রাজ্জাক অভিনীত সিনেমার কালজয়ী ১০ প্রেমের গান

বাংলা চলচ্চিত্রের প্রেমের গানে নায়করাজ রাজ্জাক এক অবিচ্ছেদ্য নাম। পর্দায় তার উপস্থিতি যেমন প্রেমের গল্পকে পূর্ণতা দিয়েছে, তেমনি তার অভিনীত সিনেমার গানগুলোও হয়ে উঠেছে ভালোবাসার চিরচেনা অনুষঙ্গ। সময় বদলেছে, বদলেছে সিনেমার ভাষা; কিন্তু সেই গানগুলোর আবেদন ফুরোয়নি। প্রজন্মের পর প্রজন্মের শ্রোতার মনে আজও বেঁচে আছে রাজ্জাকের সিনেমার সেইসব প্রেমের গান।

নায়করাজ রাজ্জাকের নবম প্রয়াণদিবসে তাই ফিরে দেখা যাক তার অভিনীত সিনেমার ১০টি কালজয়ী প্রেমের গান।

‘ফুলের কানে ভ্রমর এসে’—শিরোনামেই যেন লুকিয়ে আছে ভালোবাসার মিষ্টি আমেজ। এহতেশাম পরিচালিত ‘পিচ ঢালা পথ’ সিনেমায় রাজ্জাক ও ববিতার পর্দার রসায়নের সঙ্গে গানটি দর্শকের মনে আলাদা জায়গা করে নেয়। গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন শাহনাজ রহমতউল্লাহ। ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের কথায় সুর করেছেন রবীন ঘোষ। সেই সময়ের প্রেমের গানগুলোর সরলতা ও মাধুর্য এই গানটিকে আজও শ্রুতিমধুর করে রেখেছে।

ভালোবাসার সাক্ষী হিসেবে আকাশকে কল্পনা করার রোমান্টিক ভাবনা উঠে এসেছে ‘এ আকাশকে সাক্ষী রেখে’ গানে। সাইফুল আযম কাশেম পরিচালিত ‘সোহাগ’ সিনেমায় রাজ্জাক ও ববিতা অভিনয় করেছিলেন। গানটি গেয়েছেন খুরশীদ আলম। ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের কথায় গানটির সুর করেছেন আলী হোসেন। রাজ্জাক-ববিতার জুটির রোমান্টিক আবহকে আরও গভীর করে তুলেছিল গানটি।

প্রেমের সিনেমা হিসেবে ‘অবুঝ মন’ বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে বিশেষভাবে স্মরণীয়। কাজী জহির পরিচালিত এই সিনেমায় রাজ্জাক ও শাবানার অভিনয় দর্শকদের মুগ্ধ করেছিল। ‘শুধু গান গেয়ে পরিচয়’ গানটি গেয়েছেন আব্দুল জব্বার। গানটির সুরকার আলতাফ মাহমুদ। একসময় প্রেমের গল্পের সঙ্গে এই গানটিও দর্শকের আবেগের অংশ হয়ে উঠেছিল। গান শুনলেই যেন ফিরে আসে ‘অবুঝ মন’-এর সেই সময়।

কিছু গান সময়ের সঙ্গে পুরোনো হয় না। ‘গানেরই খাতায় স্বরলিপি লিখে’ তেমনই একটি গান। নজরুল ইসলাম পরিচালিত ‘স্বরলিপি’ সিনেমার এই গান গেয়েছেন রুনা লায়লা। গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার ও সুরকার সুবল দাস। রাজ্জাকের অভিনয় এবং গানের আবেগ মিলেমিশে সিনেমাটির রোমান্টিক আবহকে আরও সমৃদ্ধ করেছিল।

ছবি কখনো শুধু ছবি থাকে না। তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে স্মৃতি, অনুভূতি আর ভালোবাসার গল্প। সেই অনুভূতিই যেন ধরা দিয়েছে ‘ছবি যেন শুধু ছবি নয়’ গানে। মোস্তফা মেহমুদ পরিচালিত ‘মানুষের মন’ সিনেমার এই গান গেয়েছেন খুরশীদ আলম। গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার এবং সুরকার সত্যসাহা। রাজ্জাক অভিনীত এই সিনেমার গানটি তার সময়ের রোমান্টিক গানের তালিকায় আলাদা করে মনে রাখার মতো।

প্রিয় মানুষের মুখ আয়নায় দেখার কল্পনাও যে কতটা রোমান্টিক হতে পারে, তা বোঝা যায় ‘আয়নাতে ওই মুখে দেখবে যখন’ গানটি শুনলে। অশোক ঘোষ পরিচালিত ‘নাচের পুতুল’ সিনেমায় রাজ্জাকের সঙ্গে অভিনয় করেছিলেন শবনম। গানটি গেয়েছেন মাহমুদুন্নবী। গীতিকার কে জি মোস্তফা এবং সুরকার রবীন ঘোষ। গানটি রাজ্জাককে রোমান্টিক নায়ক হিসেবে দর্শকের কাছে আরও জনপ্রিয় করে তুলেছিল।

