দেশে একদলীয় শাসন কায়েমের চেষ্টা হচ্ছে: জামায়াত আমির

বিএনপি দেশে একদলীয় শাসন কায়েম করার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ তুলেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান।

আজ শুক্রবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে নগরীর মাসদাইরে কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে আয়োজিত কর্মী সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ অভিযোগ করেন।

সরকার ইতোমধ্যে অনেক অঘটন ঘটিয়ে ফেলেছে মন্তব্য করে জামায়াত আমির বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ; ইসলামী ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংকের দিকে কালো হাত; বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগ্য ভিসিদের সরিয়ে দিয়ে দলের একান্ত অনুগত দলের কর্মীদেরকে ভিসি হিসেবে বসিয়ে দেওয়া; জেলা পরিষদের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নিজেদের দলীয় ক্যাডার এবং নেতাদেরকে প্রশাসক হিসেবে বসিয়ে দেওয়া; এইভাবে একটা দলীয় শাসন—একদলীয় শাসন বাংলাদেশে কায়েম করার চেষ্টা করা হচ্ছে।’

‘ইতিহাস ভুলে গেলে হবে না! শেখ মুজিবুর রহমান সাহেব একদলীয় বাকশাল কায়েম করেছিলেন। অর্ধবছরও ক্ষমতায় রাখতে পারেননি এরপরে। সুতরাং একদলীয় শাসন দেশের মানুষ মেনে নেবে না,’ যোগ করেন তিনি।

জামায়াত আমির আরও বলেন, ‘সংসদে দাঁড়িয়ে বিরোধী দলকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করার এই সংস্কৃতি চালু করেছিল আওয়ামী লীগ। সবচেয়ে বেশি গালি দিতো বিএনপিকে। সাথে সাথে আমাদেরকেও একটু রাখতো, ছাড় দিত না। এখন বিএনপিও ওই পুরোনো আওয়ামী লীগ যা বলতো, সেই পুরোনো আমলের কথাগুলো এখন তারাও জপা শুরু করেছে। যে কথাগুলো জপতে জপতে আওয়ামী লীগ গিয়ে পড়েছে দিল্লিতে, আপনারা সেই কথাগুলো জপতে জপতে কোথায় গিয়ে পড়বেন?’

‘জনগণ এগুলো খায় না! তরুণ-যুব সমাজ এগুলো শুনতে চায় না। তরুণ-যুব সমাজের মুখের ভাষা বোঝার চেষ্টা করুন, না হলে ভুল করবে। আমরা আশা করতে চাই, সরকার নিজেদের ভুল নীতি পরিহার করে জনকল্যাণমূলক, জনবান্ধব নীতিতে ফিরে আসবে,’ বলেন তিনি।

প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, ‘একটা বড় বাজেট দেওয়া হয়েছে। অসুবিধা নাই, বাজেট দেওয়ার দায়িত্ব সরকারের, বাস্তবায়ন করার দায়িত্বও সরকারের। শুধু এতটুকু বলবো, গত সাড়ে ১৫ বছরে এই বাজেট থেকে যেভাবে আওয়ামী লীগ আর তার দোসর ২৯ লাখ কোটি টাকা চুরি করে নিয়ে গিয়েছিল, সেই পথে আপনারা হাঁটবেন না। তবে কীভাবে আস্থা রাখব? কারণ সরকার গঠন করার আগে এবং পরে আপনারা তো চাঁদাবাজদের হাত আটকাতে পারেন নাই! একটা চাঁদাবাজকে আপনারা শাস্তির আওতায় আনেন নাই। ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধ করেন নাই, বরং তার মিটার আগের থেকে বেড়ে গেছে। যদি এই অবস্থা জারি থাকে, তাহলে জনগণ জনগণের জায়গায় তার ভাগ্য নিয়ে হুমড়ি খাবে। আর কিছু দল, দলকানা কিছু মানুষ এবং কিছু গোষ্ঠীর হয়তো ভাগ্যের পরিবর্তন হবে। বাংলাদেশ আর এটা দেখতে চায় না।’

