চার্লস-ট্রাম্পের নৈশভোজের মেন্যুতে যা ছিল, কে কী বললেন

হোয়াইট হাউসে আয়োজিত এক রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে ব্রিটেনের রাজা চার্লস এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প দুই দেশের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের প্রশংসা করেছেন। মঙ্গলবার এই নৈশভোজ অনুষ্ঠিত হয়।

এর মধ্যেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের পারমাণবিক অস্ত্রের বিষয়ে রাজা তার সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন।

রাজকীয় সেই ভোজের আসরে রাজা চার্লস কংগ্রেসের ভাষণের মতোই লন্ডন ও ওয়াশিংটনকে একে অপরের পাশে থাকার অনুরোধ জানান। তবে তিনি ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের চলমান উত্তেজনা নিয়ে সরাসরি কিছু বলেননি।

নৈশভোজ অনুষ্ঠানে ট্রাম্প তার বক্তব্যে স্পর্শকাতর বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন। ব্রিটিশ রাজপরিবারের চার দিনের এই সফরে এটিই ছিল ওই বিষয়ে তার প্রথম জনসমক্ষে দেওয়া কোনো বক্তব্য।

হোয়াইট হাউসের নৈশভোজে ট্রাম্প বলেন, আমরা সামরিকভাবে ওই শত্রুকে পরাজিত করেছি। তিনি আরও বলেন, চার্লস আমার সঙ্গে পুরোপুরি একমত। আমরা ওই শত্রুকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে দেব না।

ইরান যুদ্ধের বিরোধিতা করায় ট্রাম্প বারবার ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারকে আক্রমণ করে কথা বলেছেন। তবে রাজা চার্লস যে ট্রাম্পের এই অবস্থানকে সমর্থন করেছেন, এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

তবুও দুই নেতাই ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ সম্পর্কের অনেক প্রশংসা করেন। তাদের মধ্যে কিছু মনোমালিন্য থাকলেও ওই সময়ের জন্য তারা তা ভুলে যান।

রাজা চার্লস তার বক্তব্যে বলেন, তিনি দুই দেশের এই গুরুত্বপূর্ণ বন্ধুত্বকে আরও মজবুত করতে এসেছেন। এই বন্ধুত্ব দীর্ঘ সময় ধরে নিরাপত্তা ও উন্নতির মূল ভিত্তি হয়ে আছে।

রাজা চার্লস ন্যাটোর মতো আন্তর্জাতিক জোটের গুরুত্বের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। অথচ ট্রাম্প বারবার এই জোটের সমালোচনা করে আসছেন। এ ছাড়া রাজা চার্লস রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইউক্রেনকে সাহায্য চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।

তিনি আরও বলেন, সবাই মিলে এক হয়ে কাজ করলে আমরা বর্তমান বিশ্বের জটিল চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে পারব।

তারকা অতিথি

মেনুতে ছিল গার্ডেন ভেজিটেবল ভেলুটে, স্প্রিং হার্ভড র‍্যাভিওলি  ও ডোভার সোল মুনিয়ের। আর শেষ পাতে মিষ্টি হিসেবে পরিবেশন করা হয় হোয়াইট হাউস হানি অ্যান্ড ভ্যানিলা বিন ক্রেমু।

রাজা চার্লস মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ১৯৪৪ সালে তৈরি হওয়া ব্রিটিশ নৌবাহিনীর একটি সাবমেরিনের ঘণ্টা উপহার দেন। অনুষ্ঠানে ট্রাম্প আমেরিকার ২৫০ বছরের স্বাধীনতা উদযাপনের কথা উল্লেখ করে রাজার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে পানীয় পানের মাধ্যমে বিশেষ অভিবাদন জানান।

আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে ছিলেন অ্যাপলের প্রধান টিম কুক, অ্যামাজনের জেফ বেজোস এবং এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াং। এ ছাড়া ছিলেন বিখ্যাত গলফার ররি ম্যাকিলরয়।

