সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার তদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সরকারের গঠিত টাস্কফোর্সকে আরও ছয় মাস সময় দিয়েছেন হাইকোর্ট।
২০১২ সালে দায়ের করা একটি রিট আবেদনের শুনানি চলাকালে আজ রোববার বিচারপতি ফাতেমা নজীব এবং বিচারপতি এ এফ এম সাইফুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই আদেশ দেন।
ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনার আবেদন জানিয়ে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের পক্ষ থেকে রিটটি করা হয়েছিল।
শুনানি চলাকালে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল টাস্কফোর্সের পক্ষ থেকে তদন্ত সম্পন্ন করতে ছয় মাস সময় চেয়ে আবেদন জানান।
তিনি আদালতকে জানান, মামলার তদন্ত একেবারে শেষ পর্যায়ে রয়েছে। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে হত্যাকাণ্ডের সময়কার তদন্তকারী কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছে না টাস্কফোর্স।
রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, এ ধরনের একটি হত্যা মামলার তদন্ত শেষ না হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক।
তবে অ্যাটর্নি জেনারেল আদালতকে জানান, সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল কার্যালয়ের মাধ্যমে টাস্কফোর্স তদন্তের একটি অগ্রগতি প্রতিবেদন হাইকোর্ট বেঞ্চে জমা দিয়েছে।
সাগর-রুনি হত্যা মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির টাস্কফোর্সকে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য তিন মাস সময় দেওয়ার আবেদন করেন। একইসঙ্গে কেন তারা তদন্ত শেষ করতে পারছে না, তার ব্যাখ্যা শুনতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আদালতে তলব করারও আবেদন জানান তিনি।
রিট আবেদনকারীর আইনজীবী মনজিল মোরসেদ আদালতকে অনুরোধ করেন, টাস্কফোর্সকে যেন হলফনামা (অ্যাফিডেভিট) আকারে অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়, যেন আইনজীবীরা তা দেখার সুযোগ পান।
প্রায় দেড় বছর আগে হাইকোর্ট সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যার তদন্তের জন্য একটি টাস্কফোর্স গঠন করতে এবং ছয় মাসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন।
সম্প্রতি এই প্রতিবেদককে টাস্কফোর্সের প্রধান এবং পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) অতিরিক্ত আইজিপি মো. মোস্তফা কামাল বলেন, তদন্তে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি নেই। আমি শুধু এটুকুই বলতে পারি।
এর আগে ডিবি পুলিশ ও র্যাব এই একই মামলার তদন্তের দায়িত্ব পেলেও খুনিদের শনাক্ত করতে এবং সংশ্লিষ্ট আদালতে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে ব্যর্থ হয়েছিল।
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি পশ্চিম রাজাবাজারে নিজেদের ভাড়া বাসায় খুন হন মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার ও এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি।
পরদিন রুনির ভাই শেরেবাংলা নগর থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
সেই হত্যাকাণ্ডের কয়েক ঘণ্টা পর তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী (প্রয়াত) সাহারা খাতুন ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের গ্রেপ্তারের ঘোষণা দিয়েছিলেন। এরপর ১৪ বছরেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে, কিন্তু মামলার তদন্তে এখনও কোনো কুলকিনারা হয়নি।
যোগাযোগ করা হলে পিবিআইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও তদন্ত কর্মকর্তা মো. আজিজুল হক এর আগে এই প্রতিবেদককে বলেছিলেন, মামলার তদন্ত চলমান, তবে তিনি বিস্তারিত জানাতে রাজি হননি।
চলতি বছরের ১ এপ্রিল ঢাকার একটি আদালত ১২৫তম বারের মতো মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময় পিছিয়ে দেন, কারণ সেদিন তদন্ত কর্মকর্তা প্রতিবেদন জমা দিতে ব্যর্থ হয়েছিলেন।
আদালত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ৭ মে নতুন তারিখ ধার্য করেছেন।
এর আগে গত বছরের ২৩ অক্টোবর মামলার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে ব্যর্থ হয় টাস্কফোর্স।
তখন বিচারপতি ফাতেমা নজীব ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের হাইকোর্ট বেঞ্চ রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও টাস্কফোর্সের প্রতিনিধিকে উদ্দেশ করে বলেন, সাগর-রুনি হত্যার ১৩ বছর পার হয়ে গেল। তাদের কে মেরেছে, কিছুই জানা গেল না। এমনকি এই মামলার তদন্তও এখনও শেষ হলো না। সারা দেশের মানুষ এই মামলার দিকে তাকিয়ে আছে। তদন্ত শেষ করতে আর কত বছর লাগবে?
হাইকোর্ট বেঞ্চ সে সময় তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য টাস্কফোর্সকে শেষবারের মতো ছয় মাস সময় দিয়েছিলেন।
তার আগে, গত বছরের ২২ এপ্রিল হাইকোর্ট তদন্ত শেষ করতে টাস্কফোর্সকে অতিরিক্ত ছয় মাস সময় দেন।
২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর বিচারপতি ফারাহ মাহবুবের (বর্তমানে আপিল বিভাগের বিচারপতি) নেতৃত্বাধীন একটি হাইকোর্ট বেঞ্চ মামলার তদন্তের দায়িত্ব র্যাবের কাছ থেকে সরিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে একটি টাস্কফোর্স গঠনের নির্দেশ দেন।
ডিবির কাছ থেকে র্যাবের কাছে মামলার তদন্ত হস্তান্তরের আগের একটি আদেশ সংশোধন চেয়ে সরকারের করা আবেদনের প্রেক্ষিতে এই নির্দেশ দেওয়া হয়।
তখন টাস্কফোর্সকে ছয় মাসের মধ্যে তদন্ত শেষ করে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। সেই সময়সীমা গত বছরের ৩১ মার্চ শেষ হয়।

