মক্কা চুক্তির পর ‘অ্যাকিলিস শিল্ড’: কী ঘটছে আরব সাগর থেকে ভূমধ্যসাগরে

মধ্যপ্রাচ্য ও ভূমধ্যসাগরের নিরাপত্তা সমীকরণে প্রায় একই সময়ে এসেছে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। গত ৭ আগস্ট সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে হয়েছে ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’।

এর কয়েক সপ্তাহ পর, গত ৩১ আগস্ট ইসরায়েল ও গ্রিসের মধ্যে হয়েছে প্রায় ৩ বিলিয়ন ইউরোর ‘অ্যাকিলিস শিল্ড’ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নির্মাণের চুক্তি।

দুটি চুক্তির ধরন ভিন্ন। মক্কা চুক্তির ভিত্তি যৌথ প্রতিরক্ষার প্রতিশ্রুতি। আর অ্যাকিলিস শিল্ড গ্রিসের আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর প্রকল্প।

তবে সময়, অঞ্চল ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সম্পর্কের কারণে দুটি উন্নয়নই নতুন করে আঞ্চলিক নিরাপত্তা সমীকরণ নিয়ে আলোচনা তৈরি করেছে।

গত ৭ আগস্ট পবিত্র নগরী মক্কায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে প্রতিরক্ষা চুক্তি হয়। ওই দিন বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, সদস্য তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

গত ১৩ আগস্ট রয়টার্সের অপর প্রতিবেদনে বলা হয়, চুক্তির অধীনে রাজনৈতিক ও সামরিক সমন্বয়ের ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে তিন দেশ। পারস্পরিক প্রতিরক্ষার নীতি থাকলেও সদস্যদের সুনির্দিষ্ট প্রতিরক্ষা বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে প্রাথমিক ঘোষণায় বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।

পরবর্তীতে ৩১ আগস্ট পাকিস্তানের গণমাধ্যম ডন জানায়, চুক্তির অধীনে সৌদি আরবে একটি সচিবালয় প্রতিষ্ঠায় একমত হয়েছে তিন দেশ। প্রথম তিন বছর একজন পাকিস্তানি মহাসচিব এর নেতৃত্ব দেবেন।

অর্থাৎ, এটি শুধু অস্ত্র কেনাবেচা বা সামরিক প্রযুক্তি ভাগাভাগির চুক্তি নয়; নিরাপত্তার প্রশ্নে তিন দেশকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করার উদ্যোগ।

মুসলিম বিশ্বের ঐতিহাসিক এই নিরাপত্তা জোটের কেন্দ্রে ছিল পবিত্র নগরী মক্কা। এ কারণেই এর নামকরণ হয়েছে ‘মক্কা চুক্তি’।

গত ৩১ আগস্ট রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, ৩ বিলিয়ন ইউরোর (প্রায় ৪২ হাজার ৯০০ কোটি টাকা) চুক্তির আওতায় ইসরায়েল ভূমধ্যসাগরের ইউরোপীয় অংশের দেশ গ্রিসের জন্য বহুস্তরবিশিষ্ট আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলবে। এই প্রকল্পের নাম ‘অ্যাকিলিস শিল্ড’।

গ্রিক মহাকাব্য ‘ইলিয়াড’-এর অন্যতম প্রধান চরিত্র অ্যাকিলিস ছিলেন গ্রিক বাহিনীর বীরযোদ্ধা। তার নাম থেকেই প্রকল্পটির নামকরণ করা হয়েছে।

রয়টার্স জানায়, চুক্তির আওতায় গ্রিস পাবে ডেভিডস স্লিং ও স্পাইডার আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, বারাক এমএক্স ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও আকাশ পর্যবেক্ষণের জন্য এমএমআর মাল্টিমিশন রাডার।

এ ছাড়াও, ইউরোপের দেশটি পাবে একটি জাতীয় কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম, যা বিভিন্ন আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে সমন্বয় করবে। পৃথক ২ কোটি ৬০ লাখ ইউরোর চুক্তিতে কৌশলগত স্থাপনাগুলোকে ড্রোন হামলা থেকে সুরক্ষায় ড্রোন ডোম সিস্টেমও সরবরাহ করবে ইসরায়েল।

