নাবিক হত্যায় ক্ষোভে ফুঁসছে ভারত, ট্রাম্প-মোদির বন্ধুত্ব টিকবে?

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের নতুন অধ্যায় শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তা নয়, আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে ওমান উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে ভারতীয় নাবিকদের নিহতের ঘটনা ওয়াশিংটন-নয়াদিল্লি সম্পর্কের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে।

আল জাজিরা ও সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক সপ্তাহে মার্কিন হামলায় অন্তত তিনজন ভারতীয় নাবিক নিহত এবং আরও কয়েক ডজন নাবিক বিপদের মুখে পড়েছেন। ফলে ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গন, নাবিক সংগঠন এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।

প্রশ্ন উঠছে—ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নরেন্দ্র মোদির বহু আলোচিত ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা কি এই সংকট সামাল দিতে পারবে, নাকি দুই দেশের সম্পর্কে নতুন ফাটল তৈরি হবে?

হরমুজে নতুন সংকট

বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথগুলোর একটি হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনার জেরে এই অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি এবং ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়েছে।

গত চার দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে, যেগুলোতে ভারতীয় নাবিকরা কর্মরত ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, জাহাজগুলো ইরানি তেল পরিবহন করে ওয়াশিংটনের আরোপিত অবরোধ ভঙ্গ করছিল।

সবচেয়ে আলোচিত হামলাটি ঘটে পালাউয়ের পতাকাবাহী তেলবাহী জাহাজ এমটি সেট্টেবেলোতে। মার্কিন বাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় জাহাজটির ইঞ্জিন কক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তিন ভারতীয় নাবিক নিহত হন।

এর আগের দিন এমটি মারিভেক্স নামের আরেকটি জাহাজেও হামলা চালানো হয়। ওই জাহাজে থাকা ২৪ জন ভারতীয় নাবিককে পরে উদ্ধার করা হয়। এরপর তৃতীয় জাহাজ এমটি জলভীরের ইঞ্জিন কক্ষেও হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী।

ভারতীয় নাবিক সংগঠনগুলোর অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে এসব জাহাজ আটক করতে পারত। কিন্তু সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে নাবিকদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলা হয়েছে।

ক্ষোভে ফুঁসছে ভারত

এসব ঘটনায় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে ওয়াশিংটনে কূটনৈতিক প্রতিবাদ জানিয়েছে। নয়াদিল্লিতে মার্কিন দূতাবাসের শীর্ষ কর্মকর্তাকে তলব করে উদ্বেগও প্রকাশ করেছে ভারত সরকার।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘এই ধরনের হামলা বন্ধ হওয়া উচিত। আমরা চাই সংলাপ ও কূটনীতির মাধ্যমে দ্রুত এই অঞ্চলে শান্তি ফিরুক।’

কিন্তু সরকারি বক্তব্যের চেয়েও তীব্র প্রতিক্রিয়া এসেছে শ্রমিক সংগঠন ও বিরোধী দলগুলোর কাছ থেকে।

ভারতের বৃহৎ শ্রমিক সংগঠন সেন্টার অব ইন্ডিয়ান ট্রেড ইউনিয়নস (সিটু) বলেছে, আন্তর্জাতিক জলসীমায় বিদেশি সামরিক বাহিনীর হাতে ভারতীয় শ্রমিক নিহত হলে ভারত সরকারকে উচ্চকণ্ঠে প্রতিবাদ জানাতে হবে।

অন্যদিকে কংগ্রেস অভিযোগ করেছে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ককে দীর্ঘদিন ধরে কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা মোদি সরকার এখন ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে।

ভারতীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক কান্তি বাজপেয়ীর মতে, বিষয়টি ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্কের একটি ‘বিরক্তিকর ও সংবেদনশীল ইস্যু’ হয়ে উঠেছে। আরও হতাহতের ঘটনা ঘটলে এবং জনমতের চাপ বাড়লে মোদি সরকারের পক্ষে বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।

কেন ভারতীয় নাবিকেরাই বেশি ঝুঁকিতে?

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ নাবিক সরবরাহকারী দেশ ভারত। দেশটির প্রায় তিন লাখ নাবিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজে কাজ করেন।

বিশ্বব্যাপী তেলবাহী জাহাজ, কনটেইনার জাহাজ ও বাণিজ্যিক নৌবহরে ভারতীয় নাবিকদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য। ফলে মধ্যপ্রাচ্য, লোহিত সাগর বা হরমুজের মতো সংঘাতপূর্ণ এলাকায় উত্তেজনা বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে ভারতীয়দের ওপর।

ফরোয়ার্ড সিমেনস ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়ার সাধারণ সম্পাদক মনোজ যাদবের মতে, সাম্প্রতিক হামলাগুলো ভারতীয় নাবিকদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে। অনেকেই এখন উপসাগরীয় অঞ্চলে কাজ করতে ভয় পাচ্ছেন।

তার ভাষায়, ‘মানুষ যেন জীবন্ত লক্ষ্যবস্তু হয়ে অপেক্ষা করছে। কেউ জানে না কখন পরবর্তী হামলা হবে।’

আন্তর্জাতিক আইন কী বলে?

