বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ সর্বনিম্নে, কী বার্তা যাচ্ছে অর্থনীতিতে?

চলতি বছরের মার্চে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে নেমে এসেছে, যা এ খাতের জন্য রেকর্ড সর্বনিম্ন। এ বছরের জাতীয় নির্বাচনের পর আগামী পাঁচ বছরের জন্য নতুন সরকার গঠিত হয়। অনেকেই ভেবেছিলেন, এই নির্বাচনের পর বেসরকারি বিনিয়োগের খরা কেটে যাবে।

অথচ তখনই বেসরকারি খাতে ঋণের এই নিম্নমুখী প্রবণতার তথ্য সামনে এলো। আর এই তথ্য যেন সেই প্রত্যাশাকে ম্লান করে দিয়েছে। বরং, এখন ভাবার সময় হয়েছে, সমস্যাটা আসলে কোথায়?

এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর হলো—ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ। এই যুদ্ধের কারণে ইরান গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ ‘স্ট্রেইট অব হরমুজ’ (হরমুজ প্রণালী) বন্ধ করে দিয়েছে এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে এই যুদ্ধের প্রভাবে তেল, গ্যাস, সারসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীরা বিপাকে পড়েন।

অনেক বিনিয়োগকারী বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি ও আমদানি-নির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যুদ্ধের সম্ভাব্য প্রভাবের কথা চিন্তা করে হাত গুটিয়ে নিয়েছেন। বিশেষত যারা নির্বাচনের পর নতুন করে ব্যবসা শুরু করার পরিকল্পনা করেছিলেন।

জানতে চাইলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি তাসকিন আহমেদ বলেন, ‘এমন অস্থিতিশীল পরিবেশে কেউই বিনিয়োগ করতে চাই না।’

‘করোনা মহামারির পর থেকে তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক চাপের কারণে বিনিয়োগকারীরা হতাশ হয়ে আছেন, আর বেসরকারি খাতে ঋণের এই রেকর্ড নিম্ন প্রবৃদ্ধি মূলত তারই প্রতিফলন। গত কয়েক বছর ধরে বিনিয়োগকারীরা যেসব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন, তার মধ্যে আছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, চরম জ্বালানি সংকট, ক্রমাগত মূল্যস্ফীতি এবং ব্যাংক ঋণের ক্রমবর্ধমান সুদের হার অন্যতম,’ বলেন তিনি।

তাসকিন আহমেদ আরও বলেন, চলমান যুদ্ধ উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাবই হচ্ছে ঋণের এই নিম্নমুখী প্রবৃদ্ধি।

ব্যাংক এশিয়া পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহেল আর কে হোসেন বলেন, অনেক বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। বিনিয়োগকারীরা আশঙ্কা করছেন, স্থানীয় মুদ্রার (টাকা) আরও অবমূল্যায়ন হতে পারে। কারণ বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যে বেশ কয়েকটি দেশ মার্কিন ডলারের বিপরীতে তাদের নিজস্ব মুদ্রার অবমূল্যায়ন করেছে।

তিনি আরও জানান, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার গত সাত-আট বছরে কিছু বড় ঋণগ্রহীতাকে অতিরিক্ত ঋণ দেওয়া দিয়েছিল। ফলে বাজার এখন নিজেই নিজেকে সংশোধন (কারেকশন) করছে এবং ঋণের চাহিদাও কমে গেছে।

ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন বলেন, ঋণের প্রবাহ কমে যাওয়া বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের জন্য মোটেও ভালো লক্ষণ নয়।

তিনি জানান, এর একটি অন্যতম প্রধান কারণ হলো সুদের হারের ঊর্ধ্বগতি, যা কেবল নতুন ঋণের জন্যই নয়, বরং বিদ্যমান ঋণের ক্ষেত্রেও ঋণের ব্যয় অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। এছাড়া ব্যাংকগুলোও এখন বাণিজ্যিক ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে অনীহা দেখাচ্ছে। বিপরীতে অনেক ব্যাংক নিরাপদ মুনাফার আশায় সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ করে মোটা অঙ্কের টাকা আয় করছে।

মীর নাসির হোসেনের মতে, বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির এই সর্বশেষ তথ্য কোনো ভালো লক্ষণ নয়।

‘এটি সত্যিই অত্যন্ত উদ্বেগজনক,’ বলেন তিনি।

রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাকও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

তার মতে, বেসরকারি খাতের এই দুর্বল ঋণ প্রবৃদ্ধি মূলত বেসরকারি বিনিয়োগ সংকটের একটি বড় সতর্কবার্তা।