তবে ‘অ্যাকিলিস শিল্ড’ কোনো যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি নয়। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েল বা গ্রিসের একটির ওপর হামলা হলে অন্যটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে—এমন প্রতিশ্রুতি এতে নেই।

মক্কা চুক্তির মূল বিষয় পারস্পরিক প্রতিরক্ষা। রয়টার্সের প্রতিবেদন জানাচ্ছে, সদস্য দেশগুলোর একটির ওপর হামলাকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

অন্যদিকে, ‘অ্যাকিলিস শিল্ড’ গ্রিসের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর প্রকল্প। এর মাধ্যমে ইসরায়েলি প্রযুক্তিতে দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা আধুনিক ও সমন্বিত করা হবে। একই সঙ্গে ইসরায়েল-গ্রিসের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও গভীর হবে।

অর্থাৎ, ‘মক্কা চুক্তি’ হচ্ছে যৌথ প্রতিরক্ষার রাজনৈতিক ও কৌশলগত কাঠামো এবং ‘অ্যাকিলিস শিল্ড’ হচ্ছে সামরিক প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকেন্দ্রিক সহযোগিতা।

অনেকের মতে, ‘মক্কা চুক্তি’ ও ‘অ্যাকিলিস শিল্ড’-এর মধ্যে সরাসরি সংঘাত নেই। কোনো পক্ষই আনুষ্ঠানিকভাবে একে অন্যকে লক্ষ্য করে চুক্তিগুলো করেনি।

তবে দুই সমীকরণের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র আছে। আর তা হলো—তুরস্ক।

তুরস্ক ‘মক্কা চুক্তি’র সদস্য। অন্যদিকে, গ্রিসের সঙ্গে দেশটির দীর্ঘদিনের সামরিক ও ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে।

গত ৩১ আগস্ট রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিবেশী তুরস্কের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিরোধের কারণে গ্রিস প্রতিরক্ষা খাতে তুলনামূলকভাবে বেশি ব্যয় করে।

ভূমধ্যসাগরের পূর্বাঞ্চলে গ্রিস ও তুরস্কের মাঝখানে এজিয়ান সাগর ও সাইপ্রাসসহ বিভিন্ন ইস্যুতে এই দুই ন্যাটো মিত্রের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে মতবিরোধ চলে আসছে।

এই প্রেক্ষাপটে গ্রিসের নতুন আকাশ প্রতিরক্ষা প্রকল্পে ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় ভূমিকা আঞ্চলিক কৌশলগত হিসাবের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।

‘অ্যাকিলিস শিল্ড’ শুধু অস্ত্র বিক্রির চুক্তি নয়, এর সঙ্গে বৃহত্তর কৌশলগত সম্পর্কও জড়িত। আরবদের সঙ্গে গ্রিকদের সম্পর্ক সুপ্রাচীন হওয়ায় গ্রিকরা ফিলিস্তিন অঞ্চলে ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সব সময়ই সোচ্চার ছিল। দীর্ঘদিন ধরে স্বাধীন ফিলিস্তিনের পক্ষে অবস্থান নিয়ে থাকা অ্যাথেন্স প্রতিবেশী আঙ্কারার সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়ায় নিজেদের নিরাপত্তার ঝুঁকে পড়ে তেল আবিবের দিকে।

এমন বাস্তবতায় ইসরায়েল ও গ্রিস দীর্ঘদিন ধরে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়িয়ে আসছে। এর সঙ্গে সাইপ্রাসকে যুক্ত করে তিন দেশের একটি ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতা কাঠামোও গড়ে তোলা হয়েছে।

২০২৫ সালের ২২ ডিসেম্বর ইসরায়েল, গ্রিস ও সাইপ্রাসের ১০ম ত্রিপক্ষীয় শীর্ষ সম্মেলনের পর প্রকাশিত যৌথ ঘোষণায় নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা ও সামরিক সহযোগিতা আরও জোরদারের কথা বলা হয়।

সেই বছর ২৯ ডিসেম্বর এএফপির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৬ সালে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে যৌথ বিমান ও নৌ মহড়ার সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে গ্রিস, ইসরায়েল ও সাইপ্রাস।