এসব ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন।

হরমুজ প্রণালি ওমান ও ইরানের আঞ্চলিক জলসীমার মধ্যে হলেও আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইনের আওতায় সব দেশের জাহাজ চলাচলের অধিকার রয়েছে।

জাতিসংঘের সমুদ্র আইন সনদ (আনক্লস) অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের ‘ট্রানজিট প্যাসেজ’ বা অবাধ যাতায়াতের অধিকার রয়েছে। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন বেসামরিক জাহাজকে ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু করার বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেয়।

লন্ডনের সিটি সেন্ট জর্জস বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক আইন বিশেষজ্ঞ জেসন চুয়া মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ আইনি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

তার মতে, যুদ্ধাবস্থায় অবরোধ কার্যকর করার অধিকার থাকলেও কোনো বাণিজ্যিক জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে নাবিক হত্যা করা ‘সমানুপাতিক প্রতিক্রিয়া’ কি না, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।

বিশেষ করে জাহাজগুলোতে অস্ত্র ছিল না এবং সেগুলো কোনো যুদ্ধজাহাজও ছিল না।

ট্রাম্প-মোদির বন্ধুত্বের কঠিন পরীক্ষা

গত এক দশকে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে দুই দেশের সরকারই কৌশলগত অংশীদারত্বের নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার কথা বলেছে। ‘হাউডি মোদি’, ‘নমস্তে ট্রাম্প’—এ ধরনের জমকালো আয়োজন দুই নেতার ব্যক্তিগত রসায়নের প্রতীক হয়ে উঠেছিল।

কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার পর ট্রাম্পের সঙ্গে নয়াদিল্লির সম্পর্ক আর আগের মতো মসৃণ নেই।

প্রথমত, ট্রাম্প সম্প্রতি দাবি করেন যে তিনি ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা নিরসনে মধ্যস্থতা করেছেন। তবে ভারত ঐতিহ্যগতভাবে কাশ্মীর ইস্যুতে তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতার বিরোধী। ফলে এই মন্তব্য নয়াদিল্লিতে অস্বস্তি তৈরি করে।

দ্বিতীয়ত, ভারতীয় পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক আরোপ দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কে চাপ সৃষ্টি করেছে।

তৃতীয়ত, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগও ভারতের কৌশলগত মহলে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

এই প্রেক্ষাপটে ভারতীয় নাবিকদের নিহতের ঘটনা নতুন একটি সংকট হিসেবে সামনে এসেছে।

মোদির সামনে দ্বৈত চ্যালেঞ্জ

নরেন্দ্র মোদির জন্য চলমান পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল।

একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার। চীনের উত্থান মোকাবিলা, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং প্রযুক্তিগত অংশীদারত্বের কারণে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে জনমত, নিহত নাবিকদের পরিবার এবং বিরোধী দলগুলোর চাপও উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।

নিহত এক নাবিকের বাবা রাজেশ শর্মা ভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, তিনি শুধু জানতে চান শেষ মুহূর্তে তার ছেলের কী ঘটেছিল এবং তাকে উদ্ধারের কোনো চেষ্টা করা হয়েছিল কি না।

আরেক নিহত নাবিকের বাবা রামজি চৌরাসিয়া জানান, হামলার মাত্র একদিন আগে ছেলের সঙ্গে তার কথা হয়েছিল। তখন সবকিছু স্বাভাবিক ছিল বলে জানিয়েছিল ছেলে।

এসব মানবিক বিয়োগগাঁথা ভারতের জনগণের মধ্যে ঘটনাটিকে আরও আবেগপূর্ণ করে তুলছে।

সামনে কী?

আগামী সপ্তাহে ফ্রান্সে জি-৭ সম্মেলনের ফাঁকে ট্রাম্প ও মোদির বৈঠকের কথা রয়েছে। ফলে ভারতীয় নাবিকদের নিহতের বিষয়টি ওই বৈঠকের অন্যতম আলোচ্য হয়ে উঠতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ করে বা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রতি সমবেদনা জানায়, তাহলে উত্তেজনা কিছুটা কমতে পারে। তবে হামলা অব্যাহত থাকলে এবং আরও ভারতীয় হতাহতের ঘটনা ঘটলে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে উঠবে।

হরমুজ প্রণালির সংঘাত এখন আর শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বিরোধ নয়। এটি ভারতীয় নাবিকদের জীবন, আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ভবিষ্যতের সঙ্গেও জড়িয়ে গেছে।

ট্রাম্প ও মোদির ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব বহুবার আলোচিত হয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ব্যক্তিগত সম্পর্কের চেয়ে জাতীয় স্বার্থই শেষ পর্যন্ত বড় হয়ে ওঠে। হরমুজে নিহত ভারতীয় নাবিকদের ঘটনা সেই বাস্তবতাকেই আবারও সামনে এনে দিয়েছে।

Related Articles

Latest Posts