তিনি বলেন, ‘এটি বেশ কিছু পরিস্থিতিকে সামনে আনছে। যেমন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ব্যবসা বাড়াতে আগ্রহী নয়, ব্যাংকগুলো ঋণ ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষেত্রে ক্রমেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে অথবা অনিচ্ছা দেখাচ্ছে, ঋণ নেওয়ার খরচ এখনো চড়া, সরকারের ঋণ নেওয়ার প্রবণতা আর্থিক খাতকে সংকুচিত করছে। এছাড়া জ্বালানি, মূল্যস্ফীতি, বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও মুদ্রা বিনিময় হার নিয়ে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তগুলোর ওপর ক্রমাগত নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।’

তার মতে খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বগতি, প্রভিশন রাখার চাপ, মূলধন ঘাটতি, আমানতকারীদের আস্থাহীনতা ও তারল্য সংকট ইত্যাদি কারণে ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমেছে। একই সঙ্গে, ঋণগ্রহীতাদের মান বা যোগ্যতা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ দেওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে।

‘প্রকৃতপক্ষে, ব্যাংকিং ব্যবস্থা এখন অনেক বেশি রক্ষণাত্মক হয়ে উঠছে। তারা নতুন বিনিয়োগে সহায়তা করার চেয়ে নিজেদের ব্যালেন্স শিট (আর্থিক হিসাবের ভারসাম্য) সুরক্ষাকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে,’ বলেন তিনি।

আব্দুর রাজ্জাকও বলেন, সামগ্রিক পরিস্থিতি বেশ অস্বাভাবিক। কারণ বাংলাদেশ বর্তমানে ঋণের চাহিদার ঘাটতি এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ঋণ জোগানের ক্ষেত্রে অনীহা, উভয় সংকটেরই মুখোমুখি হচ্ছে।

‘এই দ্বিমুখী সংকটের কারণে অর্থনীতি ‘নিম্ন-ভারসাম্যের ফাঁদে’ পড়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। আস্থা কম থাকায় প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগ করছে না, ঝুঁকি বেশি হওয়ায় ব্যাংকগুলো ঋণ দিচ্ছে না, আবার বিনিয়োগ ও আমদানি সংকুচিত হওয়ায় উৎপাদনও স্থবির হয়ে আছে। আর এই ধীরগতির অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নতুন ঋণের যৌক্তিকতাকে আরও দুর্বল করে দিচ্ছে। এই চক্রটি ভাঙতে হলে ঋণ লক্ষ্যমাত্রায় সামান্য কিছু পরিবর্তনের চেয়েও বড় ধরনের পদক্ষেপের প্রয়োজন হবে,’ মন্তব্য করেন তিনি।

অবশ্য, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের মহাপরিচালক মো. এজাজুল ইসলাম বলেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসায় এপ্রিল-মে থেকে ঋণের চাহিদা আবার বাড়তে শুরু করবে।

‘মনে হচ্ছে এই মন্দা দশা সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, এখন থেকে পরিস্থিতির উন্নতি হবে,’ তিনি বলেন।

তবে আব্দুর রাজ্জাক মনে করেন, ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে সরকারের অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার ক্ষতিকর প্রভাবগুলো যদি সরকার স্বীকার না করে, তবে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির পুনরুদ্ধার কঠিনই থেকে যাবে।

‘সরকারি ঋণ যখন ব্যাংকগুলোকে আরও নিরাপদ এবং সহজ আয়ের সুযোগ করে দেয়, তখন বেসরকারি খাত বা প্রতিষ্ঠানগুলো আরও বেশি প্রান্তিক বা কোণঠাসা হয়ে পড়ে। তাই ঋণের প্রবৃদ্ধি ফিরিয়ে আনতে শুধু কম মূল্যস্ফীতি  ও স্থিতিশীল মুদ্রা বিনিময় হার যথেষ্ট নয়, বরং এর জন্য প্রয়োজন ব্যাংকিং খাতের নির্ভরযোগ্য সংস্কার, সুশৃঙ্খল সরকারি ঋণ ব্যবস্থা, আস্থার উন্নয়ন। এছাড়া একটি স্পষ্ট নীতিগত বার্তা দরকার যে, উৎপাদনশীল বেসরকারি বিনিয়োগকেই আবার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হবে,’ বলেন তিনি।

তিনি বলেন, সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের আওতায় স্বল্প সুদে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতে ঋণের প্রবাহ বাড়ানো।

চলমান আইনি সংস্কারগুলো বিনিয়োগ পরিবেশের আরও উন্নতিতে সহায়তা করতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

Related Articles

Latest Posts