বন্যায় রংপুর অঞ্চলে ৪৫০ হেক্টর জমির ফসলের ক্ষতি

সম্প্রতি বন্যায় রংপুর অঞ্চলের পাঁচ জেলা—লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর, নীলফামারী ও গাইবান্ধার নদীতীরবর্তী ও চরাঞ্চলের অন্তত ৪৫০ হেক্টর জমির বিভিন্ন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে চরাঞ্চলের বাদাম চাষে। পাশাপাশি আমন ধানের বীজতলা, ভুট্টা ও বিভিন্ন ধরনের সবজিরও উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে কুড়িগ্রামে। জেলার তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, ধরলা ও দুধকুমার নদীসংলগ্ন এলাকায় ২৫০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এছাড়া, লালমনিরহাটে ৯০ হেক্টর, রংপুরে ৪৫ হেক্টর, গাইবান্ধায় ৩৫ হেক্টর ও নীলফামারীতে ৩০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতির মুখে পড়েছে।

কৃষকদের ভাষ্য, বন্যার কারণে অনেক খেতে পরিপক্ব হওয়ার আগেই ফসল তুলতে হয়েছে। আবার কোথাও কয়েক দিন পানির নিচে তলিয়ে থাকায় ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। এতে উৎপাদন যেমন কমেছে, তেমনি লোকসানের আশঙ্কাও বেড়েছে।

তিস্তার চরে আট বিঘা জমিতে বাদামের আবাদ করেছিলেন কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার বুড়িরহাট এলাকার কৃষক নওশেদ আলী (৬৫)। তিনি জানান, বন্যায় প্রায় দুই বিঘা জমির বাদাম পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। বাকি ছয় বিঘার বাদাম তুলতে পারলেও ফলন আশানুরূপ হয়নি।

নওশেদ আলী বলেন, ‘আমার মতো শতাধিক কৃষক চরে বাদাম চাষ করেছিলেন। সবার বাদামখেতই বন্যার পানিতে তলিয়ে যায়। কয়েক দিন পরে বন্যা হলে বাদাম পরিপক্ব হয়ে যেত, তখন এত ক্ষতি হতো না।’

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার সারডোব গ্রামের কৃষক আমজাদ হোসেন (৬০) বলেন, ‘১২ শতাংশ জমিতে আমন ধানের বীজতলা তৈরি করেছিলাম। বন্যার পানিতে প্রায় ৭০ শতাংশ চারা নষ্ট হয়ে গেছে। এখন নতুন করে বীজতলা তৈরির কাজ শুরু করতে হয়েছে।’

রাজিবপুর উপজেলার কোদালকাটি এলাকার কৃষক আজিজুল ইসলাম (৫৫) জানান, তার ছয় বিঘা ভুট্টাখেতের মধ্যে এক বিঘার ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি এক বিঘা সবজিখেতের প্রায় ৬০ শতাংশ নষ্ট হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘খেত থেকে পানি নেমে গেছে। ২৫ শতাংশ জমির আমনের বীজতলাও পানির নিচে ছিল, তবে সেটার ক্ষতি তুলনামূলক কম হয়েছে।’

নাগেশ্বরী উপজেলার বামনডাঙ্গা এলাকার কৃষক জহির উদ্দিন (৫০) জানান, দুধকুমার নদীর তীররক্ষা বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় নদীর পানি তাদের এলাকায় ঢুকে চার দিন ধরে ফসলি জমি প্লাবিত করে রাখে।

জহির বলেন, ‘এখন মাঠে তেমন ফসল নেই। তবে আমনের বীজতলা আর সবজির সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। পানি নেমে যাওয়ার পর দেখা গেছে, খেতের কোনো শাক-সবজিই আর বাঁচেনি। আমাদের গ্রামের প্রায় সব কৃষকই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।’

লালমনিরহাট সদর উপজেলার চর কালমাটি এলাকার কৃষক বক্তার আলী (৬০) জানান, তার ১০ শতাংশ আমন ধানের বীজতলা, দুই বিঘা ভুট্টাখেত ও ২০ শতাংশ জমির শাক সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে।

বক্তার বলেন, ‘মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে তিস্তার পানি পুরো খেত ডুবিয়ে দেয়। আবার সেই পানি নামতে তিন থেকে চার দিন সময় লাগে। এতদিন পানির নিচে থাকায় ফসল আর টেকেনি।’

রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার চর মধুপুর এলাকার কৃষক সুধান চন্দ্র দাস (৬৫) বলেন, ‘এবার চরাঞ্চলে বাদামের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। আকস্মিক বন্যার কারণে পরিপক্ব হওয়ার আগেই বাদাম তুলতে হয়েছে।’

‘আর ১০-১২ দিন সময় পেলে বাদাম পুরোপুরি পরিপক্ব হতো। তখন বাম্পার ফলন পাওয়া যেত। আমার সাত বিঘা জমির মধ্যে এক বিঘার বাদাম পুরোপুরি নষ্ট হয়েছে। বাকি জমিতে ফলন হয়েছে অর্ধেকেরও কম,’ যোগ করেন এ কৃষক।

কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘বন্যার আগে মাঠে তেমন কোনো প্রধান ফসল ছিল না। চরাঞ্চলে বাদাম এবং নদীতীরবর্তী এলাকায় আমন ধানের বীজতলা, কিছু সবজি ও ভুট্টা ছিল। পানি দ্রুত নেমে যাওয়ায় বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো গেলেও বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে দুধকুমার নদীসংলগ্ন এলাকার কৃষকরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।’

তিনি আরও জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। তাদের সরকারি সহায়তা দেওয়ার সুপারিশ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে।

Related Articles

Latest Posts