এর ফলে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তিন দেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান কৌশলগত সম্পর্ক তৈরি হয়। ‘অ্যাকিলিস শিল্ড’ সেই সম্পর্কের সামরিক ও প্রযুক্তিগত দিক আরও শক্তিশালী করতে পারে।

এ মুহূর্তে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ নেই।

মক্কা চুক্তি যৌথ প্রতিরক্ষার একটি আনুষ্ঠানিক কাঠামো হলেও এর বিপরীতে ইসরায়েল-গ্রিস-সাইপ্রাসের মধ্যে একই ধরনের পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি নেই। ‘অ্যাকিলিস শিল্ড’ ইসরায়েল ও গ্রিসের দ্বিপক্ষীয় চুক্তি, যাতে সাইপ্রাস সরাসরি অংশীদার নয়।

তাই এটিকে এখনই মক্কা চুক্তির বিপরীতে দাঁড়ানো কোনো নতুন সামরিক জোট বলা যাবে না।

তবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে পূর্ব ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত দেশগুলো নতুন করে নিরাপত্তা অংশীদারত্ব গড়ে তুলছে। কোথাও যৌথ প্রতিরক্ষার কাঠামো তৈরি হচ্ছে, কোথাও জোর দেওয়া হচ্ছে আকাশ প্রতিরক্ষা ও সামরিক প্রযুক্তিতে। আবার কোথাও পুরোনো কৌশলগত সম্পর্ক আরও জোরদার করা হচ্ছে।

এর পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ।

গত ৭ আগস্ট মক্কা চুক্তি স্বাক্ষরের সময় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চলমান সংঘাত ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছিল রয়টার্স। প্রতিবেদনে বলা হয়, আঞ্চলিক সংঘাতের মধ্যে তিন দেশই নিরাপত্তা উদ্বেগের মুখে ছিল।

অন্যদিকে গত ৩১ আগস্টের রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্রিস ২০৩৬ সাল পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার ৮০০ কোটি ইউরো ব্যয়ে সামরিক সক্ষমতা আধুনিকায়নের পরিকল্পনা নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বহুস্তরবিশিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্র, আকাশ ও ড্রোন প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ও যুদ্ধজাহাজ কেনা।

ড্রোন, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য আকাশভিত্তিক হুমকি বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

একদিকে, এই পরিবর্তিত সামরিক বাস্তবতায় গ্রিস গড়ে তুলছে ‘অ্যাকিলিস শিল্ড’। অন্যদিকে, মক্কা চুক্তি আঞ্চলিক নিরাপত্তায় নতুন অংশীদারত্বের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

মক্কা চুক্তির বাস্তবায়ন, সদস্যদের মধ্যে সামরিক ও রাজনৈতিক সমন্বয় এবং নতুন সচিবালয়ের কার্যক্রম এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভবিষ্যতে আরও দেশ এই চুক্তিতে যুক্ত হতে পারে বলেও আলোচনা রয়েছে। সম্ভাব্য অংশীদার হিসেবে ইতোমধ্যে মিসর ও বাংলাদেশের নাম আলোচনায় এসেছে।

অন্যদিকে, ‘অ্যাকিলিস শিল্ড’ বাস্তবায়িত হলে গ্রিসের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে।

গত ৩১ আগস্ট রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, চুক্তির আওতায় ইসরায়েল ও গ্রিস প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা বাড়াবে এবং গ্রিসের স্থানীয় শিল্পে প্রযুক্তি ও দক্ষতা স্থানান্তরের ব্যবস্থাও থাকবে।

তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এগুলো কি বিচ্ছিন্ন কয়েকটি প্রতিরক্ষা চুক্তি, নাকি মধ্যপ্রাচ্য ও ভূমধ্যসাগরে নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থার সূচনা?

এখনই এর চূড়ান্ত জবাব দেওয়া কঠিন। তবে মক্কা থেকে অ্যাথেন্স পর্যন্ত সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে, পুরোনো নিরাপত্তা সমীকরণের পাশাপাশি নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি, অংশীদারত্ব ও সামরিক সহযোগিতার এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে।

Related Articles

Latest Posts