শামীম হত্যা মামলা: ২ বছরেও শেষ হয়নি তদন্ত, বিচারের অপেক্ষায় পরিবার

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শামীম আহমেদ ওরফে শামীম মোল্লা হত্যার ঘটনায় দুই বছরেও তদন্ত শেষ করতে পারেনি পুলিশ।

২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এর আগে ১৫ জুলাই উপাচার্যের বাসভবনের সামনে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ওপর হামলায় তার জড়িত থাকার অভিযোগ ছিল। ওই ঘটনার জেরেই তাকে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

৩৫ বছর বয়সী শামীম মোল্লা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী এবং বর্তমানে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন।

শামীমকে হত্যার ঘটনায় ওই বছরের ২০ সেপ্টেম্বর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা সুদীপ্ত শাহীন আশুলিয়া থানায় আট শিক্ষার্থী ও অজ্ঞাতপরিচয় ২০ থেকে ২৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। পরে মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কাছে হস্তান্তর করা হয়।

ওই বছরের ৯ অক্টোবর শামীমের বড় ভাই শাহীন আলম ঢাকার একটি আদালতে আরেকটি হত্যা মামলা করেন। এতে সুদীপ্ত, ডেপুটি রেজিস্ট্রার  গাফরুল হাসান চৌধুরী ও প্রক্টর এ কে এম রাশিদুল আলমসহ ১২ জনকে আসামি করা হয়।

পরে আদালত পুলিশকে মামলাটি আগে করা মামলার সঙ্গে একীভূত করার নির্দেশ দেন।

আদালতের নথি ও পুলিশ কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের করা মামলায় পিবিআই এখনো আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়নি। এ ছাড়া শামীমের ভাইয়ের করা মামলার আদালতের নথিও এখনো পিবিআইয়ের কাছে পৌঁছায়নি।

শাহীন আলম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমি কয়েকবার আদালতে গিয়েছি। কিন্তু প্রতিবার সংশ্লিষ্ট আদালতকর্মীরা আমাকে বলেছেন, আমার করা মামলার কোনো নথি তাদের কাছে নেই।’

‘তারা আমাকে পিবিআইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছে’, বলেন তিনি।

শাহীন আলম আরও বলেন, ‘পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তার কাছে গেলে তিনি আমাকে জানান, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের করা মামলার নথি তারা পেয়েছেন। তবে অন্য মামলার নথি এখনো পাননি।’

তিনি বলেন, ‘আমার করা মামলার নথিই যদি খুঁজে না পাওয়া যায়, তাহলে ভাই হত্যার ঘটনায় কীভাবে ন্যায়বিচার আশা করতে পারি?’

শাহীন অভিযোগ করেন, আসামিদের কয়েকজনের রাজনৈতিক যোগাযোগের কারণে পুলিশ নিষ্ক্রিয় রয়েছে।

শামীমের ৬৫ বছর বয়সী মা কোহিনুর বেগম ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমার ছেলে হত্যার দুই বছর পার হয়ে গেছে, কিন্তু আমি এখনো ন্যায়বিচার পাইনি।’

‘আমরা কখনো শামীমকে কষ্ট দিইনি। অথচ তারা তাকে পিটিয়ে হত্যা করেছে। আমি তাদের কখনো ক্ষমা করব না। আমি আমার ছেলের হত্যার বিচার চাই। যারা এর জন্য দায়ী, তাদের বিচারের আওতায় আনা হয়েছে, তা দেখে যাওয়ার জন্য দীর্ঘদিন বাঁচতে চাই’, বলেন তিনি।

শাহীন আরও বলেন, ‘শামীমের মৃত্যুর পর মা অস্বাভাবিকভাবে চুপচাপ হয়ে গেছেন। তিনি দিনের বেশির ভাগ সময় একা থাকেন এবং শামীমের কথা ভাবেন। ঘটনার পর থেকে তিনি প্রায় ঘুমানই না।’

শামীম মোল্লা হত্যার ঘটনায় ২০২৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর গাজীপুরের হোতাপাড়া থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী মাহমুদুল হাসান রায়হানকে এবং ওই বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর ঢাকার তুরাগ এলাকা থেকে ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষার্থী সাইফুল ইসলাম ভূঁইয়াকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। আরেক আসামি আতিকুজ্জামান আদালতে আত্মসমর্পণ করলে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।

মামলার নথি অনুযায়ী, মাহমুদুল, সাইফুল ও আতিকুজ্জামান বর্তমানে জামিনে রয়েছেন। অন্য পাঁচ আসামি—আহসান লাবিব, হামিদুল্লাহ সালমান,  রাজন মিয়া, রাজু আহমেদ ও সোহাগ মিয়া পলাতক।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, গত বছরের ২১ মার্চ থেকে লাবিব, সালমান, রাজন ও রাজুকে ক্যাম্পাসে দেখা গেছে।

পরিবারের অভিযোগ, পুলিশ তাদের গ্রেপ্তারে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হওয়ায় পলাতক আসামিরা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবাধে ঘোরাফেরা করছেন।

দলীয় সূত্র জানায়, লাবিব জাতীয় ছাত্রশক্তির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি, সালমান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হল শাখা ছাত্রদলের সভাপতি এবং রাজু ও রাজন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য।

আদালতের নথি অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের করা হত্যা মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পরবর্তী তারিখ ২৮ সেপ্টেম্বর।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের উপপরিদর্শক (এসআই) আনিসুর রহমান ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘তদন্ত কবে শেষ হবে, তা আমি বলতে পারছি না। আমি শুধু এটুকুই বলতে পারি, আমরা তদন্ত করছি।’

পলাতক আসামিদের রাজনৈতিক পরিচয় তাদের গ্রেপ্তারে কোনো বাধা সৃষ্টি করছে কি না জানতে চাইলে আনিসুর অভিযোগটি অস্বীকার করেন।

তিনি বলেন, ‘তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে যারা এখনো গ্রেপ্তার হয়নি, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

যোগাযোগ করা হলে ঢাকা জেলা পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার (এসপি) এম এন মোর্শেদ ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘তদন্ত চলছে। তবে মামলার নথিপত্র না দেখে এ বিষয়ে বিস্তারিত বলতে পারছি না।’

Related Articles

Latest Posts