সৌদিতে বাংলাদেশি শ্রমিকের মৃত্যু, টাকার অভাবে মরদেহ আনতে পারছে না পরিবার

অভাব-অনটনের সংসারে হাল ধরতে ঋণ করে ৮ মাস আগে সৌদি আরবে পাড়ি জমান শরীয়তপুরের কামরুল হাসান ওরফে বাবু (২৪)।

কিন্তু ভাগ্য সহায় হয়নি। গত ৯ এপ্রিল কাজ করার সময় স্ট্রোক করে মারা যান তিনি। তার মৃত্যুর খবরে পরিবারে নেমে আসে অন্ধকার। সংসার চালানো, ঋণ শোধ করা ও মরদেহ দেশে আনার কথা ভেবে দিশেহারা স্বজনরা।

বাবুর বাড়ি শরীয়তপুরের ডামুড্যা উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের কুতুবপুর এলাকায়। তার মৃত্যুর তথ্যটি নিশ্চিত করেছেন সৌদি আরবে অবস্থানরত একই এলাকার বাসিন্দা মুক্তার সরদার।

মুক্তার জানান, বাবুর মরদেহ দাম্মামে রয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, বাবুর বাবা মজিদ চৌকিদার পেশায় রিকশাচালক, নিজের কোনো জমিজমা নেই। অসুস্থ স্ত্রী, গৃহবধূ ও দুই নাতিকে নিয়ে তিনি শ্বশুরবাড়িতে টিনের ঘরে থাকেন। অভাবের সংসারে একটু স্বস্তি ফেরানোর আশায় ধারদেনা করে ছেলেকে বিদেশে পাঠান। সেসময় প্রায় ৪ লাখ ৬০ হাজার টাকা জোগাড় করতে হয়, যার বড় অংশই ছিল ঋণ। কিন্তু সেই স্বপ্নপূরণের আগেই থেমে যায় বাবুর জীবন।

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, স্থানীয় জাহাঙ্গীর ব্যাপারী ও খোকন মোল্লার মাধ্যমে বাবুকে সৌদি আরবে পাঠানো হয়। তাকে কোম্পানি ভিসার কথা বলা হলেও বাস্তবে দেওয়া হয় সাপ্লাই ভিসা। নির্দিষ্ট কাজ ও আট ঘণ্টা ডিউটির কথা থাকলেও সেখানে তাকে টানা ১৪ ঘণ্টা গাড়ি ধোয়ার কাজ করতে হতো, কোনো সাপ্তাহিক ছুটি ছাড়াই। এমনকি প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও ঠিকমতো দেওয়া হয়নি।

সম্প্রতি বাবুর বাড়িতে গেলে দ্য ডেইলি স্টারের সংবাদদাতাকে দেখে অসুস্থ মা বলেন, ‘আমার পোলারে আইনা দেবা না? আমি কি আর আমার পোলারে আর দেখব না? পোলারে আইনা দেও।’

স্থানীয় বাসিন্দা লতিফ আলী সরদার ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘রিকশা চালিয়ে বাবুকে এইচএসসি পাস করিয়েছেন মজিদ। বাবু সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালাতো। পরে ঋণ করে সৌদি আরবে যায়। এছাড়া তার মা মানসিক রোগী।’

তিনি বলেন, ‘এখন বাবুর পরিবারের ভরণপোষণ, ঋণের বোঝা ও মরদেহ কীভাবে দেশে আনা হবে, এসব নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছে সবাই। সরকার এগিয়ে এলে পরিবারটি কিছুটা হলেও স্বস্তি পাবে।’

বাবুর বন্ধু সাইফুল শিকদার ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘মরদেহ দেশে আনার জন্য আমরা কিছু অর্থ সংগ্রহ করেছি। তবে সেই টাকায় পুরো খরচ মেটানো সম্ভব নয়।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসের সহকারী পরিচালক মো. অহিদুল ইসলাম শাহীন ডেইলি স্টারকে বলেন, বাবুর মরদেহ দেশে আনার ব্যবস্থা করতে পরিবারকে বলা হয়েছে। এরপর প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে।

তিনি আরও বলেন, বাবুর ভিসা ও কাগজপত্র যাচাই করে দেখা হয়েছে। তিনি নিয়ম মেনেই সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। তাই সরকারের পক্ষ থেকে পরিবারের আর্থিক সহায়তা পেতে কোনো সমস্যা হবে না।

যোগাযোগ করা হলে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মাদারীপুর ও শরীয়তপুর জেলার প্রবাসী কল্যাণ সেন্টারের কাউন্সেলর মো. রাসেল মিয়া ডেইলি স্টারকে বলেন, শরীয়তপুর সদর উপজেলার বাবু নামের এক রেমিট্যান্সযোদ্ধা সৌদি আরবে মারা গেছেন বিলে শুনেছি। বৈধভাবে বিদেশে অবস্থানরত কোনো প্রবাসী মারা গেলে, তার মরদেহ দেশে আনার পর বিমানবন্দরে প্রাথমিকভাবে পরিবারকে ৩০ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, রেমিট্যান্সযোদ্ধা যে দেশে মারা যান, সেখানকার সংশ্লিষ্ট দূতাবাস মরদেহ দেশে পাঠানোর সময় প্রয়োজনীয় বিভিন্ন কাগজপত্রও সঙ্গে দিয়ে দেন। মৃতের পরিবারকে সেই কাগজপত্র নিয়ে দ্রুত আমাদের অফিসে আসতে হবে। পরে প্রয়োজনীয় আরও কিছু কাগজপত্র আমরা সংগ্রহ করি।  

রাসেল মিয়া আরও বলেন, মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রবাসী ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মাধ্যমে মৃত রেমিট্যান্সযোদ্ধার পরিবারকে ৩০ দিনের মধ্যে অন্তত ১৩ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। পাশাপাশি তারা অন্যান্য সুবিধাও পেয়ে থাকেন।

কাগজপত্রে কোনো ত্রুটি থাকলে এ প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ ২-৩ মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলে জানান তিনি।

Related Articles

Latest Posts