চোখে চোখ পড়া থেকেই কখনো কখনো শুরু হয় ভালোবাসার গল্প। সেই চিরন্তন অনুভূতিই যেন উঠে এসেছে ‘ও চোখে চোখ পড়েছে যখনই’ গানে। রাজ্জাক ও ববিতা অভিনীত আলোচিত সিনেমা ‘অনন্ত প্রেম’-এর এই গান গেয়েছেন খুরশীদ আলম ও সাবিনা ইয়াসমিন। গানটির কথা লিখেছেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার। সুর করেছেন আজাদ রহমান। রাজ্জাক-ববিতার রোমান্টিক জুটির অন্যতম স্মরণীয় গান হিসেবেই এটি শ্রোতাদের মনে জায়গা করে আছে।

কিছু দিন চলে যায়, কিন্তু স্মৃতি থেকে যায়। ‘গীতিময় সেইদিন চিরদিন’ গানটির মধ্যেও যেন সেই পুরোনো দিনের স্মৃতি ধরে রাখার আকুতি। এসএম শফি পরিচালিত ‘ছন্দ হারিয়ে গেল’ সিনেমায় রাজ্জাক ও শাবানার অভিনয়ের সঙ্গে গানটি দর্শকের মন ছুঁয়েছিল। সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠে গানটির কথা লিখেছেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার। সুর করেছেন আনোয়ার পারভেজ।

ভালোবাসায় পড়ার মুহূর্তটা অনেক সময় নিজের কাছেই অজানা থাকে। কখন যে মন গোপনে কারও কাছে ধরা পড়ে যায়, তা বোঝা যায় পরে। সেই অনুভূতিই যেন উঠে এসেছে ‘আমি নিজের মনে নিজেই যেন গোপনে ধরা পড়েছি’ গানে। সুভাষ দত্ত পরিচালিত ‘আবির্ভাব’ সিনেমার এই গান গেয়েছেন খন্দকার ফারুক আহমেদ। গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার এবং সুরকার সত্যসাহা। রাজ্জাক অভিনীত এই সিনেমার গানটি তার সময়ের জনপ্রিয় প্রেমের গানগুলোর একটি।

ভালোবাসার মানুষকে পাওয়া জীবনের বড় প্রাপ্তি। সেই প্রাপ্তির আনন্দ যেন ধরা দিয়েছে ‘আমি ধন্য হয়েছি ধন্য’ গানে। দিলীপ সোম পরিচালিত ‘সোনা বৌ’ সিনেমায় রাজ্জাক ও ববিতা অভিনয় করেছিলেন। গানটি গেয়েছেন সাবিনা ইয়াসমিন। গাজী মাজহারুল আনোয়ারের কথায় গানটির সুর করেছেন আনোয়ার পারভেজ। রাজ্জাক-ববিতার জুটির জনপ্রিয় প্রেমের গানগুলোর তালিকায় এটিও দীর্ঘদিন ধরে শ্রোতাদের মনে জায়গা করে আছে।

রাজ্জাকের অভিনীত সিনেমার প্রেমের গানগুলো আসলে শুধু গান নয়। এগুলো বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের একটি সময়ের স্মৃতি। সেই সময়, যখন সিনেমার গান মানুষের জীবনের সঙ্গে মিশে যেত। প্রেমিক-প্রেমিকার ভালোবাসা, অপেক্ষা, অভিমান কিংবা বিচ্ছেদের অনুভূতি প্রকাশের ভাষা হয়ে উঠত সিনেমার গান।

আর সেই গানগুলোর পর্দায় যখন রাজ্জাককে দেখা যেত, তখন চরিত্রটি যেন আরও জীবন্ত হয়ে উঠত। তার চোখের ভাষা, অভিব্যক্তি আর অভিনয় গানকে নিয়ে যেত অন্য এক মাত্রায়।

আজ নায়করাজ রাজ্জাকের নবম প্রয়াণদিবস। ২০১৭ সালের ২১ আগস্ট ৭৫ বছর বয়সে মারা যান বাংলা চলচ্চিত্রের এই কিংবদন্তি। সময়ের স্রোতে মানুষ চলে যায়। কিন্তু কিছু গান থেকে যায়। আর সেই গানের ভেতর দিয়ে বেঁচে থাকেন কিছু মানুষ। রাজ্জাক তেমনই একজন—বাংলা সিনেমার প্রেমের গানে যার উপস্থিতি আজও অমলিন।

Related Articles

Latest Posts