সরকারের ছয় মাসের কর্মক্ষমতা মূল্যায়নের ভিত্তিতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের মন্ত্রিসভার আকার বাড়তে পারে এবং কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে রদবদল আসতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোর কাজের গতি বাড়াতে নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি অতিরিক্ত উপদেষ্টা ও টেকনোক্র্যাট নিয়োগের বিষয়ও বিবেচনায় রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় (পিএমও) এবং কয়েকজন মন্ত্রীর সূত্রে দ্য ডেইলি স্টার জানতে পেরেছে, বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে অংশ নেওয়া মিত্র দলগুলোর নেতাদেরও সরকারে অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে ভাবা হচ্ছে। এ ছাড়া বিএনপির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা, তরুণ সংসদ সদস্য ও নারী প্রতিনিধির নামও সম্ভাব্য নতুন সদস্য হিসেবে আলোচনায় রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মন্ত্রিসভা সদস্য বলেন, তিন থেকে চারজন নতুন সদস্য মন্ত্রিসভায় যোগ দিতে পারেন। কয়েকজন টেকনোক্র্যাট ও যুগপৎ আন্দোলনের মিত্রদের নাম নিয়ে আলোচনা চলছে।
তবে এই মুহূর্তে কোনো মন্ত্রীকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেওয়ার সম্ভাবনা কম বলেই ইঙ্গিত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। পরিবর্তন হলে তা মূলত বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব বা পোর্টফোলিও পুনর্বণ্টনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
সরকারি সূত্রের মতে, এখন কাউকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দিলে তিনি দুর্নীতিগ্রস্ত, অসৎ বা অযোগ্য—এমন ধারণা তৈরি হতে পারে। তাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কাউকে বাদ না দিয়ে দায়িত্ব পুনর্বিন্যাসের পথেই এগোতে পারেন।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সূত্র জানিয়েছে, আগামী ১৫ আগস্ট সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অগ্রগতি প্রতিবেদন পর্যালোচনা করবেন। এরপর দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ করে সেপ্টেম্বরের মধ্যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য (যিনি নিজেও একজন মন্ত্রী) বলেছেন, সরকারের ছয় মাসের মূল্যায়নের অংশ হিসেবে বড় ধরনের রদবদল হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী যদি কোনো মন্ত্রীর কর্মদক্ষতায় সন্তুষ্ট না হন, তাহলে তাকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ না দিয়ে তার দায়িত্ব পরিবর্তন করে অন্য কাউকে সেই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিতে পারেন।
চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তার ৪৭ সদস্যের মন্ত্রিপরিষদে রয়েছেন ২৪ জন মন্ত্রী ও ২৩ জন প্রতিমন্ত্রী। ২৪ জন মন্ত্রীর মধ্যে ছয়জন দুটি করে, দুজন তিনটি করে এবং বাকিরা একটি করে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন। ২৩ জন প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে চারজন দুটি করে এবং বাকিরা একটি করে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রীর বর্তমানে ১০ জন উপদেষ্টা রয়েছেন, যার মধ্যে পাঁচজন মন্ত্রী এবং পাঁচজন প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার। তারা ১৬টি মন্ত্রণালয় তদারকি করছেন। এ ছাড়া প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার তিনজন বিশেষ সহকারী রয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সূত্র জানিয়েছে, একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা কয়েকজন মন্ত্রী অতিরিক্ত কাজের চাপে স্বাভাবিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে হিমশিম খাচ্ছেন। তাই তাদের কিছু দায়িত্ব বর্তমান কিংবা নতুন সদস্যদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হতে পারে।
সম্ভাব্য এই রদবদলের আগে প্রায় এক মাস ধরে মন্ত্রীদের কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন করা হবে। এতে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অগ্রগতি, সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি ও মান, জনঅভিযোগ নিষ্পত্তি, প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়, সংসদে উপস্থিতি এবং রাজনৈতিক ভূমিকা বিবেচনায় নেওয়া হবে।
সূত্রগুলোর দাবি, এখন পর্যন্ত কোনো মন্ত্রীই এমন উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখাতে পারেননি, যা সরকারের বড় অর্জন হিসেবে তুলে ধরা যায়।
গত ১৮ ফেব্রুয়ারি প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেছিলেন, সরকারের প্রথম ছয় মাসের কর্মদক্ষতার ভিত্তিতেই মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের মূল্যায়ন করা হবে। কেউ দায়িত্ব পালনে অবহেলা করলে বা প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে তাকে বদলানো হতে পারে বলেও তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।
সরকারি সূত্রের দাবি, প্রধানমন্ত্রী নিজে প্রোটোকল ও সরকারি ব্যয় কমিয়ে জনআস্থা তৈরির চেষ্টা করলেও কয়েকজন মন্ত্রী তার সেই মানদণ্ড অনুসরণ করতে পারেননি।
তারেক রহমান তার মা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নামে কোনো প্রতিষ্ঠানের নামকরণের প্রস্তাব নাকচ করে দেন। পরে এক প্রতিমন্ত্রী নিজের নির্বাচনী এলাকার দুটি ইউনিয়নের নাম পরিবারের সদস্যদের নামে করার প্রস্তাব দিলে তা সমালোচনার মুখে পড়ে। প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে পরে সেই নাম পরিবর্তন করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী নিজের গাড়িবহর ১৩-১৪টি থেকে কমিয়ে চারটিতে এনেছেন। তিনি ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে চলেন এবং ঢাকায় চলাচলের সময় সড়ক বন্ধ করে ইউনিফর্ম পরা পুলিশ মোতায়েনের প্রচলিত ব্যবস্থাও বন্ধ করেছেন।
কিন্তু এরপরও এক মন্ত্রী তার নিরাপত্তা সহকারীকে দিয়ে ট্রাফিক পুলিশের কাছে আগে সিগন্যাল পার হওয়ার সুযোগ চেয়েছিলেন বলে সূত্র জানিয়েছে। বিষয়টি জানতে পেরে প্রধানমন্ত্রী ওই মন্ত্রীসহ অন্যদেরও এমন আচরণ থেকে বিরত থাকার কঠোর নির্দেশ দেন।
প্রধানমন্ত্রী সচিবালয়ে সময়ানুবর্তিতা ও শৃঙ্খলার ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি নিজে একদিন টানা ১১ ঘণ্টা কাজ করেছেন এবং ঈদের দীর্ঘ ছুটিতেও অফিস করেছেন। তবে তার মালয়েশিয়া ও চীন সফরের সময় অনেক মন্ত্রী ও কর্মকর্তা দেরিতে অফিসে আসেন। এতে প্রশ্ন উঠেছে, তাদের শৃঙ্খলাবোধ প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতির ওপরই নির্ভরশীল কি না।
সূত্রগুলোর মতে, কৃষি মন্ত্রণালয়ের ‘কৃষি কার্ড’ কর্মসূচির অগ্রগতি এবং বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী অসন্তুষ্ট। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী লোডশেডিং না থাকার দাবি করলেও পরে প্রধানমন্ত্রী নিজে খোঁজ নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাটের তথ্য পান।
এ ছাড়া সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়োগের অভিযোগ এবং প্রশাসনের বিভিন্ন পদে তুলনামূলক কম যোগ্য ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়েও প্রধানমন্ত্রী অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

