছে যাচ্ছে, তাদের কণ্ঠরোধ করা হচ্ছে এবং তারা মৌলিক মানবিক মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

এমন পরিস্থিতিতে জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে আফগানিস্তানবিষয়ক স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থা গঠনের এক বছর পর তালেবান প্রতিনিধিদের ইউরোপের মাটিতে স্বাগত জানানো আফগান নারীদের জন্য এক গভীর বিশ্বাসঘাতকতার বার্তা বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি। বলেন, এটি সেই সব নারী ও মেয়ের মুখে চপেটাঘাত, যারা তালেবানের নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছে।

‘ওমেন ফর আফগানিস্তান’র প্রেসিডেন্ট বলেন, জবাবদিহিহীন সম্পৃক্ততা নিপীড়নকে বৈধতা দেয়। এটি এমন বার্তা দেয় যে রাজনৈতিক সুবিধার জন্য আফগান নারীদের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অঙ্গীকার সহজেই বিসর্জন দেওয়া যেতে পারে।

তিনি আরও বলেন, আমাদের প্রতীকী সংহতি বা ফাঁকা বিবৃতি নয়, ন্যায়বিচারের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস ও বাস্তব পদক্ষেপ প্রয়োজন। নারীর অধিকার লঙ্ঘনকারীদের দায়মুক্তির অবসান কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়; এটি সময়ের দাবি।

Related Articles

Latest Posts