ফুটবল বিশ্বকাপের এত বছরের পথচলায় ঐতিহাসিক স্টেডিয়ামের সংখ্যা কম নয়। ব্রাজিলের মারাকানা, ইংল্যান্ডের ওয়েম্বলি কিংবা আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসির আরাধ্য বিশ্বকাপ জয়ের মঞ্চ কাতারের লুসাইল স্টেডিয়াম— প্রতিটি স্টেডিয়ামই নামেভারে অনন্য। তবে মেক্সিকোর অ্যাজতেকা স্টেডিয়াম এমন কিছু মুহূর্তের সাক্ষী, যা অন্য সব বাঘা বাঘা স্টেডিয়ামেরও নেই। বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম ‘আইকনিক’ এই অ্যাজতেকাতেই বৃহস্পতিবার রাতে শুরু হচ্ছে বহুল আকাঙ্ক্ষিত ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ।
মেক্সিকো-দক্ষিণ আফ্রিকার ম্যাচ আয়োজনের মধ্য দিয়ে নতুন করে ইতিহাসের পাতায় নাম লেখাতে যাচ্ছে অ্যাজতেকা। একমাত্র স্টেডিয়াম হিসেবে তিনটি ভিন্ন বিশ্বকাপে ম্যাচ আয়োজনের নজির গড়ার জন্য প্রস্তুত দেশটির সবচেয়ে বিখ্যাত এই স্টেডিয়াম। এর আগে ১৯৭০ ও ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপের ম্যাচ আয়োজিত হয়েছিল এখানে।
তবে তিনটি বিশ্বকাপের ম্যাচ অনুষ্ঠিত হওয়ার চেয়েও অ্যাজতেকার ঐতিহাসিক গুরুত্ব অন্য জায়গায়। কোনো রকম তর্ক-বিতর্ক ছাড়া ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে জনপ্রিয় দুই ‘মহাতারকা’ হওয়ার যাত্রায় এই স্টেডিয়ামই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। পেলে ও দিয়েগো ম্যারাডোনা দুজনকেই বিশ্বকাপের স্বাদ পাওয়ানো দুনিয়ার একমাত্র স্টেডিয়াম অ্যাজতেকাই!
নিজের চার বিশ্বকাপের মধ্যে শেষটি ১৯৭০ সালে মেক্সিকোতেই খেলেছিলেন ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি পেলে। ততদিনে দুটি বিশ্বকাপ জেতা হয়ে গেছে তার। তবে সেই বিশ্বকাপে পেলেসহ গোটা ব্রাজিল দল যে মোহনীয় ফুটবল খেলেছিল, তা এখনো বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম চর্চিত বিষয়। ওই বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় হয়ে নিজে জিতেছিলেন ‘গোল্ডেন বল’, আর অ্যাজতেকা স্টেডিয়ামের ফাইনালে ইতালিকে ৪-১ গোলে হারিয়ে ব্রাজিল জিতেছিল প্রথম দল হিসেবে তৃতীয় বিশ্বকাপ। অ্যাজতেকা তাই পেলের শেষ বিশ্বকাপ জয়ের গর্বিত সাক্ষী।
ভেন্যু হিসেবে নিজের দ্বিতীয় বিশ্বকাপে অ্যাজতেকা বিশ্বজয়ের মুকুট তুলে দিয়েছিল আরেক লাতিন মহাতারকা আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি ম্যারাডোনার মাথায়। নাম, যশ, বৈভব— ম্যারাডোনার তখন কোনো কিছুর অভাব নেই। সময়ের সেরা থেকে ইতিহাসের সেরা হওয়ার পথে ব্যবধান শুধু একটি বিশ্বকাপ ট্রফির। ম্যারাডোনার সেই আক্ষেপ পূরণ করেছিল অ্যাজতেকা। ঘটনাবহুল সেই বিশ্বকাপের ফাইনালে পশ্চিম জার্মানিকে ৩-২ গোলে হারিয়ে পরম আরাধ্য ট্রফি জিতেছিলেন তিনি।
প্রথম আয়োজনে পেলেকে বিশ্বকাপ জিততে দেখা, দ্বিতীয় বিশ্বকাপে ম্যারাডোনাকে— অ্যাজতেকার মতো এমন রঙিন ইতিহাস আর কোন বিশ্বকাপ ভেন্যুর আছে!
অ্যাজতেকার সাথে অবশ্য ম্যারাডোনার আরেকটি অবিচ্ছেদ্য স্মৃতি আছে। ‘মোমেন্ট অব দ্য ওয়ার্ল্ড কাপ’ বিবেচনায় যেটি হয়তো তার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মুহূর্তের থেকেও বেশি আলোচিত। নিয়মিত ফুটবল দর্শক হয়ে থাকলে এতক্ষণে বুঝে যাওয়ার কথা, ১৯৮৬ বিশ্বকাপের সেই বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ও ম্যারাডোনা ঘটিয়েছিলেন এই অ্যাজতেকাতেই!
ম্যাচের ৫৫তম মিনিটে লাফিয়ে উঠেও হেড করতে না পারায় বাঁ হাত দিয়েই ইংলিশ গোলরক্ষক পিটার শিলটনকে পরাস্ত করেছিলেন ম্যারাডোনা, পরবর্তীতে যা ‘হ্যান্ড অব গড’ হিসেবেই সবার মুখে মুখে পরিচিতি পেয়েছে।
এখানেই শেষ নয়, এরপর ওই একই ম্যাচে ইংল্যান্ডের প্রায় গোটা দলকে নাচিয়ে তর্কসাপেক্ষে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর ও একক নৈপুণ্যসমৃদ্ধ গোলটি করেছিলেন তিনি।
এতকিছুর মধ্যে যেকোনো একটি ঐতিহাসিক মুহূর্তকে নিজের করে নিলে যেখানে গর্ব বোধ করত যেকোনো স্টেডিয়াম বা শহর, সেখানে অ্যাজতেকার একার ঝুলিতেই আছে এত সব মনে রাখার মতো স্মৃতি।
নিজের তৃতীয় বিশ্বকাপে দর্শকদের জন্য কোন স্মরণীয় মুহূর্ত নিয়ে অপেক্ষা করছে এই স্টেডিয়াম? দেখাই যাক না, আর তো মাত্র কয়েক ঘণ্টার অপেক্ষা!

