উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ছাড়া সরকারি ব্যয় মূল্যস্ফীতি বাড়াতে পারে: সিপিডি

আগামী অর্থবছরের জন্য সরকারের উচ্চাভিলাষী ব্যয় পরিকল্পনা উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করতে না পারলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়াতে পারে বলে মন্তব্য করেছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।

আজ শুক্রবার সকালে রাজধানীর গুলশানে হোটেল লেকশোরে ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: সিপিডির পর্যালোচনা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন এ মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, সরকারি ব্যয়ের ফলে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও উৎপাদন না বাড়লে সরকারের নির্ধারিত ৭ দশমিক ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কঠিন হবে।

ফাহমিদা খাতুন বলেন, এটি একটি বড় বাজেট। সরকারি ব্যয় বাড়বে। কিন্তু সেই ব্যয় যদি উৎপাদনশীলতা না বাড়ায়, তাহলে তা মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে আগামী অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করেন।

প্রস্তাবিত বাজেটের আকার গত অর্থবছরের তুলনায় ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি। আগামী বছরে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।

মে মাস পর্যন্ত ১২ মাসের গড় হিসেবে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৬ শতাংশ। আর পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট হিসেবে ৯ দশমিক ৪ শতাংশ। যা এখনো উচ্চ মূল্যচাপের ইঙ্গিত দেয়।

সিপিডির মতে, দেশের মূল্যস্ফীতি মূলত সরবরাহজনিত, যা শুধু মুদ্রানীতি কঠোর করে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।

গবেষণা সংস্থাটি বলেছে, অবকাঠামো উন্নয়ন, ব্যবসা খাতে সহায়তা, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং উৎপাদন সম্প্রসারণের মাধ্যমে বাড়তি সরকারি ব্যয়কে অর্থনীতিতে উৎপাদনক্ষমতা সৃষ্টি করতে হবে।

ফাহমিদা খাতুন বলেন, ব্যয়ের মাধ্যমে যদি উৎপাদনশীলতা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ে, তাহলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা টেকসইভাবে উন্নত হবে। অন্যথায় অতিরিক্ত ব্যয় কেবল মূল্যস্ফীতির চাপই বাড়াতে পারে। এ প্রেক্ষাপটে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনতে রাজস্ব, মুদ্রা ও সরবরাহব্যবস্থা সংশ্লিষ্ট সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।

সিপিডির মতে, সাশ্রয়ী দামে পর্যাপ্ত খাদ্য ও জ্বালানির সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

সংস্থাটি বলেছে, খাদ্য মূল্যস্ফীতি মূলত সরবরাহ-সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতার কারণে বাড়ছে। খাদ্যের প্রাপ্যতা বৃদ্ধি ও যৌক্তিক মূল্যে স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ব জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তার কথা উল্লেখ করে সিপিডি বলছে, জ্বালানির দাম আরও বাড়লে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা জটিল হয়ে উঠতে পারে।

সিপিডির মতে, মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশা নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংককে আরও কিছু সময় সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বজায় রাখতে হতে পারে। একইসঙ্গে রাজস্বনীতি এমনভাবে পরিচালনা করতে হবে, যেন সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টাকে দুর্বল না করে।

সিপিডি জানায়, রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিছুটা উন্নত হলেও অধিকাংশ সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচক এখনো চাপে রয়েছে।

আগামী অর্থবছরের জন্য সরকারের নির্ধারিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাময়িক হিসাব অনুযায়ী, বিদায়ী অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ হতে পারে। সেখান থেকে আগামী অর্থবছরে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।

সিপিডির মতে, বেসরকারি বিনিয়োগও উদ্বেগের আরেকটি বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে।

প্রস্তাবিত বাজেটে আগামী অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ২১ দশমিক ৩ শতাংশ হবে বলে ধরা হয়েছে, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত ২১ দশমিক ২ শতাংশের তুলনায় সামান্য বেশি।

সিপিডি বলছে, কয়েক বছর আগ পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ২৩ থেকে ২৪ শতাংশের মধ্যে ছিল, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা কমে গেছে।

বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নিয়ে সরকারের পূর্বাভাস নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সিপিডি।

২০২৬-২৭ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৯ দশমিক ৪ শতাংশ হবে বলে বাজেটে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে উচ্চ সুদহার, দুর্বল চাহিদা এবং ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে এ বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ।

উচ্চ প্রবৃদ্ধি ও নিম্ন মূল্যস্ফীতি একসঙ্গে অর্জন করতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার অপরিহার্য বলে মনে করে সিপিডি।

সংস্থাটি বলেছে, অর্থনীতির জন্য উৎপাদনশীল বিনিয়োগ, শক্তিশালী সরবরাহব্যবস্থা এবং দক্ষ সরকারি ব্যয় প্রয়োজন। এগুলো ছাড়া বাজেটের প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কঠিন হবে।

বাস্তবায়ন হবে চ্যালেঞ্জিং

সিপিডি বলেছে, প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়ন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে।

সংস্থাটি বলেছে, বাজেটের আকার আগের তুলনায় বড় হলেও এর সাফল্য মূলত আকারের ওপর নয়, বরং বাস্তবায়নের মানের ওপর নির্ভর করবে।

এ জন্য প্রয়োজন এমন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, যারা দক্ষতার সঙ্গে বাজেট বাস্তবায়ন করে দৃশ্যমান ফলাফল নিশ্চিত করতে সক্ষম।

 

 

Related Articles

Latest Posts