জুলাই যোদ্ধাদের অবদান খাটো করে না দেখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘২০২৬ সালে বাংলাদেশে কোন নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল না। সুতরাং, তাদের রক্ত ও ত্যাগের কারণে আজকের এই সংসদ, সরকার, বিরোধী দল।’

নারায়ণগঞ্জবাসীকে অভিনন্দন জানিয়ে জামায়াত আমির বলেন, ‘বিগত নির্বাচনে হাজার জাল-জালিয়াতি, সন্ত্রাস, কালো টাকার ছড়াছড়ি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, হাজার জাতের মেকানিজম-ইঞ্জিনিয়ারিং, সব কিছুকে উপেক্ষা করে আপনারা ১১ দলীয় ঐক্যকে একটি আসন কমপক্ষে আপনারা উপহার দিতে পেরেছেন।’

তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, নির্বাচন যেভাবে সুষ্ঠু হয়েছিল, তার ভোট গণনা এবং ফলাফল যদি সেইভাবে সুষ্ঠু হতো, অন্য আসনটিতেও অবশ্যই জোটের বিজয় হতো। বিজয় ছিনতাই করে নেওয়া হয়েছে।’

জনগণের মতামতের মূল্য দিতে জামায়াত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিয়েছে বলেও জানান শফিকুর।

তিনি আরও বলেন, বিএনপি প্রথমে চুপ থাকলেও, নীরবে ‘না’ এর পক্ষে ক্যাম্পেইন করেছিল। পরবর্তীতে জনরোষের মুখে রংপুরে বলতে বাধ্য হয়েছিল, ১২ তারিখ দুটি ভোট। একটি গণভোট, আরেকটি জাতীয় সংসদের ভোট। তিনি হ্যাঁ এর পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।

‘আউয়াল, ওয়াস্তে, আখের একবারই তিনি বলেছেন।’

জামায়াত আমির বলেন, ‘তিনি তো সেই দলটির নেতা, বর্তমান সংসদে তিনি সংসদ নেতা, প্রধানমন্ত্রী, সরকারের প্রধান, বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী। তিনি এই যে বললেন কথাটা, সেই গণভোটে ৬৭ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ ভোট দিলো, তাদের ভোটের মূল্যটা তিনি কী দিলেন? তিনি শপথ নিয়েই গণভোটকে অস্বীকার করলেন।’

‘তার (প্রধানমন্ত্রীর) সহকর্মী, যাকে বলা হয় তিনি “সর্বমন্ত্রী”। সব মন্ত্রণালয়ে তিনি আজানও দেন, একামতও দেন। মাঝে মাঝে তিনি সংসদে ফতোয়াও দেন। তিনি বলেছেন, নির্বাচনটা যাতে হয়ে যায় এ জন্য আমরা এগুলো বলেছিলাম। লজ্জা…! একটা সংগঠনের শীর্ষ জায়গা থেকে যদি জনগণকে এভাবে ধোঁকা দেওয়া হয়, তাহলে রাজনীতি এবং রাজনীতিবিদদের প্রতি মানুষের আস্থা থাকবে কেন? মানুষ কেন রাজনীতি এবং রাজনীতিবিদদেরকে বিশ্বাস করবে? আমরা ওই রাজনীতি করি নাই, আমরা ওই রাজনীতি করব না,’ যোগ করেন তিনি।

শফিকুর বলেন, ‘আমরা সংসদে নোটিশ দিয়ে আলোচনা করেছিলাম, গণভোট যেন হারিয়ে না যায়। গণভোটকে যেন সম্মান দেখানো হয়। আমরা বলেছিলাম, যারা জনগণের রায়কে সম্মান করে না, তারা কখনো গণতন্ত্রপন্থী হতে পারে না। গণতন্ত্রের দাবি হচ্ছে, বেশির ভাগের রায়কে সম্মান করা। যেহেতু বেশিরভাগ জনগণ, প্রায় ৭০ ভাগ জনগণ হ্যাঁ এর পক্ষে ভোট দিয়েছে, অতএব সরকারকে এই রেফারেন্ডামের যে সংস্কার প্রস্তাব, সবগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। তারাও বলেছিলেন ভোটের আগে, জনগণ যদি হ্যাঁ এর পক্ষে রায় দেয়, তাহলে যেই সরকার গঠন করুক, আমরা এই জনরায় পরিপূর্ণ করতে, মানতে আমরা বাধ্য থাকব।’

