কখনো কখনো একজন ফুটবলারের জীবনই হয়ে ওঠে হার না মানার এক অসাধারণ গল্প। যে গল্পে থাকে ভয়াবহ বিপর্যয়, হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কা, নতুন ঠিকানা, ভালোবাসা আর নিজের পরিচয় খুঁজে পাওয়ার লড়াই। হাইতির ভয়াবহ ভূমিকম্প থেকে বেঁচে যাওয়া স্টিফেন ‘কিকি’ রামোসের গল্পটাও ঠিক তেমন। মাত্র ১৭ বছর বয়সেই আর্জেন্টিনার ফুটবলে আলোচনায় উঠে আসা এই তরুণ শুধু নিজের প্রতিভার কারণেই নয়, তার জীবনযুদ্ধের কারণেও হয়ে উঠেছেন বিশেষ।
আর্জেন্টিনার ফুটবল মানেই দিয়েগো ম্যারাডোনা থেকে লিওনেল মেসির মতো কিংবদন্তিদের নাম। আকাশি-সাদা জার্সিতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ফুটবলাররা দেশের গৌরব বহন করেছেন। সেই জার্সির ভবিষ্যৎ তারকাদের তালিকায় এবার নতুন করে জায়গা করে নিচ্ছেন কিকি রামোস। এখনো পেশাদার ফুটবলে ভেলেস সার্সফিল্ডের হয়ে অভিষেক হয়নি তার। কিন্তু এরই মধ্যে ইতিহাস গড়ে ফেলেছেন এই উইঙ্গার।
২০০৯ সালের ৩ এপ্রিল হাইতির রাজধানী পোর্ট-অ-প্রিন্সে জন্ম কিকি রামোসের। কিন্তু জন্মের মাত্র নয় মাসের মাথায় বদলে যায় তার পুরো পৃথিবী। ২০১০ সালের জানুয়ারিতে হাইতিতে আঘাত হানে ভয়াবহ ভূমিকম্প। শত শত হাজার মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়া সেই দুর্যোগে অসংখ্য শিশু হারায় পরিবার ও স্বজন। সেই ভয়াবহতার মধ্যেও বেঁচে যান ছোট্ট রামোস।
ভূমিকম্পের পর এক আর্জেন্টাইন দম্পতি তাকে দত্তক নেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে বুয়েনস এইরেসে নিয়ে আসেন। তখন তার বয়স মাত্র নয় মাস। এরপর আর্জেন্টিনাতেই বেড়ে ওঠেন তিনি। সেই দেশই হয়ে ওঠে তার ঘর, তার শৈশব, তার স্বপ্নের ঠিকানা।
আজ কিকি রামোসের কথাবার্তায় বুয়েনস এইরেসের স্বাভাবিক টান। তার স্প্যানিশ উচ্চারণ শুনলে বোঝার উপায় নেই, জন্ম তার আর্জেন্টিনায় নয়। আর্জেন্টিনার রাজধানীতে বেড়ে ওঠা অন্য আর দশজন কিশোরের মতোই তার কথার ধরন।
এ কারণেই আর্জেন্টাইন সমর্থকদের কাছেও খুব দ্রুত আপন হয়ে উঠেছেন তিনি। জাতীয় দলের ক্যাম্পে ডাক পাওয়ার পর তার সাক্ষাৎকারের বিভিন্ন অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সমর্থকদের অনেকে মজা করে বলতে থাকেন, ‘সে তো দুলসে দে লেচে আর মাতের মতোই আর্জেন্টাইন।’
তবে শুধু আর্জেন্টাইনদের মতো কথা বলাই নয়, মাঠের পারফরম্যান্স দিয়েই নিজের জায়গা তৈরি করছেন রামোস। এক প্রতিবেশীর মাধ্যমে ছোটবেলায় ভেলেস সার্সফিল্ডের একাডেমিতে সুযোগ পান তিনি। আর্জেন্টিনার অন্যতম বিখ্যাত এই ফুটবল একাডেমিতে দ্রুতই নিজের প্রতিভার ছাপ রাখতে শুরু করেন।
গতি, শক্তি আর ভয়ডরহীন ড্রিবলিং রামোসের খেলার সবচেয়ে বড় অস্ত্র। মূলত উইঙ্গার হিসেবে খেলেন তিনি। প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের খেলোয়াড়কে একের পর এক একজনের বিপক্ষে নেওয়ার সাহস এবং বিস্ফোরক গতির কারণে তার খেলার ধরনে ব্রাজিলের তারকা ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের ছায়াও খুঁজে পান অনেকে।
তবে পথটা সবসময় মসৃণ ছিল না। ২০২৫ সালে চোটের কারণে তার অগ্রযাত্রায় কিছুটা ছেদ পড়ে। কিন্তু সেখানেই থেমে যাননি রামোস। ফিরে এসে আরও শক্তিশালীভাবে নিজেকে প্রমাণ করেন। আর্জেন্টিনার যুব প্রতিযোগিতায় ১২ গোল করে আবারও সবার নজরে চলে আসেন তিনি।
তার পারফরম্যান্স নজর কাড়ে আর্জেন্টিনা অনূর্ধ্ব-১৭ দলের কোচ দিয়েগো প্লাসেন্তের। এরপর আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের এজেইসা সদর দপ্তরে জাতীয় দলের অনুশীলন ক্যাম্পে ডাক পান রামোস। আর সেখান থেকেই আসে জীবনের অন্যতম বড় মুহূর্ত, ইকুয়েডরের বিপক্ষে আর্জেন্টিনা অনূর্ধ্ব-১৭ দলের হয়ে আন্তর্জাতিক অভিষেক।
