ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার: সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ও সেলিনা হোসেনকে আজীবন সম্মাননা

বাংলা সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের ‘ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার’ পেয়েছেন ছয় লেখক।

লেখক, গবেষক ও প্রাবন্ধিক অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ও কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনকে দেওয়া হয়েছে আজীবন সম্মাননা।

শুক্রবার ঢাকার প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিজয়ীদের নাম ঘোষণা ও পুরস্কার বিতরণ করা হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থনীতিবিদ ও অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। তিনি বলেন, সরকারি-বেসরকারি সব সাহিত্য পুরস্কারের মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

এর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘এখানে কোনো দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কাজ করেনি। তারা মূল্যায়ন করে যাকে পুরস্কৃত করা দরকার, তাদেরকেই করেছেন। এখানেই এর সার্থকতা।’

শিল্প-সাহিত্যে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, এর নামে যেন সংকীর্ণ দলীয়করণ না হয়।

‘বিভাজন যেন আমাদের সাহিত্যজগতে, সৃষ্টিশীল জগতে না আসে,’ বলেন তিনি। বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় চিন্তার স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন সাবেক এই উপদেষ্টা।

সাহিত্যচর্চা খুব লাভজনক পেশা নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, সৃজনশীলতার তাগিদেই মানুষ সাহিত্যচর্চা করেন। তবে তাদের ন্যূনতম স্বীকৃতি দেওয়া প্রয়োজন। এই পুরস্কার সেই স্বীকৃতি দানেরই একটা বিষয়।

তরুণ লেখকদের বেছে নিয়ে পুরস্কৃত করার উদ্যোগকেও উৎসাহব্যঞ্জক বলে উল্লেখ করেন ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ।

২০২৪ সালের পুরস্কারে প্রবন্ধ, আত্মজীবনী, ভ্রমণ ও অনুবাদ শ্রেণিতে ‘বিদ্যাসাগর বঙ্কিমচন্দ্র রবীন্দ্রনাথ ও মুসলমান সমাজ’ বইয়ের জন্য আবুল আহসান চৌধুরী, কবিতা ও কথাসাহিত্য শ্রেণিতে ‘সময় বহিয়া গেল’ বইয়ের জন্য আনোয়ারা সৈয়দ হক এবং তরুণ সাহিত্যিক শ্রেণিতে ‘জলমাকড়ের নৌকাবাইচ’ বইয়ের জন্য নিজাম বিশ্বাস পুরস্কার পেয়েছেন।

২০২৫ সালের পুরস্কারে প্রবন্ধ, আত্মজীবনী, ভ্রমণ ও অনুবাদ শ্রেণিতে ‘পালকের চিহ্নগুলো’ বইয়ের জন্য নাসরীন জাহান, কবিতা ও কথাসাহিত্য শ্রেণিতে ‘মানচিত্র’ বইয়ের জন্য শাহীন আখতার এবং তরুণ সাহিত্যিক শ্রেণিতে ‘সায়ানাইড ফুল’ বইয়ের জন্য মাহবুব ময়ূখ রিশাদ বিজয়ী হয়েছেন।

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীকে ২০২৪ সালের জন্য এবং সেলিনা হোসেনকে ২০২৫ সালের জন্য আজীবন সম্মাননা দেওয়া হয়েছে।

প্রত্যেক বিজয়ীর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্র। আজীবন সম্মাননাপ্রাপ্তরা পাঁচ লাখ টাকা করে পেয়েছেন। প্রবন্ধ, আত্মজীবনী, ভ্রমণ ও অনুবাদ এবং কবিতা ও কথাসাহিত্য শ্রেণির বিজয়ীরা তিন লাখ টাকা করে, আর তরুণ সাহিত্যিক শ্রেণির বিজয়ী দুই লাখ টাকা পেয়েছেন।

আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, তিনটি শ্রেণিতে ২০২৪ সালের পুরস্কারের জন্য ৪৬০টি এবং ২০২৫ সালের জন্য ৫১০টি বই জমা পড়ে। সাহিত্যিক বেগম আখতার কামাল, গবেষক ও প্রাবন্ধিক ফয়জুল লতিফ চৌধুরী, কবি আবিদ আনোয়ার এবং প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক খালিকুজ্জামান ইলিয়াসের সমন্বয়ে গঠিত জুরি বোর্ড বইগুলো থেকে বিজয়ীদের নির্বাচন করে।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন হা-মীম গ্রুপ ও টাইমস মিডিয়া লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে আজাদ, ব্র্যাক ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান ফারুক মঈনউদ্দীন আহমেদ ও অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ আব্দুল মোমেন এবং দৈনিক সমকালের সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী। সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনের বিশিষ্টজনরাও অনুষ্ঠানে যোগ দেন।

ব্র্যাক ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান ফারুক মঈনউদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘লেখক এবং পাঠকদের সাহিত্যের প্রতি আরও আগ্রহী করে তুলতে, আমাদের এই পুরস্কার সমাজে একটি অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠেছে। আমরা বুঝতে পারছি যে এর সঙ্গে সঙ্গে আমাদের আরও কিছু করার দায়িত্ব বেড়ে গেছে। এ পুরস্কারের মাধ্যমে আমরা দেশের মানুষের মেধা, মননশীলতা ও সৃষ্টিশীলতা বিকাশে কাজ করতে চাই।’

ব্র্যাক ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও এসএমই ব্যাংকিং বিভাগের প্রধান সৈয়দ আব্দুল মোমেন বলেন, এ আয়োজন প্রতিভাবান তরুণ লেখকদের সৃজনশীল কাজের প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠেছে। এর সঙ্গে যুক্ত থাকতে পেরে তারা গর্বিত।

সমকাল সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী বলেন, ‘সমকাল বরাবরই দেশীয় সংস্কৃতি ও সাহিত্যচর্চাকে উৎসাহিত করে এসেছে। আমরা মনে করি ভালো সাংবাদিকতার চর্চায় সাহিত্য ও সংস্কৃতি বড় ভূমিকা রাখে। সমকাল সবসময় সংস্কৃতিকে গুরুত্ব দিয়ে সাংবাদিকতাকে এগিয়ে নেবে।’

হা-মীম গ্রুপ ও টাইমস মিডিয়া লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে আজাদ বলেন, সাহিত্য পুরস্কার আয়োজন শুধু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়, সামাজিক দায়বদ্ধতারও অংশ। ভবিষ্যতেও এ উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে এবং সবার সহযোগিতায় আরও বিস্তৃত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

Related Articles

Latest Posts