রাজা ও প্রেসিডেন্ট বেশ হালকা মেজাজে কথা বলেন। ট্রাম্প আগে বলেছিলেন যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র না থাকলে সবাই এখন জার্মান ভাষায় কথা বলত। রাজা চার্লস ট্রাম্পের এই মন্তব্য নিয়ে কৌতুক করেন।

রাজা বলেন, আমরা না থাকলে আপনারা হয়তো ফরাসি ভাষায় কথা বলতেন।

তিনি মূলত ২৫০ বছর আগের ইতিহাসের কথা মনে করিয়ে দেন।

ট্রাম্প রাজার ভাষণের অনেক প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, রাজার সম্মানে ডেমোক্র্যাটরা দাঁড়িয়েছিলেন। আমি নিজে কখনো তাদের দিয়ে এমনটা করাতে পারিনি।

কংগ্রেসের সদস্যরা রাজাকে বেশ উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। রাজা যুক্তরাষ্ট্রকে তার বন্ধুদের পাশে থাকার অনুরোধ করেন। তিনি পরিবেশ রক্ষার মতো বিষয় নিয়েও কথা বলেন, যা ট্রাম্প সাধারণত পছন্দ করেন না।

রাজা জোর দিয়ে বলেন, ইউক্রেনে স্থায়ী শান্তি ফেরাতে সবার দৃঢ় মনোবল প্রয়োজন। ২০২২ সাল থেকে ইউক্রেন রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছে।

ব্রিটিশদের চেয়ে ঘনিষ্ঠ কোনো বন্ধু নেই

১৯৯১ সালে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের পর রাজা চার্লস হলেন দ্বিতীয় কোনো ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য, যিনি কংগ্রেসে ভাষণ দিলেন। তিনি দুই দেশের অভিন্ন গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের কথা তুলে ধরেন। অথচ ট্রাম্পের বিরোধীরা প্রায়ই তার বিরুদ্ধে এই ঐতিহ্যগুলো নষ্ট করার অভিযোগ তোলেন।

রাজা উল্লেখ করেন, আমেরিকার সুপ্রিম কোর্টের ১৬০টিরও বেশি মামলায় ব্রিটেনের ম্যাগনা কার্টার কথা বলা হয়েছে। ডেমোক্র্যাটদের ব্যাপক করতালির মধ্যে তিনি বলেন, শাসকের ক্ষমতাকে অবশ্যই আইনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।

এর আগে ট্রাম্প ব্রিটেনকে আমেরিকার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলে প্রশংসা করেন। তিনি হোয়াইট হাউসে রাজা চার্লস এবং রানি ক্যামিলাকে রাজকীয়ভাবে স্বাগত জানান। সেখানে ২১ বার তোপধ্বনি এবং বিমানের কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয়।

ট্রাম্প বলেন, স্বাধীনতার পর গত কয়েকশ বছরে ব্রিটিশদের চেয়ে ঘনিষ্ঠ কোনো বন্ধু আমরা পাইনি।

এই সফরটি এমন এক সময়ে হচ্ছে যখন দুই দেশের সম্পর্ক কিছুটা স্পর্শকাতর। কারণ, ইরান ইস্যু এবং অন্যান্য নীতি নিয়ে ট্রাম্প সম্প্রতি ব্রিটেনের সমালোচনা করেছেন।

তবে উত্তেজনা থাকা সত্ত্বেও ট্রাম্প বেশ হাসিখুশি ছিলেন।

গত সপ্তাহে ওয়াশিংটনে ট্রাম্পকে হত্যার চেষ্টার পর এই সফরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুব জোরদার করা হয়েছে। রাজা চার্লস এ নিয়ে বলেন, এ ধরনের সহিংসতা কখনো সফল হবে না।

রাজপরিবারের সদস্যরা বুধবার নিউইয়র্ক যাবেন। সেখানে তারা ৯/১১ স্মৃতিসৌধ পরিদর্শন করবেন। এরপর বৃহস্পতিবার তারা বারমুডার উদ্দেশে রওনা দেবেন।

Related Articles

Latest Posts