‘এখনো আহ্বান জানাই, সময় আছে, ফিরে আসেন। রেফারেন্ডাম মেনে নিন, মানুষের রায়ের প্রতি সম্মান দেখান। নইলে মনে রাখবেন, মানুষের রায়কে উপেক্ষা-অগ্রাহ্য করে জোর করে যদি শাসন ব্যবস্থা চালাতে চান, এই জনগণ আপনাদের সামনে হিমালয় পর্বত হয়ে দাঁড়িয়ে যাবে। আমাদের রায়কে মানেন না, তাহলে দেশ আপনারা কীভাবে শাসন করবেন? জবাব দিতে পারবেন না,’ সরকারের উদ্দেশে বলেন তিনি।

নারায়ণগঞ্জ এক সময় সন্ত্রাসের রাজধানী হিসেবে পরিচিত হয়েছিল উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, ‘দফায় দফায় ছোপ ছোপ রক্ত, আর কাঁড়ি কাঁড়ি লাশ এই নারায়ণগঞ্জকে উপহার দেওয়া হয়েছে। কোনো কোনো নেতা হুংকার দিয়ে বলতেন খেলা হবে। এখন কার বিরুদ্ধে খেলতেছেন? এখন কোন মাঠে খেলতেছেন?’

তিনি আরও বলেন, ‘হুংকার দেওয়া ভালো নয়। অহংকার আল্লাহ তাআলার চাদর। আল্লাহ তাআলা পছন্দ করে না এটা নিয়ে কোনো মানুষ টানাটানি করুক। অহংকারীরা তাদের কিছুটা পাওনা পেয়েছে, বাকি পাওনাটাও তারা পাবে এটা দেশবাসী দেখতে চায়। নতুন করে ও রকম কোনো গডফাদার এখানে তৈরি হোক আমরা এটা চাই না।’

নারায়ণগঞ্জের বিশিষ্ট কিছু ব্যবসায়ীর উদ্ধৃতি দিয়ে জামায়াত আমির উল্লেখ করেন, চাঁদাবাজদের কারণে ব্যবসায়ীরা ভালো নেই।

‘দলের নেতা হয়ে বলা হবে, আমরা দুর্নীতির টুঁটি চেপে ধরবো। আর ঘরে ঘরে চাঁদাবাজদেরকে লেলিয়ে দেবেন। কথার সাথে কাজের মিল নেই। আবার তারাই আমাদেরকে খোঁটা দেয়, হাজার জাতের খোঁটা। আমরা নাকি কোথায় জান্নাতের টিকেট বিক্রি করেছি,’ যোগ করেন তিনি।

উপস্থিত নেতাকর্মী ও সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি প্রশ্ন রাখেন, ‘আপনারা কেউ কি জান্নাতের কোন টিকেট বিক্রি করেছেন? আপনাদের কাছে কি কেউ কোনো জান্নাতের টিকেট বিক্রি করেছে? আপনারাও বিক্রি করেন নাই, আপনাদের কাছেও বিক্রি করে নাই। জান্নাতের টিকেট কারা বিক্রি করেছে? যারা ইলেকশন করতে গিয়ে বলেছে, এই মার্কায় ভোট দিলে আপনারা জান্নাত পাবেন। সেই ভিডিও কি হারিয়ে গেছে? তারা বিক্রি করেছে। বলেছে, অমুক নেতার নাম ডেইলি ১০০ বার নিলে আপনি জান্নাতে যাবেন। তারা আরেক ধাপ অগ্রসর হয়ে বলেছে, আমাদের অমুক নেতার নাম নেওয়ার আগে অজু করা লাগবে।’

Related Articles

Latest Posts