ফলাফল কিংবা ম্যাচের পারফরম্যান্সের বাইরেও সেই অভিষেকের গুরুত্ব ছিল অনেক বেশি। কারণ এর মধ্য দিয়ে ইতিহাসের পাতায় নাম লেখান রামোস। হাইতিতে জন্ম নেওয়া প্রথম ফুটবলার হিসেবে আর্জেন্টিনার কোনো পর্যায়ের জাতীয় দলের জার্সি পরেন তিনি।
জাতীয় দলে ডাক পাওয়ার পর রেডিও লা রেডকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আর্জেন্টিনায় বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলেন রামোস। নিজের পরিচয় নিয়ে কোনো ধরনের বৈষম্যের শিকার হয়েছেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি আর্জেন্টিনায় আসার পর কখনো বৈষম্যের শিকার হইনি। কখনো নিজেকে অন্যদের চেয়ে আলাদা মনে হয়নি। আর্জেন্টিনাকে বর্ণবাদী বলা হয়, আমার মনে হয় সেটা শুধু কথার কথা। আর্জেন্টিনা একটি সুন্দর দেশ।’
জাতীয় দলে ডাক পাওয়ার খবরটিও রামোসের কাছে এসেছিল একেবারে অপ্রত্যাশিতভাবে। তিনি বলেন, ‘আমি তখন অনলাইনে গণিতের ক্লাস করছিলাম। হঠাৎ ভেলেসের শারীরিক প্রশিক্ষকের কাছ থেকে একটি বার্তা এল, “অভিনন্দন।” প্রথমে কিছুই বুঝিনি, কারণ আমি ক্লাসে মনোযোগ দিচ্ছিলাম। এরপর একের পর এক বার্তা আসতে থাকে। যখন বুঝতে পারলাম বার্তাগুলো আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন থেকে এসেছে, তখন বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। ক্লাস বন্ধ করে দৌড়ে গিয়ে বাবা-মাকে খবরটি দিয়েছিলাম।’
শৈশবের সেই ভয়াবহ অধ্যায়ের কথাও এখন ধীরে ধীরে বুঝতে শিখেছেন রামোস। হাইতির ভূমিকম্পের সময় তিনি ছিলেন অনাথ আশ্রমে। সেই ভয়াবহতার মধ্যেও ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। নিজের জীবনের সেই অধ্যায় স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘যখন ভূমিকম্প হয়েছিল, তখন আমি অনাথ আশ্রমেই ছিলাম। কিন্তু সৌভাগ্যবশত বেঁচে যাওয়া শিশুদের একজন ছিলাম।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি একটু বড় হওয়ার পর পুরো ঘটনাটা আরও ভালোভাবে বুঝতে পেরেছি। তবে আমার বাবা-মা আমার এবং আমার ভাই-বোনদের জন্য যা করেছেন, তার জন্য আমি তাদের কাছে ভীষণ কৃতজ্ঞ।’
জন্মভূমি হাইতিতে অবশ্য এখনো ফেরা হয়নি রামোসের। এমনকি আপাতত সেখানে যাওয়ার কথাও ভাবছেন না তিনি। রামোস বলেন, ‘আজ আমি আর্জেন্টিনায় যে জীবন পেয়েছি, তাতেই আমি খুশি। সেখানে ফিরে যাওয়ার কথা এখনো ভাবিনি। তবে হয়তো বয়স বাড়লে এ বিষয়ে আগ্রহ তৈরি হতে পারে।’
তবে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক ফুটবলে কোন দেশের জার্সি স্থায়ীভাবে পরবেন, সেই সিদ্ধান্ত এখনো নিতে হয়নি রামোসকে। ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, সিনিয়র পর্যায়ে আর্জেন্টিনা কিংবা নিজের জন্মভূমি হাইতি, দুই দেশের হয়েই খেলার সুযোগ রয়েছে তার।
এই মুহূর্তে অবশ্য তার চোখ ভেলেস সার্সফিল্ডে নিজের উন্নতির দিকে। একই সঙ্গে বছরের শেষ দিকে কাতারে অনুষ্ঠিতব্য ফিফা অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার দলে জায়গা করে নেওয়াই তার বড় লক্ষ্য।
শেষ পর্যন্ত সিনিয়র পর্যায়ে রামোস আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা জার্সি বেছে নেবেন, নাকি জন্মভূমি হাইতির হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজের পরিচয় তৈরি করবেন, সেই উত্তর সময়ই দেবে। কিন্তু তার গল্প ইতোমধ্যেই ফুটবলের সীমানা ছাড়িয়ে গেছে।

